অবসর

শিশির মনির

জামান সাহেব বাসায় ফিরছেন। রাস্তায় প্রচণ্ড জ্যাম। বাধ্য হয়ে বাস থেকে নেমে পড়লেন। বাকি পথটুকু পায়ে হেঁটে যাবেন। আজ থেকে তার আর কোনো তাড়া নেই। দীর্ঘ কর্মজীবনের অবসান ঘটল আজ। জামান সাহেব তেত্রিশ বছর শিক্ষকতা করেছেন। নিজ হাতে অনেককে গড়ে তুলেছেন তিনি। এদের অনেকে আজ ক্যারিয়ারে উঁচু পর্যায়ে চলে গেছে। একসঙ্গে চাকরি করে সহকর্মীরাও বাড়ি-গাড়ি করেছেন। অথচ জামান সাহেব সেই একই রকম রয়ে গেলেন। মনের ভেতর এসব ভাবনা এখন প্রতিনিয়ত খেলা করে।

ক্লাসে জামান সাহেব পড়াতেন কম। নৈতিক শিক্ষাদানে বেশি সময় দিতেন। এটা নিয়ে অনেক ঝামেলাও পোহাতে হয়েছে তাকে। স্কুল কমিটির চেয়ারম্যান ডেকে পাঠাতেন। বলতেন, স্কুলে আসার উদ্দেশ্য তিনটি- জ্ঞানার্জন, শরীর গঠন ও নৈতিকতার শিক্ষা। জ্ঞানার্জনের জন্য স্কুলে বই আছে। শরীর গঠনের জন্য স্কুলে শরীরচর্চা, খেলাধুলা হয় কিন্তু নৈতিকতা শিক্ষাদানের জন্য বই বা উপকরণ নেই।

শহরের ফুটপাতগুলো হকারদের দখলে। পথ চলতে কষ্ট হয়। জামান সাহেব ফুটপাত দিয়ে হাঁটছেন আর মনে পড়ে যাচ্ছে অতীতের অনেক স্মৃতি। হঠাৎ ‘এই আমড়া নিবেন, আমড়া’ শুনে একটু দাঁড়ালেন। কণ্ঠস্বরটি  পরিচিত মনে হলো। জামান সাহেব ঘুরে দাঁড়ালেন। তারপর কৌতূহলী দৃষ্টি নিয়ে মুখোমুখী হলেন সেই যুবকের। চেহারাটি চেনা চেনা লাগছে। এই ছেলেটির কিশোর বয়সের চেহারার সাথে পরিচয় ছিল জামান সাহেবের। সেই চেহারার সঙ্গে মিলিয়ে ছেলেটিকে চেনার চেষ্টা করলেন। তবে ছেলেটি তার আগেই জামান সাহেবকে চিনে ফেলল। বলল, স্যার আমি রাজু। কমলগঞ্জ হাই স্কুলের রাজু।

জামান সাহেব এবার মুহূর্তেই ছেলেটিকে চিনতে পারলেন। তার মনে পড়ল শিক্ষকতা জীবনের সবচেয়ে তিক্ত সেই অভিজ্ঞতার কথা। ঠিক বারো বছর আগে জামান সাহেব কমলগঞ্জ হাই স্কুলের শিক্ষক ছিলেন।  তিনি সব সময় ছাত্রদের প্রতিদিন একটি ভালো কাজ করার উপদেশ দিতেন। একদিন ক্লাসে এই রাজুকেই যখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আজ কী ভালো কাজ করেছিস?তখন রাজু বলেছিল, স্যার, আজ আমি স্কুলে আসতে চাইনি কিন্তু আম্মু বলেছে তাই এসেছি।
কেন আসতে চাসনি?

আমার মন খারাপ ছিল। গতকাল আমার আব্বু আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।
কোথায় গেছেন?
স্যার, আমার মা কালো। তাই বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। সকালে বাসায় খাবার ছিল না। আম্মু আমাকে বলেছে, অনেক বড় হতে হবে। আম্মুর কথা রাখতে আমি স্কুলে এসেছি।

এ কথার পর পুরো ক্লাসে এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এলো। রাজুর কথাগুলো সবার কাছে অপ্রত্যাশিত ছিল। স্যার নীরবতা ভেঙে বললেন, মা কখনো কালো হয় না। মা চির সুন্দর। এর চেয়ে বেশি কিছু জামান সাহেব তখন আর বলতে পারলেন না। রাজুর হাত ধরে ক্লাসের বাইরে নিয়ে এলেন। হোটেলে বসিয়ে পেট ভরে খাওয়ালেন। বললেন, ভালো করে পড়ালেখা করো। তোমার মায়ের দুঃখ তোমাকেই ঘোচাতে হবে।এর কিছুদিন পর জামান সাহেব বদলি হয়ে ঢাকা চলে আসেন। কর্ম ব্যস্ততায় কমলগঞ্জ আর কখনো যাওয়া হয়নি। ঢাকা আসার আগের দিন রাজু বলেছিল, স্যার, আমাদের অল্প কিছু জমি ছিল। সেগুলো বিক্রি করে বড় ভাইকে বিদেশ পাঠিয়েছি। আমাদের সুদিন আসবে। আমাদের জন্য দোয়া করবেন।

ঢাকায় আসার পর যতদিন রাজুর কথা মনে পড়েছে জামান সাহেব ভেবেছেন- রাজু ভালোই আছে। ভাই বিদেশ থেকে টাকা পাঠাচ্ছে। এত দিনে হয়তো রাজুর পড়াশোনাও শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু এ কি দেখছে সে!
রাজু, কেমন আছিস বাবা? তোর এখানে কেন?
ভালো আছি স্যার।
আগে বল, তোর মা, ভাই কেমন আছে?
ভাই সুখেই আছে স্যার। বিদেশ গিয়ে প্রথম কয়েক মাস যোগাযোগ করেছে। তারপর বিয়ে করে ওখানেই রয়ে গেছে। আমাদের আর কোনো খোঁজ নেয় না।
তারপর?

বাবা চলে গেছে। ভাই ছেড়ে গেছে কিন্তু আমি তো মাকে ছেড়ে যেতে পারি না। আপনিই তো বলেছিলেন স্যার, মা চির সুন্দর।

কী বলবেন তিনি, কিছু ভেবে পান না জামান সাহেব। মুখ দিয়ে শব্দ বের না হলেও চোখ দিয়ে দু’ফোটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ে। জামান সাহেবের মনে হচ্ছে, শুধু কর্মজীবনকে তিনি অবসরে পাঠাননি, চাওয়া পাওয়ার হিসেবটাকেও আজ অবসরে পাঠিয়েছেন তিনি। পরক্ষণেই ভাবছেন, তেত্রিশ বছর শিক্ষকতা করে ধন-সম্পদ গড়তে পারিনি তো কী হয়েছে? কিছু মানব সম্পদ তো গড়েছি, যাদের কাছে ‘মা’ চির সুন্দর, চির শাশ্বত!
এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে আসে জামান সাহেবের মনে।

Leave a Reply