খোদ ইন্টারপোলের প্রধানই কেন গুম হয়েছিলেন

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পুলিশ বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ের কাজ করে যে সংস্থাটি সেই ইন্টারপোলের প্রধান গত সপ্তাহে গ্রেফতার হওয়ার পর তা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।

নিখোঁজ ব্যক্তি এবং ফেরারী আসামীকে খুঁজে বের করতেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ করে এই সংস্থাটি, যার সদস্য দেশের সংখ্যা ১৯২।

‌এই ইন্টারপোলের প্রধান মেং হংওয়ে গত মাসে আকস্মিকভাবে নিখোঁজ হয়ে যান। ফ্রান্সে যখন তার কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না তখনই হঠাৎ করে জানা গেল যে তাকে চীনে আটক করা হয়েছে।

তিনি যে নিখোঁজ হয়ে গেছেন সেটাও এতোদিন গোপন রাখা হয়েছিল। শুক্রবার তাকে গ্রেফতারের পর এই খবর আকস্মিকভাবে প্রকাশ করা হয়।

কিন্তু এর আগে তার উধাও হয়ে যাওয়া নিয়ে ব্যাপক জল্পনা কল্পনা শুরু হয়ে গিয়েছিল। বলা হচ্ছিল যে তাকে চীনে পুলিশের হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।

তাকে গ্রেফতারের খবর জানাজানির হওয়ার পর চীনে কর্তৃপক্ষ ঘোষণা করেছে যে এখন তার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।

গত সেপ্টেম্বর মাসে প্রথম জানা যায় যে তার কোন খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। মি. মেং সেসময় ফ্রান্সে ইন্টারপোলের সদর দপ্তর থেকে চীনে গিয়েছিলেন।

মি. মেং এর স্ত্রী জানিয়েছেন, তার স্বামী যেদিন নিখোঁজ হয়েছেন, সেদিন তিনি তাকে একটি টেক্সট মেসেজ পাঠিয়েছিলেন যাতে একটি ছুরির ছবি বা ইমোজি ব্যবহার করা হয়েছে।

চীনে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে শীষর্স্থানীয় যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তাদের মধ্যে মেং হংওয়ে সবশেষ ব্যক্তি। দেশটিতে জননিরাপত্তা বিষয়ক ভাইস মিনিস্টারও তিনি।

চীনা কর্তৃপক্ষ এখন তার বিরুদ্ধে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ এনেছে।

চীনের জননিরাপত্তা মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া ঘোষণায় বলা হয়েছে, “সঠিক পথেই তদন্ত চলছে। এতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রেসিডেন্ট শির সরকারের কঠোর অবস্থানের চিত্রই ফুটে ওঠেছে।”

চীনে সম্প্রতি শীর্ষস্থানীয় বেশ কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তা, বিত্তশালী এবং জনপ্রিয় ব্যক্তি নিখোঁজ হয়ে গেছেন।

গত জুলাই মাসে নিখোঁজ হয়ে গিয়েছিলেন জনপ্রিয় অভিনেত্রী ফান বিংবিং। গত সপ্তাহেই তিনি আবার জনসমক্ষে হাজির হন একটি বিবৃতি দিয়ে।

 

কর ফাঁকি দেওয়া এবং অন্যান্য অপরাধের অভিযোগে তাকে যে ১৩ কোটি ডলার জরিমানা করা হয়েছিল সেটা দিতে তিনি সম্মত হন এবং একই সাথে তিনি দুঃখও প্রকাশ করেছেন।

কিন্তু এখন ইন্টারপোলের প্রধান মি. মেং হংওয়ের মতো শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি গ্রেফতার হওয়ার পর প্রশ্ন উঠেছে তিনি চীনের কোন ব্যক্তিকে ক্রুদ্ধ করে থাকতে পারেন। অথবা তিনি এমন কী করেছেন যার ফলে তার মতো একজন ব্যক্তিকে টার্গেট করা হলো।

ইন্টারপোল কী বলছে?

আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থাটি রোববার টুইটারে দেওয়া এক বিবৃতিতে বলেছে, মি. মেং এর কাছ থেকে তারা একটি পদত্যাগপত্র পেয়েছেন যা সাথে সাথেই কার্যকর হয়েছে।

বিবৃতিতে আরো জানানো হয় যে তার মেয়াদকালের যে দু’বছর বাকি রয়েছে সেই সময়ের জন্যে নতুন একজন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করা হবে। এই ভোটাভুটি হবে আগামী মাসে দুবাই-এ অনুষ্ঠেয় সাধারণ অধিবেশনে।

ইন্টারপোল শনিবার চীনের প্রতি আহবান জানিয়েছিল মি. মেং-এর অবস্থান পরিস্কার করতে। কারণ তারা তাদের প্রেসিডেন্ট কোথায় কীভাবে আছেন সেনিয়ে উদ্বিগ্ন।

তার স্ত্রী কী বলছেন?

মি. মেং নিখোঁজ হওয়ার পর ফ্রান্সে কর্তৃপক্ষ এনিয়ে তদন্ত শুরু করে। তার স্ত্রী গ্রেস মেংকে দেওয়া হয় বিশেষ নিরাপত্তা। কারণ এর আগে মি. মেং-এর স্ত্রীকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল।

 

মি. মেংকে গ্রেফতারের ব্যাপারে চীনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার কিছু আগে গ্রেস মেং সাংবাদিকদের জানান যে তিনি বড় রকমের বিপদের মধ্যে রয়েছেন।

তার স্বামীকে খুঁজে বের করার জন্যে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে তিনি অত্যন্ত আবেগঘন আবেদনও জানিয়েছিলেন।

তিনি জানান, তার স্বামী যেদিন নিখোঁজ হয়েছিলেন সেদিন সোশাল মিডিয়া থেকে একটি মেসেজ পাঠিয়েছিলেন। মি. মেং তাকে বলেন “আমার কলের জন্যে অপেক্ষা কর”, এবং তারপরই তাকে একটি ছুরির ইমোজি পাঠিয়েছিলেন তিনি।

নিরাপত্তার কারণে গ্রেস মেং তার মুখের ছবি প্রকাশ করেন নি। সাংবাদিকদেরকেও অনুরোধ করেছেন সেটা না করতে। তারপর চীনা ও ইংরেজি ভাষায় বিবৃতিটি পড়ে শোনানোর সময় তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।

কমিউনিস্ট পার্টির শক্তি

 

বিবিসির রবিন ব্রান্ট বেইজিং থেকে বলছেন, মি. মেংকে যখন দু’বছর আগে ইন্টারপোলের প্রধান করা হয়েছিল তখন একটি পত্রিকা লিখেছিল, এর মধ্য দিয়ে চীনের বিচার ব্যবস্থা সম্পর্কে সারা বিশ্ব একটি ইতিবাচক ধারণা পাবে।”

কিন্তু তখন যেটা ভাবা হয়েছিল সেটা যে ঠিকমতো কাজ করেনি সেটা তাকে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয়েছে। এটাও স্পষ্ট হয়েছে যে ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির শক্তি কতো দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।

চীনে দুর্নীতিবিরোধী নতুন সংস্থা ন্যাশনাল সুপারভিশন কমিশন বলছে, আইন ভঙ্গ করার অভিযোগে মি. মেং এব বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।

কিন্তু সেখানে পার্টির নিয়ম নীতি ভঙ্গ করার কথা বলা হয়নি।

এমন গুজবও আছে যে মি. মেং-এর বিরুদ্ধে এই ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কারণ তার সাথে হয়তো দলের এমন কোন নেতার সম্পর্ক আছে যিনি প্রেসিডেন্ট শির প্রিয়ভাজন কেউ নন।

মানবাধিকার কর্মীরা অভিযোগ করছেন যে, চীনের বর্তমান সরকারের সাথে মতবিরোধের কারণে শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিদের অনেকে গুম হয়ে যাচ্ছেন।

এই ঘটনার পর আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো হয়তো চীনের কোন কর্মকর্তাকে শীর্ষ পদে মনোনয়ন দিতে দ্বিধা করতে পারে।

কিন্তু বেইজিং গত কয়েক বছর ধরেই এধরনের পদে চীনা ব্যক্তিদের নিয়োগ দেওয়ার ওপর জোর দিয়ে আসছে।

জাতিসংঘ, আইএমএফ, বিশ্বব্যাঙ্ক এবং ইউেনস্কোর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষস্থানীয় পদে বর্তমানে বহু চীনা কর্মকর্তা কাজ করছেন।

কে এই মেং হংওয়ে?

তিনি ইন্টারপোলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন ২০১৬ সালের নভেম্বর মাসে। তার মেয়াদ ছিল ২০২০ সাল পর্যন্ত।

এই সংস্থাটির শীর্ষ পদে তিনি প্রথম চীনা কর্মকর্তা।

এর আগে তিনি ছিলেন এই সংস্থার নির্বাহী কমিটির প্রধান, যিনি সার্বিক দিক নির্দেশনা দিয়ে থাকেন।

চীনে অপরাধ মোকাবেলায় মি. মেং এর আছে ৪০ বছরের অভিজ্ঞতা। বিশেষ করে মাদক, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ এবং সন্ত্রাস মোকাবেলায়।

তাকে নির্বাচিত করার পর বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছিল যে এর ফলে চীন এখন তার রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বী, যারা দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে।

Leave a Reply