ওরা আর অতিথি নয়, যেন অতি আপনজন….

আগে ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি আসত, দু’এক মাস থেকে আবার চলে যেত, সবাই বলতো অতিথি পাখি। লম্বা ঠোট, লম্বা পা, আর লম্বা গলার সাদা পালক। লেজের দিকে কালো রং। তিন থেকে পাঁচ কেজি ওজনের এসব পাখি দেখে অবাক হতো সবাই।
কিন্তু না, বদলে গেছে দৃশ্যপট। এখন ওরা আর অতিথি নয়। যেন বাড়ির পোষা পাখি, অতি আপনজন।

ডিম দিচ্ছে, বাচ্চা তুলছে, আর সারা বছর বাগান জুড়ে থাকছে। আশ-পাশের ধান ক্ষেত, আর বিল-বাওড় থেকে ওরা খাবার খুঁজে ফিরে। হয়ে গেছে পরিবেশ, প্রতিবেশির অংশ। তবে শিকারের হাত থেকে এখনো নিরাপদ হতে পারেনি বিলুপ্ত প্রায় বিরল সারস প্রজাতির এসব পাখি। প্রায়ই তির-ধনুক আর গুলি করে শিকার করা হচ্ছে। ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার প্রত্যন্ত পল্লী আশুরহাট গ্রামে গড়ে উঠেছে পাখিদের এই কলোনি।

ঝিনাইদহের শৈলকুপা উপজেলার নিত্যানন্দপুর ইউনিয়নের প্রত্যন্ত একটি গ্রাম আশুরহাট। ভাঙ্গাচোরা আর রাস্তাঘাট বিহীন প্রায় তিনহাজার লোকসংখ্যা অধ্যুষিত এ গ্রামটির অধিকাংশ মানুষের পেশা কৃষি। বেশিরভাগ মানুষ সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের।এই গ্রামের পশ্চিম পাড়ায় একটি মজা পুকুরের চারপাশ দিয়ে সাত বছর ধরে বাস করে বিরল প্রজাতির এই পাখি। স্থানীয় ভাষায় এরা শামুকভাঙ্গা নামে পরিচিত থাকলেও এ পাখির বৈজ্ঞানিক নাম ‘অনাস্তমুস অস্কিতামুস’। যাকে এশিয়ান শামুকখোলও বলা হয়।

জানা গেছে, ভারতীয় উপমহাদেশ আর দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে এসব পাখি পাওয়া যায়। শামুক এদের প্রধান শিকার, ধানক্ষেতের পোকামাকড়ও খেয়ে থাকে। বাসযোগ্য আবহাওয়া আর খাদ্য প্রাপ্যতার জন্যে এরা বহুদূর উড়ে যেতে পারে, যা দীর্ঘ এক আন্দোলনের মতো। ঝাঁক ধরে গাছের মগডালে ছোট ছোট বাসা বেঁধে থাকে এরা।

শৈলকুপার আশুরহাট গ্রামের গৌতম বিশ্বাসের একটি বাগানে পুরাতন শিমুল গাছ আর জামগাছে সারস প্রজাতির এসব পাখিদের নিরাপদ আবাস গড়ে তুলে বাগান মালিক ও এলাকার সহজ-সরল মানুষগুলি প্রকৃতি প্রেমের দৃষ্টান্ত গড়ে তুলেছে। গ্রামবাসির কাছে পাখিরা যেন দূর বনজঙ্গল বা খাল-বিলে আসা অতিথি নয়, নিজের বাড়ি-ঘরের কেউ।

ঝিনাইদহ সরকারি কেসি কলেজের প্রাণিবিদ্যা ও জীববৈচিত্র সংরক্ষণ বিভাগের প্রভাষক রহমত আলী জানান, মানুষের খাদ্য শৃঙ্খলের অন্যতম একটি স্থান দখল করে আছে বিভিন্ন প্রজাতির পাখি। বাংলাদেশে প্রায় ৭৫০ প্রজাতির পাখি রয়েছে। কিন্তু পরিবেশ দূষণসহ নানা কারণে পাখির আবাসস্থল কমে আসছে ।

আশুরহাট গ্রামের বাগানে পাখিদের অভয়াশ্রম গড়ে উঠেছে তা জানেন না বনবিভাগের কর্মকর্তারা। তবে এ খবর জেনে পাখিদের নিরাপদ করতে বন বিভাগের পক্ষ থেকে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দিলেন ভারপ্রাপ্ত বন কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন ।

সাংবাদিকদের কাছ থেকে পাখির এই খোঁজ জেনে কর্মকর্তাদের কাছে তাৎক্ষণিক নির্দেশনা দিয়ে এটাকে এলাকার ঐতিহ্য বলে উল্লেখ করে সরেজমিনে সেখানে যাবার কথা জানান শৈলকুপার ইউএনও মুহাম্মদ আলী প্রিন্স।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *