আইএসআইএল দমন নাকি নিজেদের চেনানোর সুযোগ?

সিরিয়ায় তাকফিরি সন্ত্রাসীগোষ্ঠী আইএসআইএল’র কথিত ‘খেলাফত’ খতম হতে চলেছে। সেখানকার বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্রিটিশ পত্রিকা ডেইলি এক্সপ্রেস বলছে, আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সিরিয়ায় আইএসআইএল’র চূড়ান্ত পতন ঘটতে পারে। এ নিয়ে পশ্চিমা জগতে এক ধরনের উষ্মা দেখা যাচ্ছে; একই রকম অসন্তোষ দেখা যাচ্ছে কয়েকটি আরব দেশ ও ইসরাইলের মধ্যে।

 

সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের অনুরোধে সাড়া দিয়ে গত ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে রাশিয়া উগ্র সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএসআইএল’র বিরুদ্ধে বিমান হামলা শুরু করেছে। এরইমধ্যে সিরিয়ায় আইএসআইএল’র সদর দপ্তর গুঁড়িয়ে দিয়েছে রুশ যুদ্ধবিমান। এছাড়া, একটি সুইসাইড বেল্ট ফ্যাক্টরি, বোমা ও মাইন তৈরির কারখানাসহ আইএসআইএল’র বহু স্থাপনা ধ্বংস করা হয়েছে।

 

রাশিয়ার পক্ষে ৫০টি যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার অংশ নিচ্ছে এ অভিযানে। ৬০ বারের বেশি বিমান হামলা হয়েছে সেখানে। রুশ বিমান হামলায় দিশেহারা হয়ে আইএসআইএল সন্ত্রাসীরা সিরিয়া থেকে পালাতে শুরু করেছে; শত শত সন্ত্রাসী আত্মসমর্পণও করেছে।

 

মজার বিষয় হচ্ছে- মার্কিন নেতৃত্বাধীন ১২টি দেশের আন্তর্জাতিক জোট যেখানে এক বছরের বেশি সময়ে আইএসআইএল’র পতন ঘটাতে পারে নি সেখানে রাশিয়ার পাঁচদিনের হামলায় কাহিল হয়ে পড়েছে এই সন্ত্রাসী গোষ্ঠী।

 

প্রশ্ন উঠেছে- আইএসআইএল’র কেন এ অবস্থা? কোথায় গেল তাদের সেই কথিত ‘জিহাদি জজবাহ’? তাহলে কী মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোট আইএসআইএল-কে হামলার নামে আড়াল করে রেখে সন্ত্রাসী তৎপরতা চালাতে সাহায্য করে আসছিল? সর্বশেষ তথ্য হচ্ছে- রুশ বাহিনীর সফল বিমান অভিযানের পর এখন স্থল অভিযান শুরু হবে। সে অভিযানে আইএসআইএল সন্ত্রাসীরা খড়-কুটোর মতো ভেসে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

 

ব্রিটেনের ডেইলি এক্সপ্রেস খবর দিচ্ছে- স্থল অভিযান চালানোর জন্য রাশিয়া ১৫,০০০ সেনা পাঠানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। আশা করা যায়-সে অভিযানে সব সন্ত্রাসবাদ নির্মূল হবে আর সিরিয়ায় আগের শান্তি ফিরে আসবে। কাউকে হতে হবে না শরণার্থী অথবা ইউরোপে আশ্রয় নিতে গিয়ে লাশ হতে হবে না সাগরে ডুবে।

 

ওবামা-ওলাঁদের ক্ষোভ, পুতিনের জবাব:

রাশিয়ার বিমান হামলার বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবং ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা অনেকটা সমস্বরে বলেছেন, রুশ হামলার কারণে আইএসআইএল শক্তিশালী হবে। এ দুই প্রেসিডেন্ট এখনো বলছেন, সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদকে ক্ষমতা থেকে সরে যেতে হবে।

 

একইসঙ্গে তারা সিরিয়া সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান চেয়েছেন। ওবামা এবং ওলাঁদের বক্তব্যের জবাব রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, ওবামা এবং ওলাঁদ সিরিয়ার নাগরিক নন। তাদের চাওয়ায় কিছু যায় আসে না। সিরিয়ার জনগণই দেশটির ভবিষ্যত ও প্রেসিডেন্ট আসাদের ভাগ্য নির্ধারণ করবে। ওবামা এবং ওলাঁদ সিরিয়া কিংবা আসাদের ভাগ্য নির্ধারণের কেউ নন।

 

চার দেশীয় জোট:

রুশ হামলার চতুর্থ দিনে সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদ বলেছেন-ইরান, রাশিয়া, ইরাক ও সিরিয়া একসঙ্গে জোট বেঁধে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএসআইএল’র বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করলে এ জোট সফল হবে। ইরানের একটি টেলিভশন চ্যানেলকে দেয়া সাক্ষাৎকারে তিনি এ মন্তব্য করেছেন।

 

আসাদ বলেন, চারদেশীয় এ জোটের সফলতা আসতেই হবে; অন্যথায় পুরো অঞ্চল ধ্বংস হয়ে যাবে। জানা যাচ্ছে- ইরান, ইরাক, সিরিয়া ও রাশিয়া মিলে ইরাকে একটি তথ্যকেন্দ্র স্থাপন করেছে এবং এর মাধ্যমে এ দেশগুলো সন্ত্রাসীদের বিষয়ে তথ্য ভাগাভাগি করছে।

 

এ সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট আসাদ বলেন, “সন্ত্রাসবাদ-বিরোধী লড়াইয়ে ইরান ও রাশিয়ার ব্যাপক অভিজ্ঞতা রয়েছে। এ কারণে নতুন এ জোট সামরিক, নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সহযোগিতার বিষয়ে সফল হবে এবং এ জোটের সফল হওয়ার ভালো সুযোগ রয়েছে।”

 

এরদোগানের উদ্বেগ:

সিরিয়া সংকট তৈরির শুরু থেকেই তাতে উস্কানি দিয়ে আসছেন তুরস্কের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী রজব তাইয়্যেব এরদোগান। তিনি বার বার বলেছেন, প্রেসিডেন্ট আসাদকে ক্ষমতা থেকে সরতেই হবে।

 

এরদোগান তার ভাষায় সিরিয়ায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মিশনে নেমেছিলেন। অনেকে মনে করেন এবং সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আসাদ নিজেও কয়েকবার বলেছেন, সিরিয়ায় আজকের এ অবস্থা সৃষ্টির পেছনে সবচেয়ে দায়ী ব্যক্তি হচ্ছেন এরাদাগান। তার শক্ত অবস্থানের কারণে এবং অস্ত্র, অর্থ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সন্ত্রাসীদের লেলিয়ে দেয়ার কারণে সিরিয়ার এ করুণ পরিস্থিতি।

 

সিরিয়ার সন্ত্রাসীদেরকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়েছেন এরদোগানই সবচেয়ে বেশি। এখন রুশ হামলায় আইএসআইএল’র খেলাফত তছনছ হওয়ায় এরদোগানের সমস্ত স্বপ্নস্বাদ ভেঙে চুরমার হতে বসেছে। তিনি নিজে এখন উদ্বিগ্ন; গোস্বাও হয়েছেন বটে।

 

তিনি বলেছেন, সিরিয়ায় রাশিয়া যে বিমান হামলা শুরু করেছে তা এক ধরনের চিন্তার কারণ হয়ে গেছে। তিনি আরো বলেছেন, সিরিয়ায় রাশিয়ার বিমান হামলা চিন্তা ও বিরক্তির কারণ হয়ে উঠেছে। রাশিয়া যে পদক্ষেপ নিয়েছে এবং সিরিয়ায় যে বিমান হামলা চালাচ্ছে তা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য।

 

সন্ত্রাসীদের ওপর বিমান হামলার কারণে তিনি দুঃখও প্রকাশ করেছেন। রুশ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় যখন যোষণা করেছে সিরিয়ায় বিমান হামলা জোরদার করা হয়েছে তখন তুর্কি প্রেসিডেন্ট তার বিরোধিতার কথা জানালেন।

 

আরব দেশ ও ইসরাইলে অসেন্তাষ:

সিরিয়ায় নাকি দুই রকমের সন্ত্রাসী আছে। একটা গ্রুপ ‘ভালো’ আর একটা গ্রুপ ‘মন্দ’। এটা হলো আমেরিকার বক্তব্য। তো আমেরিকা সেই ভালো সন্ত্রাসীদের মদদ দিয়ে আসছে যাতে সিরিয়ায় বাশার আসাদকে উৎখাত করে গণতন্ত্র তথা তাদের নিজেদের পছন্দের একটা সরকার বসানো যায়। বড়‌ই অদ্ভুত এ বক্তব্য! সন্ত্রাসীদের আবার ভালো-মন্দ কী?

 

যাইহোক, আমেরিকা তো তাও নিজেদের মতো একটা কথিত ‘ভালো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ বেছে নিয়েছে কিন্তু আরব রাজা-বাদশাহরা তাও পারেন নি। তারা চোখ বন্ধ করে সবাইকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন। মার্কিন প্রশিক্ষণ নেয়া ভালো সন্ত্রাসীদেরকেও সমর্থন দিচ্ছেন আবার কথিত খেলাফত কায়েম করেছে যে ভয়াবহ সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আইএসআইএল তাদেরকেও সমর্থন দিচ্ছেন। এই গোষ্ঠী হত্যা, ধর্ষণ, অপহরণ, পুড়িয়ে মারা, ডুবিয়ে মারা, গলা কেটে হত্যা -হেন কোনো অপরাধ নেই যা করে নি। তবুও তাদেরকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন আরাব রাজা-বাদশাহরা।

 

একই দশা ইসরাইলেরও। আমেরিকার ভালো সন্ত্রাসীদের সমর্থন দেয়া আর আরব-ইসরাইলের গড়পড়তা সবাইকে সমর্থন দেয়ার কিন্তু লক্ষ্য একটাই। তা হলো বাশার আসাদকে ক্ষমতা থেকে নামাতে হবে। এখানে মোটা দাগে আমেরিকা তথা পশ্চিমাদের স্বার্থ হচ্ছে তাদের পরিকল্পনা মতো ‘নিউ মিডিলইস্ট’ বা ‘নতুন মধ্যপ্রাচ্য’ প্রতিষ্ঠার পথে প্রধান বাধা হচ্ছে ইরান ও সিরিয়া। আসাদকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পারলে তার একটাকে ছেটে ফেলা গেল।

 

আরব রাজা-বাদশাহদের লক্ষ্য হলো ২০১১ সালের দিকে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় যে ইসলামি জাগরণ বা আরব বসন্তের ঢেউ উঠেছিল তাকে সিরিয়ায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জিগির তুলে আপাতত থামানো গেছে। আসাদকে সরাতে পারলে নতুন আবহ তৈরি হবে; আপাতত রাজা-বাদশাহরা নিরাপদ থাকবেন।

 

আর ইসরাইলের লক্ষ্য হলো- তেলআবিব পরিষ্কার জানে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের নেতৃত্বাধীন ইসরাইল বিরোধী লড়াইয়ের প্রথম ফ্রন্ট হচ্ছে সিরিয়া। সেই সিরিয়া থেকে আসাদের মতো একজন শক্ত-সামর্থ্য নেতাকে সরিয়ে দিতে পারলে তার পথ চলা কত সহজ হয়! হামাসকে দুর্বল করা যাবে, হিজবুল্লাহকে দুর্বল করা যাবে। পথ নিষ্কণ্টক করার পথে বড় বাধা এই আসাদ। অতএব সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লেগেছে প্রেসিডেন্ট বাশার আসাদকে ক্ষমতা থেকে নামাতে।

 

ইসরাইল সিরিয়ায় আহত সন্ত্রাসীদের চিকিৎসার দায়িত্ব পালন করেছে বড় নিষ্ঠার সাথে; উন্নত অস্ত্রও দিয়েছে ইচ্ছেমতো। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে- সিরিয়ায় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই চালাচ্ছেন আরব রাজা-বাদশাহরা অথচ তাদের নিজ নিজ দেশে কতটা গণতন্ত্র আছে সে কথা কে না জানেন। এসব দেশের কোথাও কোথাও জীবনে কোনোদিন নির্বাচনের “ব্যালট বক্স” যায় নি।

 

আরব রাজা বাদশাহদের অনেকে বোট বাক্স কি জিনিস তা হয়তো জানেনও না। এ খাতে পয়সা খরচ করা থেকে নিজেদেরকে সযত্নে আলাদা করে রেখেছেন যুগের পর যুগ। এই স্বৈরশাসক রাজা-বাদশাহদেরকে নির্লজ্জভাবে যুগের পর যুগ সমর্থন দিয়ে আসছে গণতন্ত্রের কথিত ধ্বজাধারী আমেরিকা ও পশ্চিমা বিশ্ব।

 

গ্যাঁড়াকলে আমেরিকা:

সিরিয়ায় রুশ বিমান হামলা শুরুর পর মার্কিন প্রশাসন তথা প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা একরকম গ্যাঁড়াকলে আটকে গেছেন। এক বছরের বেশি সময় মার্কিন নেতৃত্বাধীন ১২টি দেশ দাবি করে আসছিল তারা আন্তর্জাতিক জোট করে আইএসআইএল’র বিরুদ্ধে বিমান হামলা চলাচ্ছে।

 

আমেরিকা বহুবার বলেছে, আইএসআইএল-কে পরাজিত করতে অনেক সময় লাগবে। এ জোটে ছিল আমেরিকা, ফ্রান্স, ব্রিটেন, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা, সৌদি আরব, তুরস্ক, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্দান ও মরক্কো। সিরিয়া সরকার কিংবা জাতিসংঘের অনুমোদন ছাড়াই কথিত এ হামলা হচ্ছে।

 

অবশ্য বিমান হামলার দাবিকে অনেকে সন্দেহের চোখে দেখেছে। ইরান, সিরিয়া ও রাশিয়া প্রকাশ্যে বলেছে- আইএসআইএল’র বিরুদ্ধে মার্কিন নেতৃত্বাধীন জোটের হামলা শুধুমাত্র লোক দেখানো। অনেকে এ কথাও বলেছেন, আইএসআইএল-বিরোধী অভিযানের নামে মার্কিন সেনারা প্রেসিডেন্ট বাশার আসাদকে হত্যার সুযোগ খুঁজছে।

 

যাহোক, আমেরিকার নেতৃত্বে এতবড় বাহিনীর বিমান হামলা সত্ত্বেও এক বছরের বেশি সময়ে যখন আইএসআইএল-কে পরাজিত করা যায় নি তখন যৌক্তিকভাবে রাশিয়ার সামনে পথ সহজ হয়ে গেছে। আমেরিকা দাবি করে আসছে তারা আইএসআইএল’র বিরুদ্ধে হামলা চালাচ্ছে। রাশিয়া বলছে- তারাও আইএসআইএল’র বিরুদ্ধে হামলা চালাবে।

 

আমেরিকা সবসময় ভাব দেখিয়ে আসছে তাদের অবস্থান আইএসআইএল’র বিরুদ্ধে এবং আইএসআইএল তাদের ভাষায় ‘খারাপ সন্ত্রাসী’। অতএব, রাশিয়া যখন বলছে তারা আইএসআইএল’র বিরুদ্ধে হামলা চালাবে তখন প্রকৃতপক্ষে আমেরিকা যুক্তির দিক দিয়ে হেরে গেছে। তখন তাদের কিছুই বলার নেই।

 

রাশিয়া আমেরিকাকে বলেছে, “তোমরাও আইএসআইএল’র ওপর হামলা চালাচ্ছ, আমরাও আইএসআইএল’র ওপর হামলা চালাব; বাধা কোথায়?” তখন সত্যিই আমেরিকার ভাণ্ডারের সব যুক্তি ফুরিয়ে আসে।

 

এরইমাঝে প্রেসিডেন্ট বাশার আসাদ রাশিয়ার কাছে সরাসরি সামরিক সহায়তা চেয়ে বসেন। এবার ষোলকলা পূর্ণ হয়। রুশ সরকার এগিয়ে আসে আরব অঞ্চলের একমাত্র বন্ধু সিরিয়ার সাহায্যে। বৈধ প্রেসিডেন্ট আসাদের আহ্বানে সিরিয়ায় সামরিক অভিযান চালানোর সব বৈধতা পান রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন।

 

তিনি এ সময় বলেছেন, মস্কো সিরিয়ায় লড়াই করবে বৈধভাবে এবং দেশটির সরকারের অনুমোদন নিয়ে। আর অন্যরা হামলা চালাচ্ছে অবৈধ ও বেআইনিভাবে। রুশ সংসদের অনুমোদন নিয়েই মস্কো শুরু করেছে তুমুল বিমান হামলা। আমেরিকা ও আরব-পশ্চিমা জোটের এখন চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আর কিছু নেই। নিশ্চয় এখন তাদের ব্যথায় বুক ভেঙে যাচ্ছে!

 

আরো প্রশ্ন পুতিনের:

রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন সিরিয়ায় সামরিক অভিযানে প্রাথমিক সাফল্য পাওয়ার পরই প্রশ্ন তুলেছেন, এতদিন কেন আইএসআইএল-কে নির্মূল করা গেল না? কেন আইএসআইএল’র ওপর হামলার বিষয়ে ওবামা-ওলাঁদের আপত্তি?তিনি আরো এক ধাপ এগিয়ে প্রশ্ন করেছেন- কারা সৃষ্টি করেছে আইএসআইএল? এসব প্রশ্নের জবাব সবাই জানেন; আমেরিকা জানে, ওবামা জানেন, ওলাঁদও জানেন।

 

একথা সবাই বুঝতে পারেন, মার্কিন নেতৃত্বাধীন ১২টি দেশ আইএসআইএল’র ওপর বিমান হামলা চালায় আর সামান্য একটা সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর পতন হয় না। অথচ হামলা চলছে নাকি ২০১৪ সালের আগস্ট থেকে। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে- কী এমন শক্তি আইএসআইএল’র যে তাদেরকে নির্মূল করা যায় না?

 

বাস্তবতা হচ্ছে- আইএসআইএল’র ওপর হামলার নাম করে আমেরিকা ও তার মিত্ররা সিরিয়ায় সাধারণ মানুষের ওপর, সরকারি স্থপানার ওপর এবং অনেক তেলক্ষেত্র, গ্যাসক্ষেত্র এবং গ্যাস স্টেশনের ওপর বোমা হামলা চালিয়ে দোষ দিয়েছে আসাদ সরকারের অথবা সন্ত্রাসীদের।

 

এভাবে যুদ্ধের নামে অভিনয় করে এসেছে এতদিন। কারণ আইএসআইএল যে ইসরাইল আর আমেরিকার তৈরি! রুশ হামলায় মার্কিন ও আরব-পশ্চিমা নেতাদের সে মুখোশ উন্মোচিত হয়ে পড়েছে। পরিষ্কার হয়ে গেছে- কারা সত্যিকার অর্থে আইএসআইএল-বিরোধী লড়াই চালাচ্ছে আর কারা আইএসআইএল’র পক্ষে।

 

ইরান ও চীনের অবস্থান:

সিরিয়া সংকট তৈরির প্রথম থেকেই ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান প্রেসিডেন্ট বাশার আসাদের প্রতি সমর্থন দিয়ে আসছে। ইরান মনে করে- মধ্যপ্রাচ্যে ইহুদিবাদী ইসরাইলের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রেসিডেন্ট আসাদ হচ্ছেন যোগ্য সঙ্গী। আসাদ ক্ষমতায় থাকলে হামাস-হিজবুল্লাহকে সহযোগিতা করাটা যত সহজ, আসাদ ক্ষমতা থেকে সরে গেলে তা ততটা সহজ হবে না।

 

এছাড়া, ইরান বহুবার বলেছে, সিরিয়া সংকট তৈরির পেছনে নানামুখী ষড়যন্ত্র রয়েছে। সে কারণে একজন বৈধ প্রেসিডেন্ট ও সরকারকে ক্ষমতায় রাখার জন্য সব ধরনের সহযোগিতা ও সমর্থন দেয়া হবে। তেহরান মনে করে, সন্ত্রাসীদের যারা মদদ দিচ্ছে তাদের ভিন্ন উদ্দেশ্য রয়েছে। একটি নির্বাচিত বৈধ সরকারকে এভাবে ক্ষমতা থেকে উৎখাতের কোনো সুযোগ দেয়া উচিত হবে না। এতে মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা আরো বাড়বে।

 

এছাড়া, ইরান সবসময় বলে আসছে, আঞ্চলিক সমস্যা এ অঞ্চলের দেশগুলো মিলে সমাধান করবে; আমেরিকা বা পশ্চিমা সরকারগুলোকে হস্তক্ষেপ করতে দেয়া ঠিক নয়। পাশাপাশি তেহরান সবসময় রাজনৈতিক সমাধানের কথা বলেছে। সিরিয়া সংকটে মধ্যস্থতা করারও প্রস্তাব দিয়েছে। সিরিয়া হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের খুবই ঘনিষ্ঠ মিত্র। সে কারণে ইরান সহিংসতা শুরুর পর সামরিক উপদেষ্টা পাঠিয়ে সিরিয়াকে সন্ত্রাস-বিরোধী লড়াইয়ে পরামর্শ দিয়ে আসছে।

 

এছাড়া, ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহ যোদ্ধারা সিরিয়ায় সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছেন। এসব ঘটনা প্রেসিডেন্ট আসাদকে ক্ষমতায় টিকে থাকতে সহায়তা করেছে। ইরানের পাশাপাশি বিশ্বের আরেক গুরুত্বপূর্ণ শক্তি চীনও সবসময় বলে আসছে রাজনৈতিকভাবে সিরিয়া সংকটের সমাধান হতে হবে; সামরিক উপায়ে কোনো সমাধান হবে না।

 

এ অবস্থানে থেকে চীন ও রাশিয়া জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে সিরিয়া-বিরোধী বিলে দুই বার ভেটো দিয়েছে। এসব বিল পাস হলে সিরিয়ায় সামরিক আগ্রাসন চালানার বৈধতা পেত আমেরিকা ও পশ্চিমা শক্তি এবং আঞ্চলিক মিত্র দেশগুলো। নতুন করে খবর বেরিয়েছে, রাশিয়ার বিমান হামলা শুরুর পর চীনা সামরিক জাহাজ সুয়েজ খাল পেরিয়ে সিরিয়ার দিকে আসছে। এ জাহাজ আসার লক্ষ্য হচ্ছে- সিরিয়া অভিযানে রাশিয়াকে সমর্থন ও সহযোগিতা দেয়া।

 

বদলে যাবে কী বিশ্ব ব্যবস্থা?:

এ কথা খুবই পরিষ্কার যে, সিরিয়ায় বিমান হামলার মধ্যদিয়ে স্নায়ুযুদ্ধ অবসানের পর এই প্রথম রাশিয়া ও আমেরিকা মুখোমুখি সামরিক অবস্থানে চলে গেল। ইরাক, আফগানিস্তান কিংবা লিবিয়ায় হামলার সময় রাশিয়া সরাসরি ময়দানে নামতে পারে নি। কিন্তু এবার রাশিয়া ঠিকই ময়দানে নেমেছে। সে ক্ষেত্রে অনেকেই মনে করছেন, ১৯৯০ এর দশকে সোভিয়েত ইউনয়িনের পতনের মধ্যদিয়ে মার্কিন নেতৃত্বাধনী যে এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যস্থার সূচনা হয়েছিল তার অবসান হতে যাচ্ছে।

 

এ ক্ষেত্রে চীনের ভূমিকাও বেশ জোরালো। চীন ও রাশিয়া দুটিই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য যাদের হাতে রয়েছে ভেটো ক্ষমতা। এচাড়া, চীন এ মুহূর্তে বিশ্বের এক নম্বার অর্থনীতির দেশ। যেকোনো বিষয়ে তাকে আলাদাভাবে হিসাবে নিতে হচ্ছে। চীনের সামরিক ও রাজনৈতিক সক্ষমতাও যথেষ্ট শক্তিশালী। গত দু দশকে দেশটি প্রযুক্তিগত দিক দিয়ে বিপুল অগ্রগতি লাভ করেছে।

 

আর রাশিয়া সেই কমিউনিস্ট শাসিত যুগ পেরিয়ে নতুন যুগে পা রেখেছে; নানামুখী উন্নয়ন তার সঙ্গী হয়েছে। চীন, ভারত, ব্রাজিল ও দক্ষিণ আফ্রিকার মতো বৃহৎ দেশগুলোকে নিয়ে নতুন অর্থনৈতিক ও সামরিক জোট ‘ব্রিক্স’ গড়ে তোলার চেষ্টায় রয়েছে। এ অবস্থায় সিরিয়ায় যে সামরিক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে তার জন্য রুশ-চীনের আলাদা প্রস্তুত রয়েছে সে কথা বলাই যায়।

 

পাশাপাশি ইরানও বেশ শক্ত অবস্থানে রয়েছে। নানামুখী চাপের মুখে তেহরান সিরিয়ার ওপর থেকে কোনো ধরনের সহযোগিতা প্রত্যাহার করে নি। এছাড়া, পরমাণু চুক্তির পর সিরিয়া ইস্যুতে রাশিয়া, চীন ও ইরানের সাম্প্রতিক অবস্থান নতুন বিশ্বব্যবস্থার ইঙ্গিত দিচ্ছে। একইসঙ্গে এ কথা বেশ জোর দিয়েই বলা যাচ্ছে- এককেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার অবসান হতে চলেছে।

 

মনে রাখতে হবে- বিশ্বব্যবস্থায় বড় অবদান রাখার জন্য রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এক ধাপ নিচেই নেমে প্রেসিডেন্ট পদের মেয়াদ শেষে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তারই বিশ্বস্ত সহযোগী মেদভেদেভকে দিয়ে রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালন করিয়েছেন। পরে মেয়াদ শেষে তিনি নিজেনির্বাচনের মাধ্যমে আবার প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। তার সামনে লক্ষ্য ছিল বিশ্ব রাজনীতিতে বড় কিছু অবদান রাখা। ধারণা করা হচ্ছে- সে অবদানই রাখতে চলেছেন পুতিন।

 

সিরিয়া প্রশ্নে কেন রাশিয়ার এই অবস্থান?:

আগেই বলা হয়েছে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ষ্টার পর সারাবিশ্বে যে শক্তির রাজত্ব কায়েম করেছে আমেরিকা তাতে রাশিয়ার মতো শক্তিশালী দেশও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তার সর্বশেষ নজির দেখা যাচ্ছে ইউক্রেন ইস্যুতে মস্কোর বিরুদ্ধে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা। বার বার রাশিয়াকে আরো নিষেধাজ্ঞার হুমকি দেয়া হচ্ছে। এসব কাটাতে হলে রাশিয়াকে ঘুরে দাঁড়ানো ছাড়া উপায় নেই।

 

আর সিরিয়া হচ্ছে আরব অঞ্চলে রাশিয়ার পুরনো মিত্র দেশ। অনেক ইস্যুতে আরব দেশগুলোর চেয়ে ভিন্ন অবস্থান ছিল সিরিয়ার। প্রেসিডেন্ট বাশার আল-আসাদের পিতা প্রেসিডেন্ট হাফেজ আল-আসাদই ছিলেন আরব অঞ্চলে সাবেক সোভিয়েত রাশিয়ার একমাত্র বন্ধু। সিরিয়ার উপকূলে রয়েছে রাশিয়ার একমাত্র বৈদেশিক নৌ ঘাঁটি। সে ঘাঁটি এবং আরব অঞ্চলে রাশিয়ার অবস্থান ধরে রাখার জন্য সিরিয়ার পাশে দাঁড়ানোর বিকল্প নেই। ধারণা করা হচ্ছে- আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে রাশিয়া সে কাজটিই করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares