ইউএস বাংলার ‘ব্ল্যাক বক্স’ উদ্ধার, এটি আসলে কী?

নেপালের কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন বিমানবন্দরে অবতরণের সময় ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি বিমান হয়ে ৪৯জন মারা গেছে।

নেপালি কর্তৃপক্ষ বলছে, ফ্লাইট ২১১কে রানওয়ের দক্ষিণ দিক থেকে অবতরণ করতে বলা হলেও পাইলট উত্তর দিক থেকে অবতরণ করে।

তবে ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স নেপালি কর্তৃপক্ষের দাবী অস্বীকার করে বলেছে, কন্ট্রোল টাওয়ার থেকে পাইলটকে ভুল নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল।

বিমানের ‘ব্ল্যাক বক্স’ উদ্ধার করা হয়েছে – এটি এমন একটি যন্ত্র যাতে ককপিটের যাবতীয় কথাবার্তা এবং বিমানের কারিগরি তথ্য রেকর্ড করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ‘ব্ল্যাক বক্সে’র তথ্য যাচাই করেই দুর্ঘটনার কারণটি জানা যাবে।

 

ব্ল্যাক বক্স কী?

প্রথমেই বলা ভালো, ব্ল্যাক বক্স নামে ডাকা হলেও এর আসল নাম হলো ফ্লাইট রেকর্ডার। যেটি বিমান চলাচলের সর্বশেষ সব তথ্য রেকর্ড করে রাখে।

এভিয়েশন বা বিমান নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা কিন্তু এটিকে ব্ল্যাক বক্স নামে ডাকেন না, তারা বলেন ফ্লাইট রেকর্ডার।

নামে ব্ল্যাক বক্স কিন্তু আসলে কালো কোন বস্তু নয়। বরং এর রং অনেকটা কমলা ধরণের।

এটি অত্যন্ত শক্ত ধাতব পদার্থ দিয়ে তৈরি একটি বাক্স, যা পানি, আগুন, চাপ বা যেকোনো তাপমাত্রায় টিকে থাকে।

এটি দুইটি অংশের সমন্বয়ে আসলে একটি ভয়েস রেকর্ডার। বিমান চলাচলের সময় সব ধরণের তথ্য এটি সংরক্ষণ করে রাখে।

এর মধ্যে দুই ধরণের তথ্য সংরক্ষিত থাকে। একটি হলো ফ্লাইট ডাটা রেকর্ডার বা এফডিআর, যেটি বিমানের ওড়া, ওঠানামা, বিমানের মধ্যের তাপমাত্রা, পরিবেশ, চাপ বা তাপের পরিবর্তন, সময়, শব্দ ইত্যাদি নানা বিষয় নিজের সিস্টেমের মধ্যে রেকর্ড করে রাখে।

ককপিট ভয়েস রেকর্ডার (সিভিআর) নামের আরেকটি অংশে ককপিটের ভেতর পাইলদের নিজেদের মধ্যের কথাবার্তা, পাইলটদের সঙ্গে বিমানের অন্য ক্রুদের কথা, ককপিট এর সঙ্গে এয়ার কন্ট্রোল ট্রাফিক বা বিভিন্ন বিমান বন্দরের সঙ্গে রেডিও যোগাযোগের কথা রেকর্ড হতে থাকে।

ফলে কোন বিমান দুর্ঘটনায় পড়লে এই ব্ল্যাক বক্সটি খুঁজে বের করাই হয়ে পড়ে উদ্ধারকারীদের প্রধান লক্ষ্য। কারণ এটি পাওয়া গেলে সহজেই ওই দুর্ঘটনার কারণ বের করা সম্ভব হয়।

বাক্সটির বক্স উজ্জ্বল কমলা হওয়ায় সেটি খুঁজে পাওয়া সহজ হয়।

সমুদ্রের তলদেশেও ৩০দিন পর্যন্ত ব্লাক বক্স অক্ষত থাকতে পারে।

ব্লাক বক্সের আবিষ্কার

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এ ধরণের যন্ত্র তৈরির উদ্যোগ প্রথম নেয়া হয়। তবে সত্যিকারের ব্ল্যাক বক্সের কাজ শুরু হয় ১৯৫০এর দশকের গোড়ার দিকে।

অস্ট্রেলীয় সরকারের এয়ারোনটিকাল রিসার্চ ল্যাবরেটরিতে কেমিস্ট ডেভিড ওয়ারেন এটি আবিষ্কার করেন। ১৯৬২ সালের ২৩শে মার্চ প্রথম অস্ট্রেলিয়ার একটি বিমানে পরীক্ষামূলক ভাবে এটির ব্যবহার করা হয়।
Image caption একটি বিধ্বস্ত বিমানের ব্ল্যাক বক্স

দুর্ঘটনার পরেও কিভাবে টিকে থাকে ব্ল্যাক বক্স?

এটি অত্যন্ত শক্ত ধাতব পদার্থ দিয়ে তৈরি করা হয়। কয়েকটি লেয়ার দিয়ে এটি এমনভাবে তৈরি করা হয় যে, প্রচণ্ড উত্তাপ, ভাঙচুর, পানি বা প্রচণ্ড চাপের মধ্যেও সেটি টিকে থাকতে পারে।

স্টেইনলেস স্টিল বা টাইটানিয়ামের খোলস দিয়ে বক্সের আবরণ তৈরি করা হয়। টিকে থাকার অনেকগুলো পরীক্ষায় পাস করার পরেই ব্ল্যাক বক্সগুলোকে বিমানে সংযোজন করা হয়।

ব্ল্যাক বক্স কিভাবে তথ্য পায়?

আধুনিক ব্ল্যাকবক্সগুলোয় ২৫ ঘণ্টা পর্যন্ত বিমানের ফ্লাইট ডাটা ধারণ করে রাখতে পারে। এর ভেতর অনেকগুলো মেমরি চিপ পাশাপাশি সাজানো থাকে। এখানে তথ্য সরবরাহ করার জন্য বিমানের বিভিন্ন জায়গায় অনেক সেন্সর লাগানো থাকে।

এসব সেন্সর অনবরত বিমানের গতি, তাপমাত্রা, সময়, ভেতর বাইরের চাপ, উচ্চতা ইত্যাদি বিমানের সামনের দিকে থাকা ফ্লাইট ডাটা অ্যাকুইজিশন ইউনিট নামের একটি অংশে পাঠাতে থাকে। সেখান থেকে সেসব তথ্য চলে যায় ব্ল্যাক বক্সের রেকর্ডারে।

পাইলট, কো পাইলট, ক্রুদের বসার কাছাকাছি জায়গায় অনেকগুলো মাইক্রোফোন বসানো থাকে। তাদের সব কথাবার্তা, নড়াচড়া বা সুইচ চাপা ইত্যাদি সব এসব মাইক্রোফোনে রেকর্ড হতে থাকে। সেগুলো এ্যাসোসিয়েটেড কন্ট্রোল ইউনিট নামের একটি ডিভাইসে পাঠায়। এরপর সেসব তথ্য ব্ল্যাক বক্সে গিয়ে জমা হয়।

কিন্তু ব্ল্যাক বক্সে কত তথ্য থাকে?

আসলে বিমান চলাচলের একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত ব্ল্যাক বক্স তথ্য সংরক্ষণ করে রাখে। মূলত শেষের দিকে তথ্য এটিতে জমা থাকে। একটি নির্দিষ্ট সময় পরপর আগের তথ্য মুছে যেতে থাকে আর নতুন তথ্য জমা হয়। ফলে দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে সর্বশেষ তথ্য এটিতে পাওয়া যায়।

কিভাবে তথ্য উদ্ধার করা হয়?

ব্ল্যাক বক্সটি পাওয়ার পরেই বিমান দুর্ঘটনা তদন্তকারী, বিমান সংস্থা, এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি দল তৈরি করা হয়। সেই সঙ্গে প্রযুক্তিবিদদের সমন্বয়ে তারা ব্ল্যাক বক্স থেকে তথ্য উদ্ধারের কাজটি শুরু করেন।

বক্সের অবস্থার উপর নির্ভর করে কত তাড়াতাড়ি তথ্য পাওয়া যাবে।

সেটি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলে অনেক সময় মাসের পর মাসও তথ্য উদ্ধারে সময় লেগে যায়। কারণ বিশেষজ্ঞদের খেয়াল রাখতে হয়, যাতে তথ্য উদ্ধার করতে গিয়ে কিছু মুছে না যায় বা মেমরি চিপগুলো ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।

ব্ল্যাক বক্সের শক্তি

একেকটি ব্ল্যাক বক্সের পাওয়ার বা শক্তির যোগান দেয় দুইটি জেনারেটরের যেকোনো একটি। এসব সোর্স থেকে এই বক্সটি অব্যাহতভাবে শক্তির সরবরাহ পেয়ে থাকে।

ব্ল্যাক বক্সের নাম ব্ল্যাক বক্স কেন?

এটির সঠিক উত্তর আসলে কারো জানা নেই। অনেকে মনে করেন, আগে এটির রং কালো রঙের ছিল, তাই হয়তো তখন থেকে এর নাম ব্ল্যাক বক্স। আবার অনেকে বলেন, দুর্ঘটনার, মৃত্যু ইত্যাদির কারণে এটিকে ব্ল্যাক বক্স ডাকা হয়।

অনেকের ধারণা, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নতুন আবিষ্কৃত যেকোনো ধাতব প্রযুক্তিকে কালো রঙ দিয়ে ঢেকে রাখা হতো। এ কারণেও এটির নাম ব্ল্যাক বক্স হতে পারে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *