‘ছোটবেলা থেকেই ফুটবল খেলা ভালো লাগত’

বাংলাদেশের ফুটবলের সোনালী সময়ের কথা নতুন প্রজন্মের কাছে গল্পের মতো। নতুন প্রজন্ম যেখানে ক্রিকেটে বুদ হয়ে থাকে সেখানে খা খা করে ফুটবল মাঠের গ্যালারি। বাংলাদেশের ফুটবলের সংকটময় সময় কাটিয়ে কিছুটা আশার আলো দেখা দিয়েছে। বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ আন্তর্জাতিক ফুটবল টুর্নামেন্টে গ্যালারি ভর্তি দর্শক দেখেছে ফুটবলপ্রেমীরা। আন্তর্জাতিক মানের ম্যাচ হলে ফুটবল মাঠেও দর্শক হয়- এটা এখন প্রমাণিত সত্য।

বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসে প্রথম কোনো ফুটবলার হিসেবে ১৯৭৯ সালে কাজী মো. সালাহউদ্দিন বিদেশি লিগের খেলার কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন। ওই সময় তিনি হংকংয়ের ক্যারিলিন হিলের হয়ে খেলেছিলেন। এরপরই আশির দশকে তার পদাঙ্ক অনুসরণ করে অকাল প্রয়াত মোনেম মুন্না, স্ট্রাইকার শেখ মোহাম্মদ আসলাম, কায়সার হামিদ,  মো. গাউস, রুম্মন বিন ওয়ালি সাব্বির, নুরুল হক মানিক, মাহবুব হোসেন রক্সি কলকাতার মোহামেডান, ইস্ট বেঙ্গলের হয়ে খেলেছিলেন।

সর্বশেষ গেল মৌসুমে ইন্ডিয়ান সুপার লিগে (আইএসএল) অ্যাটলেটিকো ডি কলকাতার হয়ে চুক্তিবদ্ধ হন বাংলাদেশ ফুটবল দলের অধিনায়ক মামুনুল ইসলাম মামুন। বিদেশি লিগে খেলা বাংলাদেশি ফুটবলারদের তালিকায় সবাই ছেলে।

এবার সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছেন বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাসের প্রথম কোনো মেয়ে। তিনি আর কেউ নন- বাংলাদেশ জাতীয় নারী দলের ফুটবল খেলোয়াড় সাবিনা খাতুন। মালদ্বীপে ‘ক্লাব মালদ্বীপস উইমেন্স ফুটসাল ফিয়েস্তা-২০১৫’-তে পুলিশ ক্লাবের হয়ে খেলবেন সাবিনা খাতুন। এই ফুটবল প্রতিযোগিতা ১৪ মার্চ থেকে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে।বুধবার বিকেলে সাবিনা মালদিভিয়ান এয়ারলাইন্স যোগে দেশ ছাড়েন। যাওয়ার আগে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা হল তার সঙ্গে। সাক্ষাতকার আকারে সিনিউজবাংলার পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল :

প্রশ্ন : আপনার ফুটবল খেলাটার শুরু কীভাবে?
সাবিনা : ছোটবেলা থেকেই ফুটবল খেলা ভালো লাগত। স্কুলে যে খেলাধুলা হত সেখানে অংশ নিতাম। তবে জাতীয় পর্যায়ের ফুটবলে আমার উঠে আসার পেছনে সাতক্ষীরা জেলা ফুটবল কোচ আকবর স্যারের অবদান সবচেয়ে বেশি। তিনিই আমাকে সিটিসেল ন্যাশনাল চ্যাম্পিয়নশিপে খেলার সুযোগ করে দেন। এরপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।

প্রশ্ন : মালদ্বীপের ক্লাবের সঙ্গে যোগাযোগ হল কিভাবে?
সাবিনা : গেল সাফ মহিলা চ্যাম্পিয়নশিপে মালদ্বীপের বিপক্ষে আমি জোড়া গোল করেছিলাম। খেলাটি মালদ্বীপের অনেকেই দেখেছেন। ওই ম্যাচে আমার পারফরম্যান্স দেখার পর তারা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছে। পরে বাফুফের মাধ্যমে তাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হই।

প্রশ্ন : কখনো কি আপনি স্বপ্ন দেখেছিলেন বাংলাদেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশি লিগে খেলবেন?
সাবিনা : এটা আসলে আমার জন্য বড় একটি পাওয়া। আমি শুরু থেকেই ভালো ফুটবল খেলার চেষ্টা করেছি। টার্গেট ছিল জাতীয় দলের হয়ে ভালো খেলা। আর সেটার মাধ্যমে বিদেশি লিগে খেলার সুযোগ তৈরি করা। এবার সেটি সত্যি হতে যাচ্ছে।

প্রশ্ন : কি লক্ষ্য নিয়ে মালদ্বীপ যাচ্ছেন?
সাবিনা : যেটুকু জেনেছি পুলিশ ক্লাব এই টুর্নামেন্টের বর্তমান রানার্স আপ দল। তাদের হয়ে ভালো খেলতে চাই। টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা হতে চাই।

প্রশ্ন : আপনার বাবা-মায়ের অনুভূতি কি?
সাবিনা : বাবা-মা ভীষণ খুশি। প্রতিবেশি, আত্মীয়-স্বজন সবাই ইতিমধ্যে জেনে গেছে যে আমি বাইরে খেলতে যাচ্ছি। তারা এও জানে যে বাংলাদেশ থেকে প্রথম কোনো মেয়ে বিদেশে খেলতে যাচ্ছে।

প্রশ্ন : যখন আপনি খেলতে শুরু করেন তখন কেউ কি কখনো টিজ করেছিল বা কোনো প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হয়েছিলেন?
সাবিনা : না। কখনো কেউ টিজ করেনি। বা কেউ ফুটবল খেলার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতাও তৈরি করেনি। প্রতিবেশি থেকে শুরু করে সবাই বেশ উৎসাহ দিয়েছে।

প্রশ্ন : আপনি কি ওয়াসফিয়া নাজরিনকে চেনেন?
সাবিনা : হ্যাঁ চিনি। তিনি বাংলাদেশের প্রথম এভারেস্ট জয়ী নারী।

প্রশ্ন : ওয়াসফিয়া প্রথম এভারেস্ট বিজয়ী। আর আপনি বাংলাদেশের প্রথম নারী ফুটবলার, যিনি বিদেশি লিগে খেলতে যাচ্ছেন। বিষয়টিকে কিভাবে দেখছেন?
সাবিনা : অবশ্যই ভালো। খুব ভালো লাগছে। কারণ, এর আগে বাংলাদেশের কোনো নারী ফুটবলার বিদেশি লিগে খেলার সুযোগ পায়নি। আশা করছি সামনে আরো ফুটবলার বিদেশে খেলার সুযোগ পাবে।

প্রশ্ন : বাংলাদেশের নারী ফুটবলারদের জন্য মালদ্বীপে আপনি কি ভূমিকা পালন করবেন?
সাবিনা : আমি মালদ্বীপে ভালো ফুটবল খেলতে চাই। দেখাতে চাই যে বাংলাদেশের মেয়েরা অনেক দূর এগিয়ে গেছে। যাতে তারা বাংলাদেশের নারী ফুটবলারদের সম্পর্কে ভালো ধারণা পোষণ করে। পরবর্তীতে আরো বেশি নারী ফুটবলারদের তাদের দেশে খেলতে সুযোগ দেয়।

প্রশ্ন : আপনি দেখেছেন মামুনুল ইসলামকে দলে নিয়ে খেলায়নি অ্যাটলেটিকো ডি কলকাতা। মালদ্বীপে খেলার বিষয়ে আপনার প্রত্যাশা কি?
সাবিনা : ওদের যে আগ্রহ দেখেছি তাতে আমি মনে করি না তারা আমাকে সাইড বেঞ্চে বসিয়ে রাখতে মালদ্বীপে নিবে। আশা করছি তারা আমাকে খেলার সুযোগ দিবে।

প্রশ্ন : প্রথমবারের মতো বিদেশি লিগে খেলতে যাচ্ছেন। কোনো ভয় পাচ্ছেন কি?
সাবিনা : ভয় পাব কেন? এটা আমার প্রথম বিদেশ যাত্রা নয়। বাংলাদেশ দলের হয়ে এর আগেও আমি অন্যান্য দেশে খেলতে গিয়েছিলাম। সবশেষ নভেম্বরে পাকিস্তানে গিয়েছিলাম সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ খেলতে।

প্রশ্ন : পরিবারের কে কে উপার্জন করেন?
সাবিনা : বড় আপু আর মেজো আপু উপার্জন করেন। এখন আমিও করছি। বাবা উপার্জন করেন না এখন।

প্রশ্ন : বাংলাদেশকে আপনি কোথায় দেখতে চান?
সাবিনা : আমি চাই বাংলাদেশ খুব ভালো একটা জায়গায় যাক। বাংলাদেশের ফুটবলের উন্নতি হোক।

Leave a Reply