জাতিসংঘে মিয়ানমারবিরোধী প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা

মিয়ানমারে মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত করার জন্য একটি নিরপেক্ষ কর্মপন্থা (মেকানিজম) প্রতিষ্ঠার তাগিদ দিয়ে একটি খসড়া প্রস্তাব বিবেচনা করছে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের থার্ড কমিটি। আগামী শুক্রবার (১৬ নভেম্বর) ভোটাভুটিতে এটি পাস হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রস্তাবটি এমন সময়ে বিবেচনা করা হচ্ছে যখন বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গাদের প্রথম দলের প্রত্যাবাসন প্রায় চূড়ান্ত।
সরকারের একজন কর্মকর্তা বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘থার্ড কমিটিতে এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা এটি প্রমাণ করে যে মানবতাবিরোধী অপরাধ একটি আন্তর্জাতিক বিষয় এবং যখনই এ ধরনের অপরাধ হয় তখন সারাবিশ্ব নিন্দা করে।’
তিনি জানান, জাতিসংঘের এই মেকানিজম মিয়ানমারে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রমাণ সংগ্রহ করে রিপোর্ট পেশ করবে এবং এই প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে পৃথিবীর যেকোনও দেশে মিয়ানমারের অপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলা করা যাবে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) মিয়ানমারের অপরাধ বিষয়ে মামলা পরিচালনা করার জন্য প্রমাণ সংগ্রহ করছে এবং জাতিসংঘের এই মেকানিজম তাদের এই প্রচেষ্টাকে আরও মজবুত করবে।
থার্ড কমিটির প্রস্তাবটি ৯৯টি দেশ কো-স্পনসর করছে।
গত বছরেও থার্ড কমিটিতে রোহিঙ্গা সমস্যার বিষয়ে চরম উদ্বেগ প্রকাশ করে একটি প্রস্তাব পাস হয়। ওই প্রস্তাবটি ৯৭টি দেশ কো-স্পনসর করেছিল।
খসড়া প্রস্তাবে বলা হয়েছে, রাখাইনে মুসলিমরা মিয়ানমারের স্বাধীনতার আগে থেকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম বসবাস করছে। এতে ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন পুনর্বিবেচনা করে রোহিঙ্গাদের পূর্ণ নাগরিকত্ব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। রোহিঙ্গাদের ওপর যারা অত্যাচার করেছে তাদের বিচারের আওতায় আনার জন্য বলা হয়েছে মিয়ানমার সরকারকে।
গত মাসে থার্ড কমিটিতে ‘মিয়ানমারের মানবাধিকার পরিস্থিতি’ শিরোনামে মিশর এই খসড়া প্রস্তাব জমা দেয়। এর কো-স্পনসর ছিল প্রায় ১০০টি দেশ। এই প্রস্তাবে শুধু রোহিঙ্গা সমস্যা উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে ২০১৫ সালে অং সান সু চি সরকার গঠনের আগে একই শিরোনাম একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল। কিন্তু সেখানে মিয়ানমারের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও গণতান্ত্রিক পরিবেশের ওপর জোর দেওয়া হয়েছিল। সেই প্রস্তাবে ১৯টি প্যারার মধ্যে রোহিঙ্গা বিষয়ে ছিল মাত্র একটি।
বর্তমান প্রস্তাবে মিয়ানমারের মানবাধিকার লঙ্ঘন তদন্তের জন্য দ্রুততার সঙ্গে নিরপেক্ষ মেকানিজম প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিয়ে বলা হয়েছে, মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর ওপর যেন বেসামরিক সরকারের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। রাখাইনে সামরিক অভিযানের কারণে নিয়মতান্ত্রিকভাবে রোহিঙ্গাদের মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে। এই অভিযান বন্ধ করাসহ দোষীদের বিচারের আওতায় আনা হোক।
এখানে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের পালিয়ে আসা রোহিঙ্গারা যেন নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে রাখাইনে ফেরত যেতে পারে এবং রাখাইনে যেন জাতিসংঘসহ অন্যান্য সাহায্য সংস্থা কাজ করতে পারে।
জাতিসংঘের মহাসচিবকে ‘মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষ দূত’ নিয়োগ দেওয়ার প্রশংসা করে এতে বলা হয়েছে, জাতিসংঘ যেন মিয়ানমারকে সহায়তার প্রস্তাব করে।
এছাড়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনসহ সব ধরনের সমস্যা সমাধানের জন্য বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সহযোগিতাকে উৎসাহিত করা হয়েছে।
রাখাইনে সহিংসতা বন্ধ, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন, নাগরিকত্ব প্রদান, কফি আনান কমিশন রিপোর্টের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন বিষয় এই প্রস্তাবে অন্তভুর্ক্ত করা হয়েছে।
২০১৭ সালের প্রস্তাব
গত বছরের প্রস্তাবে ৯৭টি দেশ কো-স্পনসর ছিল। এছাড়া অনেক দেশ আছে যারা কো-স্পনসর হয়নি, তারা এর পক্ষে ভোট দিয়েছে।
এই প্রস্তাবের বিপক্ষে ভোট দিয়েছিল চীন, রাশিয়াসহ ১০ দেশ। পক্ষে ভোট দিয়েছিল ১৩৫টি দেশ। ভারত, ইন্দোনেশিয়াসহ ২৬টি দেশ ভোটদানে বিরত ছিল।