‘জনগণের প্রতিনিধি হিসেবেই আমরা ক্ষমতায় যেতে চাই’

গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী ও গণতান্ত্রিক বাম মোর্চার অন্যতম নেতা মো. জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকি। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশে তেল-গ্যাস-খনিজসম্পদসহ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দাবিতে বেশ কয়েক বছর ধরে আন্দোলন করে আসছেন। রাজনীতির পাশাপাশি লেখালেখি করেন। তিনি ২৮ এপ্রিল অনুষ্ঠেয় ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদপ্রার্থী। এ নিয়ে কিছু প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন তিনি। সাক্ষাৎকারটি হুবহু তুলে ধরা হলো :

প্রশ্ন : আপনি ও আপনাদের সংগঠন বেশ কয়েক বছর ধরে জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন দাবিতে আন্দোলন করে আসছেন। সেসব দাবি বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যেই কি ক্ষমতায় যেতে চান?

জোনায়েদ সাকি : জনগণের প্রতিনিধি হিসেবেই আমরা ক্ষমতায় যেতে চাই। যেসব দাবিতে আমরা আন্দোলন করে আসছি, তার সবগুলোই বাংলাদেশের জনগণের ভালো-মন্দের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, জড়িত ভবিষ্যতের প্রজন্মের স্বার্থের সঙ্গে। খনিজ সম্পদের ওপর মালিকানা, দুর্নীতির অবসান, কৃষকের স্বার্থরক্ষাসহ এই দাবিগুলো ফয়সালা না করা হলে বাংলাদেশের কোনো আর্থরাজনৈতিক বিকাশ ঘটবে না, আমরা পর্যুদস্ত একটি জাতি হিসেবেই থেকে যাব। মুক্তিযুদ্ধের আকাঙ্ক্ষাই ছিল একটি মর্যাদাবান জাতি হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলা, সে আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্যই আমরা নির্বাচনে যেতে চাই।

প্রশ্ন : নির্বাচনে আপনার প্রতিদ্বন্দ্বী কয়েকজন প্রার্থীর পেছনে বৃহৎ রাজনৈতিক জোটের সমর্থন আছে। ওই সব রাজনৈতিক দলের পরিচিতি আপনার জন্য কোনো সমস্যা বলে মনে করেন কি? বিষয়টি মোকাবিলা করছেন কীভাবে?

জোনায়েদ সাকি : প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের পেছনে বৃহৎ রাজনৈতিক জোটের সমর্থন নিয়ে আমরা ভাবিত না। কারণ, এসব জোট ও রাজনৈতিক দলের প্রতি মানুষের মনোভাব এখন অত্যন্ত নেতিবাচক। মানুষ এখন পরিবর্তন চায়, নতুন স্বপ্ন, নতুন পরিকল্পনা চায়। আমরা মানুষের সেই চাওয়াকে ভাষা দিতে চাই। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের পেছনে বড় দলের সমর্থন নিয়ে আমরা আদৌ চিন্তিত নই। আমরা আমাদের কর্মসূচি নিয়ে জনগণের কাছে যাচ্ছি, জনগণ আমাদের স্বতঃস্ফূর্তভাবে বরণ করছেন।

প্রশ্ন : ইশতেহারে বাসের সংখ্যা বাড়ানো এবং সাইকেলের জন্য আলাদা লেনের কথা উল্লেখ করেছেন। ঢাকায় সাইকেল আরোহীর জন্য আলাদা পথ নির্মাণ কতটা বাস্তবিক? ব্যয়সাশ্রয়ী অন্য কোনো পরিবহনের বিষয়ে বিশেষ পরিকল্পনা আছে কি?

জোনায়েদ সাকি : খেয়াল করলেই দেখবেন, ঢাকার রাস্তার একটা বড় অংশে অবৈধ পার্কিং রয়েছে। অনেকগুলো সড়কে যানজটের প্রধান কারণ এটাই। ফলে প্রতিটি বাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের জন্য পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রাখা বাধ্যতামূলক করে, অবৈধ পার্কিংয়ের জন্য জরিমানার ব্যবস্থা করে এবং গোটা ভবনকে পার্কিংয়ের জন্য বাণিজ্যিকভাবে ভাড়া দিতে উৎসাহিত করে পার্কিংয়ের সমস্যা সমাধান করা সম্ভব। পার্কিং উচ্ছেদ করে মুক্ত হওয়া স্থানটুকুর অন্তত এক-তৃতীয়াংশ সহজেই সাইকেলের জন্য পৃথক লেন হিসেবে ছেড়ে দেওয়া সম্ভব। আমাদের মনে রাখতে হবে, নগর পরিবহনের মাঝে সাইকেল সবচেয়ে কম জায়গা নেয়। এই নগরীর বাসিন্দাদের সবচেয়ে বড় অংশ তরুণ। তারা শিক্ষার্থী কিংবা কর্মজীবী। এক থেকে পাঁচ কিলোমিটারের মাঝেই বেশির ভাগ মানুষ যাতায়াত করে। এসব মানুষের কাছে সাইকেল আরামদায়ক বাহন হিসেবে বিবেচিত, সময়ও লাগে তুলনামূলক কম। সমস্যা দুর্ঘটনাজনিত নিরাপত্তার অভাববোধ। পৃথক লেন করে দিলে উচ্চবিত্ত বহু তরুণও সাইকেল নিয়েই রাস্তায় বের হবে। অন্য সব তরুণের তো কথাই নেই। এতে গাড়ির ওপর চাপ বিপুলভাবে হ্রাস পাবে। নেদারল্যান্ডস কিংবা ডেনমার্কের মতো দেশেও শহুরে গণপরিবহন হিসেবে সাইকেল সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়। এটাকে নগর সংস্কৃতির অংশে পরিণত করা গেলে, নিরাপদ ও গ্রহণীয় করা গেলে, শিক্ষার্থী, চাকরিজীবীসহ তরুণ সমাজের বড় অংশ এটাকে বাহন হিসেবে গ্রহণ করবেন। এতে যানজট অনেক কমে যাবে। উন্নত বহু দেশের অভিজ্ঞতা তাই বলে। বিশেষ করে যেসব নগরে রাস্তার ঘাটতি আছে, সেখানে সাইকেলকে প্রধান বাহন হিসেবে রীতিমতো উৎসাহিত করা হয়, যেমন—কোপেনহেগেন। সাইকেল স্বাস্থ্যকর এবং দূষণমুক্ত, এটাও একটা বড় কারণ।

মেট্রোরেল এবং এ জাতীয় বাহনও নাগরিকদের জন্য সাশ্রয়ী। সেগুলোর জন্যও যথোপযুক্ত ব্যবস্থা আমরা নেব। তবে কম দূরত্বের যাত্রীদের জন্য নগর পরিবহন হিসেবে সাইকেলকেই নগর পরিকল্পনাবিদরা সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।

প্রশ্ন : যানজট নিরসনে আপনার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা আছে কি? রাজধানীর আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকার জন্য বিশেষ কোনো পরিকল্পনার প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন?

জোনায়েদ সাকি : যানজট নিরসনে আমাদের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা আছে। সেটা সাইকেল উৎসাহিত করার পাশাপাশি বৃহদাকার বাস সার্ভিস চালু করে গণপরিবহনকে আরামদায়ক ও নিরাপদ করে ব্যক্তিগত পরিবহনকে নিরুৎসাহিত করার পাশাপাশি পার্কিং উচ্ছেদ পর্যন্ত বিস্তৃত। আবাসিক ও বাণিজ্যিক এলাকার বিষয়ে আমাদের ইশতেহারে আমরা বলেছি : ঢাকা নগরীর পরিকল্পনাহীনতার একটি বড় কারণ আবাসিক এলাকা হিসেবে তৈরি করা অঞ্চলে গড়ে ওঠা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও শিল্পকারখানা। এর ফলে একদিকে ভবনগুলোর আকৃতি বদলে ফেলা হয়, যানবাহনের সংখ্যা বহুগুণ বেড়ে যায় এবং যানজটের সৃষ্টি হয়। আবাসিক এলাকা ও বাণিজ্যিক এলাকা, শিল্পাঞ্চল সব দেশেই পৃথক থাকে। ঢাকার আবাসিক অঞ্চলগুলোর চরিত্র ফেরত আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে, নতুন এলাকাগুলোতে কঠোরভাবে তা বজায় রাখার ব্যবস্থা করা হবে।

প্রশ্ন : আধুনিক রাজধানী হিসেবে ঢাকার অবকাঠামো কেমন হওয়া উচিত বলে মনে করেন? ইশতেহারে এ বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো বক্তব্য দেখা যায়নি। আপনার মতামত কী?

জোনায়েদ সাকি : অবকাঠামো বলতে পরিবহন, আবাসন, বিনোদন, পয়ঃনিষ্কাশনসমেত সামগ্রিক কাঠামোগত প্রস্তুতিকেই বোঝানো হয়। সেই অর্থে পৃথকভাবে প্রতিটি প্রশ্নেই যথাসম্ভব অবকাঠামোগত পরিকল্পনা আমাদের ইশতেহারে পাওয়া যাবে। আমাদের ইশতেহারের ১৭ ধারাক্রমের অনুচ্ছেদটিতে আমরা বলেছি : উৎপাদনশীলতা বিকাশের উপযোগী নগর-কাঠামো গড়ে তোলা।

ঢাকার উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে না পারলে নগরবাসীর জন্য মানবিক জীবন নিশ্চিত করাও শেষ বিচারে অসম্ভব হয়ে পড়বে। কিংবা অন্যদিক দিয়ে বলা যায়, নগরবাসীর আবাসন, পরিবহন, স্বাস্থ্য ও অন্যান্য পরিষেবা নিশ্চিত করার একটা অন্যতম লক্ষ্য নগরীকে উৎপাদনমুখী করা। ঢাকা নগরী বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হলেও এর মাথাপিছু গড় উৎপাদনশীলতা যথেষ্ট নয়। এর প্রধান কারণ অবকাঠামোগত অসুবিধা। যানজট একদিকে নগরবাসীর গতিকে কমিয়ে রেখে উৎপাদনশীলতাকে স্থবির করে রেখেছে, অন্যদিকে আধুনিক প্রযুক্তির সহজ প্রাপ্যতার অভাবও প্রকট। স্বাস্থ্যগত সমস্যাও উৎপাদনশীলতা হ্রাসের জন্য দায়ী। নগর কর্তৃপক্ষ বৃহদাকার আবাসন প্রকল্পের মাধ্যমে একদিকে যেমন দরিদ্র মানুষের জীবনে স্বচ্ছন্দতর করতে পারে, অন্যদিকে এটা শ্রমিক হিসেবে তার দক্ষতা বৃদ্ধিরও অত্যাবশ্যক শর্ত। সুলভে আরামদায়ক পরিবহন শুধু জীবনকে সুখী করে না, যথাসময়ে কর্মস্থলে যাওয়ার নিশ্চয়তাও দেয়। অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধা যৌথভাবে সুলভে নিশ্চিত করা গেলে তা সকলেরই উপকারে আসে, অন্যদিকে ব্যক্তিগত উদ্যোগে তা করা হলে তা বিলাস কিংবা বিশেষ সুবিধায় পর্যবসিত হয়।

ঢাকার বর্তমান পরিস্থিতি উদ্যোক্তাদের যেমন নিরুৎসাহিত করে, তেমনি নগরবাসীর জীবনকেও তা কষ্টসাধ্য করে তুলছে। আমরা নির্বাচিত হলে সকলের স্বার্থ অটুট রেখে ঢাকার উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির জন্য যথাসম্ভব অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি। এর মাঝে থাকবে শ্রমজীবীদের জন্য আবাসন প্রকল্প, পরিবহন প্রকল্প, দেশীয় শিল্পের বিকাশ সাধনের উপযুক্ত প্রণোদনা, তথ্যপ্রযুক্তিগত সহায়তা, বিদ্যুৎ-জ্বালানিসহ অন্যান্য ব্যবস্থাপনা।

প্রশ্ন : নগরীর প্রতিটি থানায় উন্নত চিকিৎসা সুবিধাকেন্দ্র স্থাপনের কথা বলেছেন। এর কোনো নমুনা উপস্থাপন করা যাবে?

জোনায়েদ সাকি : দুঃখের সঙ্গে বলা যায় যে, এটির নমুনা বর্তমানে দেশে নেই। বিদ্যমান স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো মানুষ ব্যবহার করতে আগ্রহী হয় না অপ্রতুল সুবিধার কারণে। বহু ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের অনুপস্থিতি ও বাণিজ্যিক মনোভাবও মানুষের নিরুৎসাহিতার পেছনে ভূমিকা রাখে।

প্রশ্ন : নগরীর সংস্কৃতি চর্চাকেন্দ্র গুলো দীর্ঘদিন ধরে প্রধান দুটি দলের নিয়ন্ত্রণে আছে বলে অভিযোগ আছে। এ সমস্যা সমাধানের কার্যকর পথ কী বলে মনে করেন?

জোনায়েদ সাকি : আমরা চাই পুরো নগরীই হোক একটি জীবন্ত সংস্কৃতির কেন্দ্র। সে কারণে ইশতেহারে আমরা সংস্কৃতি ও বিনোদন বিষয়ে বিস্তারিত ভাবনা তুলে ধরেছি। সেটা থেকে কিছুটা উদ্ধৃত করা যাক : সাংস্কৃতিক দিক দিয়ে ঢাকা নগরী প্রায় বদ্ধ জলাশয়ের মতো। ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত উদ্যোগে কিছু কাজ এখানে থাকলেও নাগরিকদের জীবন সংস্কৃতির ছোঁয়াহীন, বিনোদনের অধিকারহীন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নারী-পুরুষ সকলের জন্য পরমতসহিষ্ণু, অসাম্প্রদায়িক ও সম্প্রীতির পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য প্রাণবন্ত ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্র হিসেবে আমরা গড়ে তুলতে চাই আগামীর নগরকে। এমনকি হাসপাতালের বাগান রচনায়ও যেন উদ্যান বিশেষজ্ঞ এবং শিল্পীর ভাবনার ছোঁয়া থাকে, সেভাবেই আমরা নগরকে ভাবতে চাই। নির্মাণকাজে শৈল্পিক পরিকল্পনা, সড়কের বনায়নের পরিকল্পনা, উদ্যানসহ উন্মুক্ত স্থানে ভাস্কর্য স্থাপন, নিয়মিত সংগীত, চলচ্চিত্র, চিত্রকলার উৎসব আয়োজন ও পৃষ্ঠপোষকতা নগর কর্তৃপক্ষের কাজের অংশ হবে।

ওয়ার্ডের বড় মাঠগুলোতে পথনাটক ও অন্যান্য সাংস্কৃতিক উপস্থাপনার স্থান রাখা হবে। ভ্রাম্যমাণ পাঠাগার ও সাংস্কৃতিক পরিব্রাজক দল বিদ্যালয় ও আবাসিক অঞ্চলগুলোতে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে। ঢাকার নদীগুলোর তীরবর্তী অঞ্চলগুলোকে দখলমুক্ত করে সেগুলোকে ভ্রমণ ও বিনোদনের অঞ্চলে পরিণত করা হবে।

এই নগরী যেন তার সাংস্কৃতিক সত্তা প্রতিনিয়ত নির্মাণ ও অনুসন্ধান করতে পারে, প্রতিটি নাগরিক যেন সংস্কৃতি আর ঐতিহ্যের পরিমণ্ডলে বেড়ে ওঠেন, তার জন্য প্রয়োজনীয় সব উদ্যোগ নগর কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করবে। ঢাকার প্রাচীন সব নিদর্শন, বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবাহী স্থান ও গণকবরগুলোসহ বিভিন্ন সংগ্রামের স্মৃতিবাহী স্থানগুলোর সংরক্ষণ ও সেগুলোকে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে পরিচিতকরণকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। ছোট-বড় নানান আকৃতির নতুন নতুন নাট্যশালা, সিনেপ্লেক্স, ললিতকলা কেন্দ্র, গাঠাগার, মিলনায়তন, সংগ্রহশালা গড়ে তুলে নগরের সংস্কৃতি চর্চায় নতুন প্রাণসঞ্চার করা হবে। সংগঠন ও যূথবদ্ধতাকে উৎসাহিত করা হবে। বিজ্ঞান সংগঠন, শিশু-কিশোর সংগঠন, সাংস্কৃতিক সংগঠনকে উৎসাহিত করা হবে।

প্রশ্ন : খাদ্যে ভেজাল-বিষক্রিয়ারোধে কঠোর মান নিয়ন্ত্রণে তদারকি ব্যবস্থার কথা বলেছেন। এটা বাস্তবায়নের পথ কী বলে মনে করেন?

জোনায়েদ সাকি : ভেজাল প্রতিরোধের প্রধান উপায় হলো নাগরিক সম্পৃক্ততা বৃদ্ধি। ঢাকা শহরের মানুষ একদিকে খাদ্যে ভেজালের শিকার। এ-সংক্রান্ত আইনগুলোও মানার কোনো বন্দোবস্ত নেই। ফরমালিন, ভেজাল উপাদান, ট্যানারি বর্জ্য দিয়ে তৈরি করা পোলট্রি ফিডসহ মানহীন খাদ্যের কারণে নগরবাসী ভয়াবহ স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন, আক্রান্ত হচ্ছেন ক্যানসার, চর্মরোগ, পেটের পীড়া, স্নায়বিক রোগসহ অনেক অসুখে। অন্যদিকে এটা বন্ধ করার যে সরকারি বন্দোবস্ত আছে, সেটাও দুর্নীতির খপ্পরে পড়ে অকার্যকর।

খাদ্যে প্রতারণা প্রতিরোধে মহানগরীর আওতাধীন এলাকায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক তদারককারী নিয়োগ দেওয়া হবে খাদ্যে ভেজাল ও বিষক্রিয়া ঠেকানোর জন্য। এই তদারককারীদের জনগণের তদারকির আওতায় আনা হবে। প্রতিটি পাড়া-মহল্লা-অঞ্চলের দায়িত্বশীল নাগরিকরা পালাক্রমে এই তদারককারীদের সঙ্গে উপস্থিত থাকবেন, নিজেরাও প্রশিক্ষিত হবেন। ভেজাল প্রতিরোধ ব্যবস্থা এর মধ্য দিয়ে যথাযথ তদারকির আওতায় আসবে; যে নাগরিকরা ভেজালে আক্রান্ত, তারা স্বয়ং নিজেরাই পাহারাদারের ভূমিকা পালন করায় এবং এই কাজে প্রশিক্ষিত হওয়ায় ভেজাল প্রতিরোধে জনশক্তিও বৃদ্ধি পাবে, দুর্নীতিও হ্রাস পাবে।

প্রশ্ন : বাড়িভাড়া বাজারমূল্য অনুযায়ী নির্ধারণ করতে সুনির্দিষ্ট কী কী পদক্ষেপ নেবেন?

জোনায়েদ সাকি : প্রথমত, সমগ্র ঢাকা শহরের বাড়ির মূল্যের একটা হালনাগাদ জরিপ পরিচালনা করা হবে। তারপর প্রতিটি অঞ্চলে মূল্য ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাভেদে সর্বোচ্চ বাড়িভাড়া নির্ধারণ করে দেওয়া হবে। প্রতিবছর কতটুকু বাড়ি ভাড়া বৃদ্ধি করা যাবে, সেই আইনকে কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। প্রয়োজনে নগর কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে পৃথক আদালতের ব্যবস্থা করতে পারে, যেখানে এ বিষয়ক বিবাদগুলো নিষ্পত্তি করা সম্ভব হবে।

প্রশ্ন : বাংলাদেশে নগর সরকার নেই। এমন সরকার গঠনের দাবিতে ভবিষ্যতে বা এখনই কী ধরনের উদ্যোগ নেবেন?

জোনায়েদ সাকি : আমরা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি নগর সরকার গঠনের জনরায় গ্রহণের জন্য। নগর সরকারের কাজ হলো নগরের প্রতিটি বিষয়ে তদারকি, পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের সক্ষমতা অর্জন। আমরা মনে করি, ঢাকা নগরীর বিদ্যমান সম্ভাব্য আয় যা হওয়ার কথা, তা আদায় করা গেলে এই পরিকল্পনা গ্রহণে কোনো বাধা থাকবে না। সরকারের ওপর নির্ভরশীলতা কমে আসবে। দুর্নীতি ও অপচয় কমিয়েও তা করা যাবে।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের সংবিধানে স্থানীয় সরকারের স্বশাসনকে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। তার কর আরোপ করার এখতিয়ারকে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। আমরা সংবিধানের সেই ধারাগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেব, প্রয়োজনে এটা নিয়ে আদালতের দ্বারস্থও হব।

প্রশ্ন : ক্ষমতায় গেলে শ্রমিকের ন্যূনতম মজুরি বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছেন। কিন্তু বিষয়টি বাস্তবায়নের এখতিয়ার সিটি মেয়রের নেই। এ বিষয়ে আপনার ভিন্ন কোনো পরিকল্পনা আছে কি?

জোনায়েদ সাকি : মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশেও দেখা যাবে ভিন্ন ভিন্ন রাজ্য ও নগরভেদে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ করা থাকে। কেননা, নগরে মানুষের ব্যয় বাকি দেশের চেয়ে বেশি থাকে।

এটা নগরের স্বাভাবিক অর্থনৈতিক গতিকে ঠিকঠাক রাখার জন্যই দরকার। আমরা তাই ন্যূনতম একটা মজুরি নির্ধারণ করে দেব, যেটা ঢাকা শহরে একজন শ্রমিকের পরিবারসহ মানবিকভাবে বেঁচে থাকার জন্য দরকার। নগর সরকার বাস্তবায়ন করা গেলে এই উদ্যোগটির আইনি বাধ্যবাধকতাও তৈরি করা সম্ভব হবে। শুধু তাই নয়, সরকারি যে কর্মচারীরা ঢাকা নগরে বাস করেন, তাঁদের জন্যও নগর কর্তৃপক্ষ একটা বাড়তি প্রণোদনা ভাতা দিতে সক্ষম এবং সেটা দেওয়া উচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares