আমরা কোন মোদিকে গ্রহণ করব

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দুদিনের সফর শেষে ভারতে ফিরে গেছেন। তাঁর আগমনকে বাংলাদেশে নানাভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। একদল যেমন মোদির আগমনে অতি উচ্ছ্বসিত ভাব প্রকাশ করেছে, আবার অন্যদল মোদির অতীত কর্মকাণ্ডের কারণে তাঁর বাংলাদেশ সফরের বিরোধিতা করেছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কেউ কেউ বলেছেন, ‘আমি মোদির সামনে কালো পতাকা নিয়ে দাঁড়াতে চাই! আমরা বুঝিয়ে দিতে চাই, গুজরাটের গণহত্যার কথা আমরা ভুলিনি।’ আবার বিদায়-মুহূর্তে মোদির জীবনানন্দ দাশের ‘আবার আসিব ফিরে’ কবিতার পঙক্তি আওড়ানোতে যারপরনাই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন।

আমি ব্যক্তিগতভাবে এই দুই দলের কোনো দলেই নেই। আমি মোদিরর আগমনে যেমন অতি উচ্ছ্বসিত নই, আবার অতি ক্ষুব্ধও নই। এর কারণটা ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।

ভারতের জাতীয় নির্বাচনের আগে ভারতসহ বিশ্ব গণমাধ্যমে একজন নেতিবাচক চরিত্রের মোদিকে আমরা দেখেছি। এরপর যখন মোদি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হলেন, তার পর থেকে তাঁর ভারত উন্নয়নের নানা চিত্র আমাদের সামনে আসতে থাকল। অর্থাৎ মোদির দুটো রূপ আমাদের সামনে পরিষ্কার- এক. ভারতের গুজরাটে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার জন্য দায়ী মোদি; দুই. ভারতের জাতীয় নির্বাচনে দেশটির জনগণ দ্বারা নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী মোদি।

এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ ঘুরে গেলেন কোন মোদি? নিশ্চয় ‘খলনায়ক’ মোদি নন; যিনি ঘুরে গেলেন তিনি ভারতের ‘প্রধানমন্ত্রী’ নরেন্দ্র মোদি। তাঁর এই ঘুরে যাওয়াটা দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কেরই একটা অংশ। রাষ্ট্রপ্রধানদের বিভিন্ন ইস্যুতে বিভিন্ন দেশ সফর করতে হয়। এই মোদিই কদিন আগে চীন সফর করে এলেন। এরপর তিনি বাংলাদেশে এলেন। এর আগেও ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রীরা বাংলাদেশ সফরে এসেছেন। কাজেই মোদির এই সফরকে একটি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সফরনামা হিসেবে দেখতে চাই। এই ধরনের সফর দুই দেশের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। তাই এখানে মোদির সফরে অতি উচ্ছ্বসিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। তিনি যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সামনে প্রণতি জানালেন, সাভার স্মৃতিসৌধে শহীদদের শ্রদ্ধা জানালেন, জীবনানন্দের কবিতা আওড়ালেন- এগুলো অবশ্যই প্রশংসনীয় আচরণ। তবে এগুলো তিনি না করলেও আমি তাঁর নিন্দা করতাম না। মোদির স্থানে ভারতের অন্য কোনো নেতা প্রধানমন্ত্রী হয়ে এলেও এসব কমবেশি করতেন।

আবার মোদির বাংলাদেশ সফরের বিরোধিতা করারও কোনো কারণ আমি দেখছি না। কারণ আমরা ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদিকে বাংলাদেশে পেয়েছি। ভুলে গেলে চলবে না, তিনি ভারতের জনগণের ভোটেই নির্বাচিত সরকার। তাঁকে আমাদের গ্রহণ করতেই হবে। দুই দেশের বৃহত্তর স্বার্থ এর মধ্যে নিহিত। আমরা কোনোভাবেই বলতে পারি না, ‘মোদি, তুমি বাংলাদেশে এসো না!’। কাজেই, আমাদের ফোকাসটা মোদি থেকে সরিয়ে আনতে হবে, মূল ফোকাসটা রাখতে হবে, দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক কোথায় দাঁড়াচ্ছে সেখানে, আদান-প্রদানে আমাদের স্বার্থসিদ্ধি কতটুকু হচ্ছে বা ন্যায্য পাওনা থেকে আমরা বঞ্চিত হচ্ছি কি না, সেখানে। আমরা দেখব, শেষপর্যন্ত শুভঙ্করের ফাঁকিতে যেন আমরা না পড়ি!

মোজাফফর হোসেন : সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক।

Leave a Reply