‘কবিতা নিয়ে কখনোই ব্যবসা করতে চাইনি’

তিনি কষ্ট ফেরি করেন। হরেক রঙের কষ্ট। আদতে কষ্ট নয়, তিনি ফেরি করেন হরেক রঙের কবিতা। আশ্চর্য রকম সব কবিতা। বাংলা কবিতার ইতিহাসে হেলাল হাফিজ তাই কবিতার আশ্চর্য এক ফেরিওয়ালা।

কবি হেলাল হাফিজের জন্ম ১৯৪৮ সালের ৭ অক্টোবর, নেত্রকোনা জেলার বড়তলী গ্রামে। শৈশবে মাকে হারিয়েছেন। স্কুল শিক্ষক বাবার কড়া শাসনে কেটেছে শৈশবের দুরন্ত সময়। ছিলেন স্কুলের সেরা খেলোয়াড়। নেত্রকোনাতেই কেটেছে স্কুল এবং কলেজ জীবন। ১৯৬৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে ভর্তি হন বাংলা বিভাগে। তারপরই কবিতা নামক পোঁকার আক্রমণে আক্রান্ত হয়ে পড়েন। নেত্রকোনার আরেক কবি নির্মলেন্দু গুণ এবং কবি রফিক আজাদের সাথে জানাশোনা ছিল আগেই। নির্মলেন্দু গুণের সাথে পরিচয় বাবার কবিতা লেখার উছিলায়। স্কুল শিক্ষক বাবা খোরশেদ আলী তালুকদারও কবিতা লিখতেন। নির্মলন্দু গুণ এবং রফিক আজাদের সাথে বাবা কবিতা লিখতেন খালেকদাদ চৌধুরী সম্পাদিত ‘উত্তর আকাশ’ নামের পত্রিকায়। সেই সুবাদে ঢাকায় এসে নির্মলেন্দু গুণ এবং রফিক আজাদের সাথে সম্পর্কটা আরো পাকাপোক্ত হয়। তারপর থেকেই কবিতায় যাপিত জীবন শুরু।

১৯৬৯ সাল। গণঅভ্যুত্থানের সময়। ঢাকা শহর যেন মিছিলের নগরী। হেলাল হাফিজ লিখে ফেললেন ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতা। কবিতা নিয়ে পত্রিকায় প্রকাশের জন্য গেলেন দৈনিক পাকিস্তানের সাহিত্য সম্পাদক কবি আহসান হাবীবের কাছে। আহসান হাবীব কবিতা পড়ে ফিরিয়ে দিলেন, আর বললেন, তোমার এ কবিতা ছাপাতে পারলাম না বলে আমার আজীবন দুঃখ থাকবে। তবে আমি বলছি- এই কবিতা লেখার পর তোমার আর কবিতা না লিখলেও চলবে।

হেলাল হাফিজ কবিতা নিয়ে ফিরে আসেন। কিন্তু না, তিনি অগ্রজ কবির কথা ভুলে গিয়ে আবার কলম হাতে নেন। একে একে লিখে ফেলেন- ‘নিরাশ্রয়ী পাঁচটি আঙুল’ এবং ‘দুঃসময়ে আমার যৌবন’। তত দিনে দেশে শুরু হয়ে গেছে উত্তাল একাত্তর। সারা দেশ মিছিলে মিছিলে মুখর। আর দেয়ালে দেয়ালে লেখা হতে থাকল ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ কবিতার প্রথম দুটি চরণ -এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়/এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।

লেখালেখি শুরু করার ১৭ বছর পর প্রকাশ করেন প্রথম এবং একমাত্র কবিতার বই ‘যে জলে আগুন জ্বলে’। ১৯৮৬ সালের বইমেলায় কবিতার বইটি প্রকাশিত হওয়ার পরই নিজেকে আড়াল করে নেন তিনি। সুদীর্ঘ ২৫ বছর এক ধরনের স্বেচ্ছানির্বাসনের মতো অবস্থা থেকে বের হয়ে ২০১২ সালের বইমেলায় প্রকাশিত হয় তাঁর দ্বিতীয় গ্রন্থ কবিতা একাত্তর। দীর্ঘ ২৫ বছরে তিনি যাপন করেছেন ভিন্ন এক জীবন। ফেরি করেছেন আশ্চর্য এক কষ্ট। প্রায় চার বছর ধরে বাসা বেঁধেছেন হোটেলে। পরিজনবিহীন রাজধানী ঢাকার তোপাখানা রোডের হোটেল কর্ণফুলীতে এখন তাঁর নিবাস। এখন তাঁর জীবন অনেকটা হোটেলবন্দী অবস্থায় কাটে। এনটিভি অনলাইনের জন্য দুই কিস্তিতে তাঁর মুখোমুখি বসি প্রেসক্লাবের গেস্টরুমে আর তাঁর হোটেল কর্ণফুলীর কক্ষে। কবি শোনান তাঁর ‘এক জীবন’ ফেরি করার গল্প!

প্রশ্ন : কয়েক মাস পরই আপনি পৌঁছুবেন ৬৭তম জন্মদিনে। পেছনে কাটিয়ে এসেছেন জীবনের এতটা বছর। তাই শুরুতেই জানতে চাইছি, ৬৭ বছরের জীবনে ২৫টি বছর কাটিয়ে দিলেন অন্তরালে, আজ এখন এই সময়টাতে আপনার উপলব্ধি কী?

উত্তর : জন্মদিন তো আসলে আনন্দের কোনো বিষয় নয়। বরং এটি এক ধরনের মন্দ লাগার কারণ। ৬৬ বছর পেছনে ফেলে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া। ৬৬ বছর হয়তো অঙ্কের হিসাবে বেশ দীর্ঘ একটা সময়ই বটে। কিন্তু আমি পুরো সময়টাকে কাজে লাগাতে পারিনি। আর এই জীবন যাপন করতে গিয়ে হয়তো নতুন কোনো কষ্ট আবার বুকে জমেছে। সেগুলো আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে চায়। যে বেদনাবোধ, নিজের স্বপ্ন এবং প্রেম থেকে লেখা হয়েছে আমার ‘যে জলে আগুন জ্বলে’। আমার অব্যক্ত কথাগুলোই প্রকাশিত হয়েছে কবিতার বইয়ে। আবার হয়তো কিছু বেদনা জমেছে। সেগুলোকে প্রকাশ করতে হবে। আর জীবনের ২৫ বছরেরও বেশি সময় যে স্বেচ্ছা নির্বাসিত ছিলাম তার জন্য আমার কোনো অনুশোচনা নেই। ৬৬ বছর থেকে ২৫টি বছর তো এক ধরনের ঝরে যাওয়াই বলা যেতে পারে। তবে তা নিয়ে কোনো দুঃখবোধ নেই।

প্রশ্ন : এবার আমরা একটু গোড়ার দিকে যেতে চাই। কখন থেকে সিদ্ধান্ত নিলেন যে কেবল কবিতাই লিখবেন?

উত্তর : সোজাসুজি বলতে গেলে কলেজজীবন থেকে। স্কুলজীবনে আমি খুব ভালো খেলোয়ার ছিলাম। স্কুলের হয়ে বাইরের বিভিন্ন দলের বিপক্ষে বেশ ভালো ফুটবল খেলতাম। এ ছাড়া লং জাম্প ছাড়াও ভলিবলটাও খুব ভালো খেলতে পারতাম। কিন্তু সবকিছুর পরও মাতৃহীনতার একটা শূন্যতা আমাকে তাড়া করত। খেলাধুলা আমাকে সেই হাহাকারময় অবস্থা থেকে পরিত্রাণ দিতে পারত না। তখনই আমি আশ্রয় নিই কবিতার। আকড়ে ধরি কবিতাকে। কবিতাও আমাকে আশ্রয় দেয়। তারপর ইন্টারমিডিয়েট পাসের পর ৬৭ সালের দিকে যখন ঢাকায় চলে আসি, তখন সবকিছু যেন বদলে গেল। আর একটি ব্যাপার যেটি আমার মনে হয়, আমাদের যৌবনের সময়ে এই ভূখন্ডে বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে যা আমাদের সময়ের অনেককেই প্রভাবিত করেছে। কিছু ঘটনা যেমন- ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান,  ৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধ, এসব ঘটনাগুলো আমাদের প্রবলভাবে প্রভাবিত করেছে, আলোড়িত করেছে। যা আমাদেরকে কবিতা লিখতে এক ধরনের সহায়তা করেছে বলেই আমার মনে হয়।

প্রশ্ন : আপনার কাব্যগ্রন্থ ‘যে জলে আগুন জ্বলে’র কবিতা বিন্যাসের দিকে তাকালে দেখি যে ৬৯ থেকে ৮৫ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে লেখা কবিতা স্থান পেয়েছে। কাব্যগ্রন্থটিতে মোট ৫৬টি কবিতা রয়েছে। এই সুদীর্ঘ ১৬ বছরে কি আপনি ৫৬টি কবিতাই লিখেছিলেন?

উত্তর : না না। কবিতা জমেছিল প্রায় ১২০টির মতো। সেখান থেকে বাছাই করে ৫৬টি কবিতা নেওয়া হয়েছে। আর কবিতা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আমি চেয়েছি যেন প্রেম, দ্রোহ, সংগ্রাম, দেশ, সমাজ, ব্যক্তিগত প্রেম বা জীবন সবকিছু যেন এক মলাটে বন্দি করা যায়। আর ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ বইটি করার জন্য কবিতা বাছাইয়ে আমি সময় নিয়েছিলাম ছয় মাসের মতো। প্রতিদিন কবিতা বাছাই করতাম। আবার রাতে শুয়ে শুয়ে ভাবতাম এই কবিতাটি বাদ দিয়ে অমুক কবিতাটি নিতে হবে। আবার পরের দিন দেখা যেত আগের রাতের বাছাই করা কবিতাটি বাতিল করে দিতাম। অনেক সময় এমনও হয়েছে যে, কবিতা বাছাই করতে গিয়ে মনে পড়ত আচ্ছা, ওই যে সদরঘাটের বা গুলিস্তানের মিছিল থেকে আসার পরে যে কবিতাটি লিখেছিলাম সেটি বাদ দেব কেন? নিয়ে নিই না কেন সেটি? আবার দেখা যেত কোনো এক নারীর কথা স্মরণ করে লেখা কোনো একটি কবিতা নেওয়ার জন্য আবার নতুন করে কবিতা বাছাই করেছি। তাই কবিতা নির্বাচন করাটা আমার কাছে অনেক বেশি কঠিন হয়ে পড়েছিল।

প্রশ্ন : ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ কাব্যগ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’র প্রথম দুটি লাইন আপনাকে রাতারাতি তারকা কবির পরিচিতি এনে দেয়। তখন ৬৯ এবং ৭১ এ আপনার এই কবিতা মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। আপনার কবিতা লেখা থাকত দেয়ালে, দেয়ালে। তারপরে দেশ স্বাধীনেরও অনেককাল পরে  ৫৬টি কবিতা একত্রিত করে ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত হলো ‘যে জলে আগুন জ্বলে’। আর এদিকে আমাদের দেশটিও ৫৬ হাজার বর্গমাইল আয়তনের। দেশের ভূখণ্ডের সাথে মিলিয়েই কি ৫৬টি কবিতা রেখেছিলেন?

উত্তর : না। এটা কাকতালীয়। আমি এমন করে ভাবিনি। তুমিই প্রথম যে এই বিষয়ে এভাবে মিলিয়ে দেখলে। আসলে ৫৬টি কবিতা রাখা হয়েছিল বইয়ের ফর্মা অনুযায়ী। এর চেয়ে বেশি কবিতা রাখা যেত না। তাই ৫৬টিই নির্বাচিত করা হয়েছে।

প্রশ্ন : কেবল একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশের পরই কেন নিজেকে আড়ালে নিয়ে গেলেন বা আড়াল করলেন?

উত্তর : নানা কারণে। তবে কিছু মান-অভিমান তো ছিলই। কিন্তু আমি কবিতা নিয়ে কখনোই ব্যবসা করতে চাইনি। কবিতাকে অর্থ উপার্জনের মাধ্যম বলেও কখনো ভাবিনি।

প্রশ্ন : এই যে একটি কাব্যগ্রন্থ দিয়ে প্রায় দুই প্রজন্মকে সমানভাবে সম্মোহিত করে রাখলেন, আপনার কবিতার কোন বিশেষ দিকটির জন্য আপনার কবিতা এখনো শুরু থেকে সমান পঠিত বলে মনে করেন?

উত্তর : আমার কবিতায় মানুষের স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষাকে হয়তো প্রকাশ করতে পেরেছি। আমার স্বপ্ন ও আকাঙ্ক্ষা মানুষকে স্পর্শ করেছে বলেই এটা হয়েছে বলে মনে হয়। যেমন- এবার এই যে শাহবাগে আন্দোলন হলো, সেখানেও রোজ কেউ না কেউ আমার কোনো না কোনো কবিতা আবৃত্তি করেছে। মানুষ প্রেমে পড়তে গিয়েও আমার কবিতা পড়ছে। প্রেমে মজেও পড়ছে। আবার প্রেমে প্রত্যাখ্যাত হয়েও পড়েছে। আমার কবিতার মাঝে যেন একক আমি সবার কথাই বলেছি। তাই হয়তো এমনটা হতে পারে।

প্রশ্ন : আপনার সমকালের অন্যান্য কবিরা যেমন- আসাদ চৌধুরী, নির্মলেন্দু গুণ, আবুল হাসান, রফিক আজাদ, মহাদেব সাহা, আবদুল মান্নান সৈয়দ- এঁদের মধ্যে কেবল আবুল হাসানের (অকাল প্রয়াত বলে) তিনটি কাব্যগ্রন্থ। কিন্তু আপনার কেবল একটি কাব্যগ্রন্থ। তারপরও আপনি আমাদের বাংলা কবিতার ষাটের দশকের কাব্যচর্চায় বেশ আলোচিত। কিন্তু সেটি কেন? আপনার কেবল একটি গ্রন্থ এ ক্ষেত্রে কোনো অন্তরায় হয়ে উঠতে পারেনি কেন?

উত্তর : কেন অন্তরায় হয়ে উঠতে পারেনি তা আমি বলতে পারব না। আর আমার তো মনে হয় আমার নামটি অন্যসবার আগেই উচ্চারিত হয় (হা..হা..হা)। (হাসি থামিয়ে খানিক ভেবে) আমাদের ষাটের দশকের প্রথম দিকের কবি হলেন আসাদ চৌধুরী। যাঁদের নাম উল্লেখ করা হলো তাঁদের বাইরে প্রশান্ত ঘোষালের নামটিও উল্লেখ করার মতো।

প্রশ্ন : আপনার সময়কার অন্যান্য কবি কবিতা লিখে খ্যাতির পাশাপাশি নানা পুরস্কার ও রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পেয়েছেন। এ ক্ষেত্রে আপনার অবস্থানটি যদি বলেন।

উত্তর : আমি কখনোই ভাবিনি যে কবিতা লিখে পুরস্কার পেতে হবে। আর আমি এক জীবনে এত এত মানুষের এত প্রেম আর ভালোবাসা পেয়েছি যে অন্য কিছু পাওয়ার কথা মনে আসেনি। আর বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা দেশ এবং দেশের বাইরে থেকে নানা সময়ে সম্মাননা দিয়েছে আমাকে। তবে যেটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেটি হচ্ছে ভালোবাসা। আর আমার যা কিছু অর্জন সব তো কবিতার জন্যই। আর রাষ্ট্রীয় পুরস্কার বলতে তো বাংলা একাডেমি পুরস্কারকে বুঝায়। সেটি এখনো পাইনি। তার জন্য কোনো দুঃখ বোধও নেই।

প্রশ্ন : আপনি প্রায় দীর্ঘ ২৫ বছর এক ধরনের স্বেচ্ছা নির্বাসন জীবন কাটালেন। এই নির্বাসিত জীবনে কি কবিতা থেকেও নির্বাসনে ছিলেন?

উত্তর : আমি প্রায় নির্বাসিত জীবন কাটালেও কবিতাকে কখনো ছাড়তে পারিনি আর কবিতাও আমাকে ছেড়ে যায়নি। আর এই ২৫টি বছর আমি এই বইটির প্রতি (টেবিলে থাকা ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ দেখিয়ে) মানুষের ভালোলাগা আর ভালোবাসা অবলোকন করেছি। আমার নির্বাসিত জীবন সম্পর্কে লোকজন সঠিক কিছু জানতো না। বেশির ভাগ লোকজন জানত আমি দেশের বাইরে আছি। আবার অনেকে ভাবত আমি মারা গেছি। তাই ২৫ বছর পর আবার এসে আমি নতুন একটা জগতের মুখোমুখি হলাম যেন।

প্রশ্ন : আপনার এই নিজেকে আড়াল করা বা নির্বাসিত জীবন যাপনের পেছনের কথাটি যদি বলতেন….

উত্তর : নির্বাসনে থাকার প্রধান কারণ হচ্ছে আলস্য। এটি এখন আমার রোগে পরিণত হয়েছে। আর তা ছাড়া ব্যক্তিজীবনের নানা পরাজয়ও রয়েছে। এ ছাড়া আরেকটি বিষয়, যিনি আমাকে নির্বাসিত থাকতে উৎসাহী করেছেন- উৎসাহী বলব না প্রলুব্ধ- তিনি হচ্ছেন সূচিত্রা সেন। আমি সুচিত্রা সেনের খুব অনুরাগী। সূচিত্রা সেনের বিষয়টা বলতে হলে একটু পেছনে যেতে হবে। ৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময়ও আমাদের নেত্রকোনার সিনেমা হলে সূচিত্রা সেনের ছবি দেখানো হতো। যে সপ্তাহে সূচিত্রা সেনের ছবি থাকত সেই সপ্তাহে পালিয়ে হলে গিয়ে ছবি দেখতাম। এমনও হয়েছে অনেকদিন আমি এবং আব্বা একইসাথে হলে বসে ছবি দেখেছি। কিন্তু আব্বা জানত না যে আমিও হলের ভেতরে রয়েছি। ছবি শেষ হলে তাড়াতাড়ি বের হয়ে অন্য রাস্তা ধরে আব্বার আগে বাড়িতে পৌঁছে যেতাম। তখন থেকেই সুচিত্রা সেনের প্রতি মোহবিষ্ট হয়ে পড়েছিলাম। সেই সূচিত্রা সেনকে দেখলাম নিজেকে আড়াল করে গৃহবন্দী করে রেখেছেন। কারো সাথে কোনো প্রকার যোগাযোগ রাখছেন না। এক সময়ের তুমুল জনপ্রিয় নায়িকা নিজেকে আড়াল করে ফেললেন। সুচিত্রা সেনের মতো আমিও নিজেকে আড়ালে নিয়ে যেতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তা ২৫ বছর ধরে রাখতে পারলেও আর পারলাম না। পারছি না বলেই এখন বসে বসে গল্প করছি (হা…হা…হা)।

প্রশ্ন : জ্বী। তাই আপনার নির্বাসন ভঙ্গের জন্য আপনাকে আরেকবার স্বাগত। কবিতায় সমকালীন রাজনৈতিক চিন্তার প্রভাব পড়ে। আপনার ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ তার উজ্জ্বল উদাহরণ। কিন্তু আবার অনেক রাজনৈতিক কবিতাই শেষ পর্যন্ত কবিতা না হয়ে স্লোগান সর্বস্ব হয়ে ওঠে। এ বিষয়ে কিছু বলুন…

উত্তর : আমার ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ নিয়ে এখনো রীতিমতো তর্কবিতর্ক চলছে। এ নিয়ে অনেকে বলেন, এটি স্লোগান। আবার অনেকে বলছেন, কবিতাই ছিল এখন স্লোগান হয়ে গেছে। তবে আমি বলব- এটাকে আমি কবিতা হিসেবেই লিখেছি। তুমুল জনপ্রিয়তার কারণে হয়তো অনেকে ‘স্লোগান’ বলার পক্ষে মত দিয়েছেন।

প্রশ্ন : আপনি যে সময়টাতে কবিতা লেখা শুরু করলেন অর্থাৎ ৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ, ওই সময়টিকে নিয়ে আপনার সময়কার প্রায় সবাই কবিতা লিখেছেন। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে আপনার কোনো কবিতা রয়েছে কি?

উত্তর : দেখুন আমি কোনো রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী কখনোই ছিলাম না। আর নীতিগতভাবে আমি বাম রাজনীতিকে সমর্থন করি। যদিও সারাবিশ্বে মার্কসইজমের পতন হয়েছে কিন্তু আমি বিশ্বাস করি- রাষ্ট্রের সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে সম্পদের সুষম বণ্টন করতে মার্কসবাদের কোনো বিকল্প নেই। যাই হোক, বর্তমানে আমাদের বাংলাদেশে দুটি জিনিস পড়েছে ভল্লুকের হাতে। একটি হচ্ছে ধর্ম, অপরটি রাজনীতি। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর যখন বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা লেখাটা ছিল ভয়াবহ, তখন আমি এই ভূখণ্ডের স্থপতি বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কবিতা লিখেছি। আমার কবিতাটির নাম ‘নাম ভূমিকায়’।

প্রশ্ন : আপনার জীবনযাপন নিয়ে বিভিন্ন কথা প্রচলিত আছে। জীবন ধারণের জন্য, জীবিকা উপার্জনের জন্য আপনি নানা মাধ্যম বেছে নিয়েছিলেন। সেসব বিষয়ে যদি বলেন…

উত্তর : সারা জীবনে পেশা বলতে যা বুঝায় সেটি বললে সাংবাদিকতার কথাই বলতে হবে। কিন্তু আমাদের দেশে এই পেশা এখনো ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে দাঁড়ায়নি। তাই বেকার হওয়ার একটি ঝুঁকি থেকেই যায়। আমিও আমার দীর্ঘ কর্মজীবনের প্রায় অর্ধৈকটা সময়ই চাকরিহীন অবস্থায় কাটিয়েছি। ১৯৭৪ সালে যখন আমার চাকরি চলে গেল তখন আমি জুয়া খেলে জীবিকা চালাতাম। আমার জুয়া খেলার ভাগ্য খুবই ভালো ছিল। বেশিরভাগ সময়ই আমি জিততাম। ১৫ বছরেরও বেশি সময় আমি জুয়া খেলে জীবনযাপন করেছি।

এ ছাড়া আরেকটি বিষয় আছে যেটিকে ইংরেজিতে বলে ‘জিগোলো’। ‘জিগোলো’ হচ্ছে সেই পুরুষ যে কি না বিত্তশালী নারীদের এক্সট্রা ম্যারিটাল ফ্রেন্ড হিসেবে কাজ করে। আমি সেটিও করেছি অনেকদিন। অর্থাৎ অর্থের বিনিময়ে নারীদেরকে সঙ্গ দিতাম। নারীরা আমার সঙ্গ পছন্দ করত।

তবে এগুলো অনুসরণীয় হতে পারে না। আমি চাই না আমার মতো করে কেউ জীবনযাপন করুক। তবে আমার জীবন যাপনের পুরো প্রক্রিয়ায় আমি চারটি মূল বিষয়ের ওপর বিশ্বাস রেখে চলেছি। এগুলোই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। এগুলো হচ্ছে- অক্সিজেন, শস্যদানা, প্রেম ও কবিতা। এ চারটির একটির কমতি হলে আমার বেঁচে থাকা কষ্টকর হয়ে উঠবে।

প্রশ্ন : আপনার ‘প্রস্থান’ কবিতায় আছে “একজীবনে কতোটা আর নষ্ট হবে,/ এক মানবী কতোটাই বা কষ্ট দেবে!” কবিতার এই মানবী কে?

উত্তর : কবিতার সবটাই বলাটা ঠিক হবে না। বনলতা সেন কে ছিল আমরা কি জানি? জীবনানন্দ কী তা বলে গেছেন (হা…হা…হা)?

প্রশ্ন : আপনার কবিতায় কয়েকটি চরিত্র এসেছে যেমন- হিরণবালা, সবিতা সেন, হেলেন, রানা। এরা কি কাল্পনিক নাকি আপনার জীবন থেকে নেওয়া নাম ?

উত্তর : অনেকটাই বাস্তব চরিত্র। আর বেশি বলতে চাই না। তাহলে গবেষকদের কাজ এগিয়ে দিয়ে যাওয়া হবে।

প্রশ্ন : ২০১২ বইমেলায় প্রকাশিত হলো আপনার ‘কবিতা একাত্তর’ নামের গ্রন্থটি। এটির বিষয়ে কিছু বলেন…

উত্তর : ‘কবিতা একাত্তর’ আসলে মৌলিক কোনো বই নয়। এতে ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ বইয়ের ৫৬টি কবিতা এবং নতুন ১৫টি মোট ৭১টি কবিতার বাংলা এবং ইংরেজি একত্রে মলাটবদ্ধরূপ। আমি দীর্ঘদিন ধরেই চেয়েছিলাম আমার কবিতা ইংরেজিতে রূপান্তর করা হোক। মূলত এটি করা হয়েছে ইংরেজি সংস্করণের জন্যই।

প্রশ্ন : নতুন কবিতা লিখছেন কি?

উত্তর : আমি আসলে শম্ভুক গতিতে লিখি। আর হয়তো আমি অত প্রতিভাবান নই। তাই আমাকে ভাবতে হয় বেশি। আর নতুন কবিতা লিখতে বসার আগে এক ধরনের ভীতি কাজ করে। এই ২৬ বছরেও আমি আমার ভীতিটা কাটিয়ে উঠতে পারিনি। ভীতিটা হচ্ছে ‘যে জলে আগুন জ্বলে’ নিয়ে। প্রথম গ্রন্থটি প্রকাশ হওয়ার পর এত এত প্রতিক্রিয়া পেয়েছি যে নতুন লেখায় হাত দেওয়ার আগেই ভাবতে হয়- এটি কি ‘যে জলে আগুন জ্বলে’কে অতিক্রম করতে পারবে? কিংবা কাছাকাছি থাকতে পারবে? যদি তা না হয়, তবে লিখে কি লাভ? এমন করতে করতেও কিছু কবিতা আবার জমেছে। দেখি কি করা যায়…

প্রশ্ন : আর কোনো বই করার ইচ্ছা আছে কি?

উত্তর : একটি বই করব ইচ্ছা আছে। নামও ঠিক করে ফেলেছি -‘বেদনাকে বলেছি কেঁদোনা’। দেখি কবে নাগাদ বের করতে পারি! তবে আমি আরও সময় নিতে চাই। হতে পারে এক বছর বা দুই বছর।

প্রশ্ন : এই যে পরিবার পরিজনহীন হয়ে হোটেলবাস করছেন, শেষ বয়স নিয়ে বা মৃত্যু নিয়ে কিছু ভাবেন না?

উত্তর : শৈশবে মা মারা যাওয়ার পর থেকেই আমি নিঃসঙ্গ। অনেকটা বিচ্ছিন্ন জীবনযাপন করেছি ছোটবেলা থেকেই। তাই এখন নতুন করে আর কোনো সমস্যা হচ্ছে না। এই কর্ণফুলী হোটেলে ওঠার কয়েকদিন পর একটি কবিতা লিখেছিলাম ‘সতীন’ নামে। কবিতাটি হচ্ছে- “তুমি আমার নিঃসঙ্গতার সতীন হয়েছ!”

আর মৃত্যু চিন্তা নিয়ে চিন্তা না করে মৃত্যুকে ভালোবাসলেই হয়। রবীন্দ্রনাথের কথায় বলা যায়- ‘মরণ রে, তুঁহু মম শ্যামসমান’।

প্রশ্ন : আমরা একটি শব্দ ‘অমরতা’ ব্যবহার করি। এই সম্পর্কে আপনার চিন্তা কী?

উত্তর : দেখুন জীবনানন্দ দাশ কিন্তু বেঁচে থাকতে জেনে যেতে পারেননি যে তিনি কবি। আজকে তিনি বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কবি। আমি কিন্তু রবীন্দ্রনাথকে মাথায় রেখেই বলছি। কেবল কবিতার বিচারে জীবনানন্দ বাংলা কবিতার শ্রেষ্ঠ কবি। আর রবীন্দ্রনাথ সবকিছু মিলিয়ে রবীন্দ্রনাথ। তাই ‘অমরতা’ বিষয়টি এখানে কিভাবে ব্যাখ্যা করা যায়? আর আমি আমার কথা বলতে পারি- আমি তো এক ধরনের অমরতা পেয়েই গেছি। দীর্ঘ ২৫ বছর পর ফিরে এসেও দেখছি লোকজন আমার কবিতা পড়ছেন। আমাকে মনে রেখেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *