আইএসের সর্বশেষ ঘাঁটির পতন

সিরিয়ার বাঘুজেতে নিজেদের সর্বশেষ ঘাঁটিতে পরাজিত হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট (আইএস)। বাঘুজের পূর্ণ দখল এখন তাদের হাতে বলে শনিবার জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্স (এসডিএফ)। বাঘুজে দখলের পর সেখানে নিজেদের বিজয় পতাকা উড়িয়ে দিয়েছে এসডিএফ। এর মাধ্যমে সিরিয়া ও ইরাকের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জায়গা নিয়ে আইএস ঘোষিত ‘খেলাফত’-এর চূড়ান্ত পতন হলো। তবে আইএস জঙ্গিরা তাদের দখলে থাকা শেষ স্থানটি হারালেও বিশ্বের নিরাপত্তার জন্য এখনও তাদের অন্যতম হুমকি হিসেবেই দেখা হচ্ছে। খবর বিবিসি ও রয়টার্সের।

সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্সের (এসডিএফ) মুখপাত্র মুস্তফা বালি শনিবার এক টুইট বার্তায় জানিয়েছেন, ‘বাঘুজে মুক্ত করা হয়েছে। সেখানে আইএসের বিরুদ্ধে সামরিক বিজয় লাভ হয়েছে। তথাকথিত খেলাফতের সম্পূর্ণ পতন হয়েছে। যেসব শহীদদের প্রচেষ্টায় এই বিজয় সম্ভব হয়েছে। এই বিশেষ দিনে আমরা তাদের স্মরণ করছি। তবে বাঘুজেতে থাকা রয়টার্সের এক সাংবাদিক জানিয়েছেন, শনিবারও তারা গুলি ও মর্টারের গোলার শব্দ শুনেছেন।

আইএস ২০১৪ সালের জুনে তাদের কথিত খেলাফতের ঘোষণা দেয়। সিরিয়ার রাকাকে রাজধানী ও ইরাকের মসুল শহরকে দ্বিতীয় রাজধানী ঘোষণা করে তারা। অতি দ্রুত তারা ইরাক ও সিরিয়ার প্রায় ৮৮ হাজার বর্গমাইল এলাকা দখল করে তাদের ‘খেলাফত’ প্রতিষ্ঠা করে। তবে গত তিন বছরে আঞ্চলিক ও বিশ্ববাহিনীর কাছে রাকা ও মসুলসহ বিভিন্ন বড় শহরে পরাজয়ের পর সর্বশেষ আইএস যোদ্ধারা বাঘুজেতে আশ্রয় নেয়।

গত বছরের ডিসেম্বরে এখানে অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত সিরিয়ান ডেমোক্রেটিক ফোর্স। তবে বাঘুজেতে থাকা বেসামরিক নাগরিকদের জন্য চূড়ান্ত আক্রমণ চালাতে পারছিল না এসডিএফ। বিপুল সংখ্যক বেসামরিক নাগরিক বাঘুজের বিভিন্ন ভবন, তাঁবু ও টানেলে আটকা পড়ে আছে জানার পর হামলার গতি কমিয়ে আনে তারা। পরে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে আত্মসমর্পণের জন্য এসডিএফের তৈরি করিডোর দিয়ে হাজার হাজার বেসামরিক নাগরিক বের হয়ে আসার পর চূড়ান্ত অভিযান শুরু করে তারা।

এদিকে বাঘুজেতে আইএসের পরাজয়ে যে তাদের চূড়ান্ত পতন হয়েছে তা বলা যাচ্ছে না। এখনও তাদের অন্যতম হুমকি হিসেবেই দেখা হচ্ছে। জঙ্গিগোষ্ঠীটি এখনও আঞ্চলিক ও বিশ্বব্যাপী হামলা চালাতে সক্ষম বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। সিরিয়ার মরুভূমির প্রত্যন্ত অঞ্চলে এখনও তাদের অনেক যোদ্ধা রয়েছে। এ ছাড়া ইরাকের বিভিন্ন শহরেও অনেক আইএস যোদ্ধা লুকিয়ে রয়েছে। আকস্মিক গুলি ছুড়ে পালিয়ে যাওয়া ও অপহরণের মতো বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে তারা। সুযোগ খুঁজছে আবারও মাথাচাড়া দিয়ে ওঠার।

আফগানিস্তান, নাইজেরিয়া, ইয়েমেনেও জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসের সক্রিয়তা রয়েছে। এর মধ্যে আফগানিস্তানের বেশ কিছু প্রত্যন্ত অঞ্চল এখন আইএসের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বাস করে আইএসের প্রধান আবুবকর আল বাগদাদি এখনও ইরাকে অবস্থান করছে। ২০১৪ সালে বাগদাদি নিজেকে মুসলমানদের খলিফা হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিল।

এরপরও বাঘুজেতে আইএসের পতন সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে স্থানীয় ও বিশ্ববাহিনীর জন্য একটি বড় মাইলফলক। এদের মধ্যে অনেকে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে নৃশংস এ জঙ্গিগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছেন।

এটি সিরিয়ায় আট বছর ধরে চলা যুদ্ধের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। আইএসের পরাজয়ের মাধ্যমে এ অঞ্চলের সবচেয়ে ধ্বংসাত্মক প্রতিদ্বন্দ্বীর পতন হয়েছে। এখন একমাত্র সমস্যা সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের বাহিনী, তুরস্ক সমর্থিত বিদ্রোহী এবং কুর্দি নেতৃত্বাধীন এসডিএফের বিভক্তি। যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত এসডিএফকে কুর্দি সন্ত্রাসবাদী গ্রুপ হিসেবে দেখে তুরস্ক।

এসডিএফকে যে কোনো মূল্যে সিরিয়া থেকে বিতাড়নের ঘোষণাও দিয়েছে তারা। এ ছাড়া আসাদ ও তার ইরানি মিত্ররা পূর্ণ সিরিয়া তাদের নিয়ন্ত্রণে আনার ঘোষণা দিয়েছে। এখন দেখার বিষয় তিন পক্ষ কীভাবে পরিস্থিতি মোকাবেলা করে।