জনগণের মন জয় করেই ভোটে জিততে হবে: প্রধানমন্ত্রী

জনগণের মন জয় করেই আগামী নির্বাচনে জয়লাভের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য নেতাকর্মী ও দলীয় এমপিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

তিনি বলেছেন, ভোটচুরি ও ভোটডাকাতি করে কেউ জিততে পারবেন না। আওয়ামী লীগ এ বদনাম নেবেও না। জনগণের মনজয় করেই জিততে হবে, ক্ষমতায় আসতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যাকেই নৌকার প্রার্থী করা হবে- তার পক্ষেই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। এখন থেকেই ঘরে ঘরে নৌকার পক্ষে ভোট চাইতে হবে। জনগণের কাছে সরকারের উন্নয়নকাজ তুলে ধরতে হবে।

শনিবার প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে আওয়ামী লীগের বিশেষ বর্ধিত সভায় শেখ হাসিনা এসব কথা বলেন।

দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী হয়েও দলের বদনামকারী নেতারা আগামী জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাবেন না বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, স্বপ্রণোদিতভাবে নির্বাচনের প্রার্থী হয়েই অনেকে দল ও দলীয় এমপিসহ অন্য প্রার্থীদের বিরুদ্ধে বদনাম শুরু করে দিয়েছেন। এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না।

তিনি বলেন, সরকারের উন্নয়নকাজের প্রচার না করে যারা দলের বিরুদ্ধে কথা বলবেন- তারা কখনোই দলের মনোনয়ন পাবেন না। জনগণের কল্যাণে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, দুর্নীতিতে সম্পৃক্ত না থাকা এবং তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের মূল্যায়ন করার ওপরই মনোনয়ন পাওয়া নির্ভর করবে।

দলের ৬৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এই বর্ধিত সভার আগে প্রধানমন্ত্রী নেতাকর্মীদের নিয়ে ধানমণ্ডি বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন এবং বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে দলের নবনির্মিত কেন্দ্রীয় কার্যালয় ভবনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনও করেন।

দুর্নীতি মামলার রায়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জেলে যাওয়ার পর তার ছেলে তারেক রহমানকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন করার কঠোর সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অবৈধ ক্ষমতা দখল করে গঠিত দল বিএনপি জনগণকে কী দিতে পারে? তারা কেবল চুরি করতে পারে। তাদের নেত্রী এখন এতিমের টাকাচুরির অপরাধে জেলে। তার অবর্তমানে দলটির চেয়ারপারসন করা হয়েছে এমন একজনকে- যিনি কিনা দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত, পলাতক।

তিনি বলেন, তাদের (বিএনপি) গঠনতন্ত্রে ছিল কেউ দুর্নীতির দায়ে সাজা পেলে দলের নেতা হতে পারবেন না। দলের গঠনতন্ত্রে পরিবর্তন এনে দুর্নীতিবাজদের দলীয় প্রধান করার সুযোগ তৈরি করে তারা প্রমাণ করেছে – বিএনপি দুর্নীতিবাজদের দল।

দলের মধ্যে বিএনপি-জামায়াতসহ ভিন্ন আদর্শের ব্যক্তিদের অনুপ্রবেশ ঘটানোর বিরুদ্ধে নেতাদের সতর্ক করে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দল যেহেতু ক্ষমতায় অনেকেই দলে ভিড়তে চায়। অনেকে গ্রুপ ভারি করতে বাছবিচার না করে এদের দলে ভেড়ান। মনে রাখবেন, এরা মধু খেতে আসে, কাজ করতে আসে না। এরা কখনো আপন হবে না। নিজের লোককে আপন না করে, এদের কাছে টানবেন না। এরা দলে এসে খুন খারাবি করে বলবে- দলের লোক খুন করেছে। কাজেই কেউ যদি এদের প্রশ্রয় দিয়ে থাকেন, এখনই বিদায় করুন।

সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ ও মাদকের বিরুদ্ধে তার সরকারের দৃঢ় অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে তিনি বলেন, এদেশে জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস ও মাদকের স্থান হবে না। সেজন্যই সরকার মাদকবিরোধী অভিযান শুরু করেছে। এই অভিযান অব্যাহত থাকবে। জনগণের ভাগ্য নিয়ে আরও কাউকে ছিনিমিনি খেলতে দেওয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন শেখ হাসিনা।

আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে বিশেষ বর্ধিত সভায় দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদ, উপদেষ্টা পরিষদ, জাতীয় কমিটি, জেলা/মহানগর ও উপজেলা এবং ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণের অন্তর্গত প্রতিটি থানার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক, দলীয় সংসদ সদস্য, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান (পুরুষ ও মহিলা), সিটি করপোরেশন ও পৌর মেয়র এবং সব সহযোগী-ভাতৃপ্রতীম সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকরা উপস্থিত ছিলেন।

সবমিলিয়ে ৪ হাজার ১৫৭ জন নেতা সভায় যোগ দেন। বিপুল সংখ্যক তৃণমূল নেতার উপস্থিতিতে সভাস্থলে উৎসবমুখর পরিবেশের সূচনা ঘটে।

সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। শুরুতে সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের ওপর প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন ও বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ থেকে পাঠের পর শোক প্রস্তাব উপস্থাপন করেন দলের দপ্তর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ।

এরপর দলীয় প্রধান শেখ হাসিনার বক্তব্যের পর সারাদেশ থেকে আসা তৃণমূল নেতাদের মধ্যে আটটি বিভাগ থেকে আটজন বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ পান। সবশেষে আরেক দফা বক্তব্য দিয়ে বর্ধিত সভার সমাপ্তি টানেন প্রধানমন্ত্রী। গোটা অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন দলের প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ।

প্রধানমন্ত্রীর তার বক্তব্যের শুরুতে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার ইতিহাস এবং ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ ও দেশের স্বাধীনতা অর্জন, গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং জনগণের ভোট ও ভাতের অধিকার আদায়ে দেশের সর্ববৃহৎ ও প্রাচীনতম এই দলটির গৌরবজ্জ্বল ভূমিকার কথা তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাস লিখতে গেলে আওয়ামী লীগের ইতিহাস এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জীবনীই লিখতে হয়। একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়েই জাতির পিতা এই দল সৃষ্টি করেছেন। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাই হয়েছে বাঙালির জাতির মুক্তির জন্য। এদেশের মানুষের প্রতিটি অর্জনের সঙ্গেই এই দলটি ওতপ্রোতোভাবে জড়িত। বাঙালির যা কিছু অর্জন, তা আওয়ামী লীগের হাত ধরেই, আওয়ামী লীগের সময়েই।

পঁচাত্তরে সপরিবারে বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর সামরিক স্বৈরশাসকদের হত্যা-ক্যু-ষড়যন্ত্রের রাজনীতি ও দুঃশাসন এবং নিজের দুঃসহ প্রবাসজীবনের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা।

অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘মা-বাবা ভাইদের হারানোর শোককে বুকে চেপে দেশে ফিরে এসেছিলাম। আওয়ামী লীগের অগণিত নেতাকর্মী আমাকে ভালোবাসা দিয়েছেন, দলের সভানেত্রী করেছেন। আমি পরিবার হারিয়েছি, কিন্তু আওয়ামী লীগকে পরিবার হিসেবে পেয়েছি। আওয়ামী লীগই আমার পরিবার। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাই আমার আপনজন।’

দলের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখার পাশাপাশি ত্যাগের মনোভাব নিয়ে নেতাকর্মীদের কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, রাজনীতি যদি সঠিক হয় এবং সদিচ্ছা যদি থাকে তাহলে দেশের উন্নয়ন সম্ভব- সেটি আওয়ামী লীগই প্রমাণ করেছে। আওয়ামী লীগ সম্পদ অর্জনের জন্য নয়, বিলাসব্যাসনের জন্য নয়। আওয়ামী লীগ মানে জনকল্যাণ। নেতাকর্মীদের মনে রাখতে হবে নিজে কী পেলাম না পেলাম- সেটি বড় কথা নয়, দেশকে কী দিতে পারলাম সেটিই বড় কথা। তাই ত্যাগের মনোভাব নিয়ে জনগণের জন্য কাজ করতে হবে।

আগামী নির্বাচনের প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মনে রাখতে হবে নির্বাচন সবসময় চ্যালেঞ্জিং। নির্বাচনে জনগণ ভোট দেবে। কিন্তু ওই ভোটচুরি, ভোট ডাকাতি- যার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছি; সেভাবে কেউ জিততে পারবেন না। জনগণ স্বতঃস্ম্ফূর্ত হয়ে কাজে খুশি হয়ে ভোট দেবে। জনগণের মনজয় করেই ক্ষমতায় আসতে হবে যেন আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ গড়ার লক্ষ্য পূরণ হয়।

তিনি বলেন, জনগণের ভোটের অধিকার নিয়ে কেউ কিন্তু ছিনিমিনি খেলতে পারবে না। নির্বাচনের স্বচ্ছতার জন্য স্বচ্ছ ব্যালটবাপ, ছবিসহ ভোটার তালিকা- যা কিছু আওয়ামী লীগের প্রস্তাবেই হয়েছে। তাই নির্বাচন যেন স্বচ্ছ হয়, নির্বাচন নিয়ে যেন কেউ কোনো কথা বলতে না পারে। ১৯৯৬ সালে বিএনপি ১৫ ফেব্রুয়ারি মার্কা নির্বাচন করেছে। ওই নির্বাচনে জনগণ ভোট দেয়নি। যার কারণে আন্দোলনের মুখে ৩০ মার্চ খালেদা জিয়া পদত্যাগে বাধ্য হয়েছিলেন। ওই ধরনের বদনামের দায় আওয়ামী লীগ নেবে না।

গত দুই নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় আগামী নির্বাচনেও মহাজোট থাকবে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের স্বার্থে আওয়ামী লীগ জোট করেছে, মহাজোট করেছে। আগামীতেও করবে। কারণ আওয়ামী লীগ বন্ধু হারাবে না। তবে মনে রাখতে হবে, আওয়ামী লীগ সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বড় দল। আওয়ামী লীগের দায়িত্ব বেশি। তাই যাকে নৌকার মনোনয়ন দেওয়া হবে, মহাজোট থেকে প্রার্থী করা হবে- সবাই মিলে তার জন্য কাজ করবেন।

নৌকা প্রতীকে স্বপ্রণোদিত প্রার্থী হয়ে যারা প্রচারণা চালাচ্ছেন- তাদের সর্তক করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তারা বিএনপি-জামায়াতের অপকর্ম ও সরকারের উন্নয়নের কথা জনগণের কাছে বলেন না। বরং দলের এমপি ও দলের বিরুদ্ধে কথা বলেন। মনে রাখবেন, দলের বদনাম হলে ও দলের বিরুদ্ধে কথা বললে জনগণও ভোট দেবে না।

বর্তমান এমপিদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, মনে রাখবেন জনগণ এখন অনেক বেশি সচেতন। ডিজিটাল যুগ, জনগণের চোখও খুলে গেছে। এখন দুর্নীতি করলেও মানুষ মনে রাখে। সংসদ সদস্যদের বলবো, কারও কাছ থেকে টাকা নিয়ে কাজ দিলে পরে ভোট চাইতে গেলে জনগণই বলবে টাকা নিয়ে কাজ করেছেন- ভোট দেবো কেন? আর কেউ মনোনয়ন পাবেন কী পাবেন না- সেটি নির্ভর করবে জনগণের কতটুকু উন্নয়ন করেছেন, দুর্নীতি করেছেন নেতাকর্মীদের কতটুকু মূল্যায়ন করেছেন- তার ওপর।

টানা দুই মেয়াদে তার সরকারের নয় বছরের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং ২০২০ বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী আমরা পালন করবো একটি ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে। আর ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশ হবে দক্ষিণ এশিয়ার উন্নত সমৃদ্ধ দেশ। সেই লক্ষ্য নিয়েই সরকার কাজ করে যাচ্ছে।

সূত্র: সমকাল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *