জেনেটিক্স ও ক্যান্সারের সম্পর্ক

আমাদের দেহে আছে ৫০ লাখেরও বেশি ক্ষুদ্র কোষ। আর এই কোষগুলোর প্রায় প্রতিটিতেই রয়েছে এমন সব নির্দেশনা যেগুলো আমাদের গড়ে ওঠার সহায়ক।

আর এই নির্দেশনাগুলোই ডিএনএ নামক অনুকোষে সঙ্কেতাকারে লেখা থাকে। ডিএনএন গড়ে ওঠে ক্রোমোজমের সমন্বয়ে। মানবদেহে ২৩ জোড়া ক্রোমোজম থাকে।

আামাদের দৈহিক কার্যক্রম গড়া, নিয়ন্ত্রণ এবং বজায় রাখার নির্দেশনাগুলোকে বলা হয় জিন।

ক্রোমোজন যদি হয় রেসিপি বই জিন হলো সেই বইয়ের একটি একক রেসিপি। আমরা যদি সেই বইটি পুনরায় লিখি বা একাধিক কপি তৈরি করি তাহলে এতে ভুল হতে পারে।

এই ভুলের কারণেই জিনগত পরিবর্তন বা বিকৃতি দেখা দেয়। জিনগত পরিবর্তন বা বিকৃতি হলে ডিএনএন-তে বানান ভুল করার মতো। এই বিকৃতি আসে অনেকসময় বাবা-মা’র কাছ থেকে। অথবা জীবদ্দশায় স্বত:স্ফূর্তভাবেও তা ঘটতে পারে। আর সাধারণত ফুসফুস এবং পাকস্থলিতে এই জিনগত মিউটেশন ঘটে।

পরিবেশ দূষণ, সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির বিকিরণ বা দেহকোষগুলোর নিত্য পুনরুৎপাদন প্রক্রিয়ার সময় ডিএনএ’র প্রতিলিপি তৈরির সময় এই জিনগত বিকৃতি বা পরিবর্তন ঘটতে পারে।

আমাদের দেহে প্রতিনিয়তই মৃত কোষগুলোর জায়গায় নতুন কোষ তৈরি হয় কোষ উৎপাদন এবং বিভাজনের একটি সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে।

কিন্তু কখনো কখনো এই প্রক্রিয়ায় ব্যাঘাত ঘটতে পারে। মিউটেশনের মাধ্যমে কোষ বিভাজন নিয়ন্ত্রণ করে এমন কোনো জিন সক্রিয় হয়ে যেতে পারে। এবং কোষ উৎপাদন নিয়ন্ত্রণ করে এমন জিন নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়তে পারে।

এর ফলে কোনো কোষ এর বিভাজন প্রক্রিয়ায় বিশৃঙ্খলা দিতে পারে এবং একই ধরনের অপ্রয়োজনীয় অসংখ্য কোষ তৈরি হয়ে সেগুলো জমাটবদ্ধ হয়ে টিউমার সৃষ্টি করতে পারে।

এই জিনগত বিকৃতি বা পরিবর্তনই ক্যান্সারের কারণ। যার ফলে অস্বাভাবিকহারে একই ধরনের কোষ উৎপাদন বেড়ে গিয়ে টিউমার সৃষ্টি হয়।

অনেক সময় দেখা যায় পারিবারিক উত্তরাধীকার সূত্রেই লোকের ক্যান্সার হয়। কিন্তু বেশিরভাগ ক্যান্সারই বংশগত নয়। বরং একজন ব্যক্তির জীবদ্দশায় তার দেহের কোনো কোষে যে পরিবর্তন বা বিকৃতি ঘটে তা থেকেই বেশিরভাগসময় ক্যান্সারের উৎপত্তি ঘটে।

জন্মের সময়ই এই জিনগত মিউটেশন ঘটেনা। বরং পরবর্তী জীবনে এটা ঘটে। একটি কোষে এই মিউটেশন শুরু হয়ে সেই কোষ থেকেই জন্ম নেওয়া নতুন কোষে ছড়িয়ে পড়ে তা।

এই ধরনের মিউটেশন যেহেতু শুক্রাণু বা ডিম্বাণুতে হয় না সেহেতু তা পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা নেই। আর বেশিরভাগ ক্যান্সারই সৃষ্টি হয় এই ধরনের অর্জিত জিনগত মিউটেশনের (বিকৃতি বা পরিবর্তন) কারণে।

বাবা-মার কাছ থেকে পাওয়া বিকৃত বা পরিবর্তিত জিনের ফলে সৃষ্টি হওয়া ক্যান্সার অল্প বয়সেই দৃশ্যমান হয়। যেমন স্তন ক্যান্সার এবং মলাশয়ের ক্যান্সার।

আর কিছু ক্যান্সার আছে যেগুলো সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি, ধুমপান, স্থুলতা এবং নানা ধরনের পরিবেশ ও প্রকৃতিগত কারণে হয়ে থাকে। যেমন ফুসফুস ক্যান্সার। এসব ক্যান্সার হয় মূলত জীবদ্দশায় অর্জিত জিনগত মিউটেশনের ফলে।

তবে জিনগত মিউটেশনের কারণে সৃষ্ট কিছু ক্যান্সার আছে যেগুলোর উৎস অজানা।
সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে দেহের যে অংশে স্টেমসেল বেশিহারে বিভাজিত হয় সেখানে যে অংশে স্টেম সেল কম বিভাজিত হয় তার তুলনায় ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।

এই আবিষ্কারের ফলে ক্যান্সারের চিকিৎসার প্রচলিত কার্যকর পদ্ধতি- প্রাথমিক পর্যায়ে সনাক্তকরণ, নিয়মিত স্ক্রিনিং এবং প্রাথমিক চিকিৎসা ও থেরাপি গ্রহণ- এই পদ্ধতিটিই বেশি কার্যকর বলে প্রতিপন্ন হয়।

আর জেনেটিক কাউন্সেলররাই ক্যান্সারের সবচেয়ে দক্ষ চিকিৎসক। যারা কোনো মানুষের পারিবারিক ও ব্যক্তিগত রোগ-বালাইয়ের ইতিহাস পর্যালোচনা করে তার উত্তরাধীকার সূত্রে ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি আছে কিনা তা নির্ণয় করতে সক্ষম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *