দরকারি কাজে সরকারি অ্যাপস

আইসিটি বিভাগের উদ্যোগে সম্প্রতি চালু হয়েছে ৫০০ অ্যাপ্লিকেশন। তিন শতাধিক সরকারি নানা মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর কিংবা বিভাগ সংশ্লিষ্ট অ্যাপসের পাশাপাশি ইএটিএলের সহযোগিতায় জনসাধারণের প্রাত্যহিক জীবনে প্রয়োজন এমন দুই শতাধিক অ্যাপসও যুক্ত হয়েছে নতুন এ উদ্যোগটিতে। দরকারি নানা কাজে বিনামূল্যে ব্যবহারযোগ্য এসব অ্যাপ নিয়ে লিখেছেন হাসান জাকির

বিদ্যুৎ ও পানির বিল চেক করুন
বিদ্যুৎ এবং পানির বিল প্রদান এবং হালনাগাদ তথ্য পেতে ঝামেলা এড়াতে তৈরি হয়েছে ‘ডিপিডিসি বিল চেক’, ‘ডেসকো বিল চেক’ এবং ‘ওয়াসা বিল চেক’ অ্যাপ। ডিপিডিসি অ্যাপের মাধ্যমে ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির গ্রাহকরা সরাসরি তাদের বিদ্যুৎ সম্পর্কিত প্রয়োজনীয় তথ্যাবলি জানতে সক্ষম হবেন। কাস্টমাররা তাদের ইউজার আইডি ও পাসওয়ার্ড দিয়ে লগইন করে তাদের মাসিক বিলের পরিমাণ, বিল পরিশোধের সময়সীমা এবং বিল পরিশোধের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে তথ্য লাভে সমর্থ হবেন। একইভাবে ‘ডেসকো বিল চেক’ অ্যাপে ডেসকোর বিদ্যুৎ বিল সম্পর্কিত তথ্য জানা যাবে। আর পানির বিল প্রদানে বিল পরিশোধের সময়সীমা, বিলের সর্বশেষ অবস্থা জানা যাবে ওয়াসা বিল চেক অ্যাপ থেকে। এ তিনটি অ্যাপের আকার যথাক্রমে ২.১

মেগাবাইট, ২.৭ মেগাবাইট এবং ২.৮ মেগাবাইট।
ডিপিডিসি ইউজার লোকেশন ট্রাকার :অ্যাপটির মাধ্যমে ডিপিডিসির গ্রাহক তার অ্যাকাউন্ট নম্বর ও জিপিএস সুবিধা ব্যবহার করে নিজের ঠিকানা ডিপিডিসি সার্ভারে পাঠাতে সক্ষম হবেন। যা তৎক্ষণাৎ ডিপিডিসি ডাটাবেজে হালনাগাদ হয়ে যাবে। সেই সঙ্গে এ অ্যাপের মাধ্যমে ডিপিডিসি কর্তৃপক্ষ গ্রহীতাদের অ্যাকাউন্ট নাম্বার ব্যবহার করে তাদের অবস্থান শনাক্ত করতে সক্ষম হবেন। এ অ্যাপ ডিপিডিসি ও এর গ্রহীতাদের মাঝে চমৎকার পেশাদারি সম্পর্ক গড়ে তুলতে ও সময়মতো প্রয়োজনীয় সেবা পেঁৗছে দিতে ভূমিকা পালন করবে।
একাত্তরের চিঠি :’একাত্তরের চিঠি’ অ্যাপটি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে লিখিত চিঠিগুলো নিয়ে তৈরি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন।

বঙ্গবন্ধুর জন্মস্থান :অ্যাপটি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মস্থানের তথ্য ও ইতিহাস সংবলিত মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন। এ অ্যাপের মাধ্যমে এর ব্যবহারকারী টুঙ্গিপাড়ায় অবস্থিত বঙ্গবন্ধুর মাজার কমপ্লেক্স সম্পর্কে ধারণা লাভ ও ভিডিওর মাধ্যমে ভার্চুয়াল ভ্রমণের অভিজ্ঞতা লাভ করবেন। এ ছাড়া এই অ্যাপের মাধ্যমে মাজারে ভ্রমণরত কোনো ব্যবহারকারী বিনামূল্যে ওয়াইফাই সেবায় যুক্ত হতে পারবেন এবং সেই সঙ্গে তাদের প্রতিক্রিয়া সরাসরি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে জানাতে সক্ষম হবেন। এ অ্যাপের সাহায্যে এর ব্যবহারকারী বঙ্গবন্ধুর মাজার কমপ্লেক্সের অবস্থান গুগল ম্যাপে দেখে নিতে পারবেন।
জেনে নিন ট্রেনের সময়সূচি :’ট্রেন সিডিউল’ শীর্ষক অ্যাপের মাধ্যমে ট্রেনের সময়সূচি, টিকিটের মূল্য এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রয়োজনীয় তথ্য ও ফোন নম্বর জানা যাবে। অ্যাপটিতে রয়েছে স্টেশন খোঁজার সুবিধা, শ্রেণী অনুযায়ী টিকিটের মূল্য, জরুরি যোগাযোগ নম্বর এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ট্রেনের সময়সূচি শেয়ার করার সুবিধা। ৩.৩ মেগাবাইট আকারের অ্যাপটি ইতিমধ্যে দারুণ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। তবে ব্যবহারকারীরা বলছেন, ট্রেনের সময়সূচির সঙ্গে ট্রেনের আসন খালি সম্পর্কিত তথ্য পেলে আরও ভালো হতো।

ই-টিন ও ভ্যাট :ভ্যাট ও টিন সম্পর্কিত দুটি অ্যাপস ‘এনআরবি ই-টিন’ এবং ‘এনআরবি ভ্যাট’। ই-টিন অ্যাপের মাধ্যমে ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নাম্বার [টিআইএন] ব্যবহার করে রাজস্ব বোর্ডের সার্ভার থেকে কর প্রদান সংক্রান্ত হালনাগাদ তথ্য জানা যাবে। আর ভ্যাটযোগ্য পণ্য কি-না তা যাচাই করতে ব্যবহার করা যায় ‘ ‘এনআরবি ভ্যাট’ অ্যাপ। এ অ্যাপের মাধ্যমে এর ব্যবহারকারীরা রাজস্ব বোর্ডের সার্ভার থেকে পণ্যের বিবরণ, ট্যারিফের পরিমাণ ও পণ্যগুলো সম্পর্কে হালনাগাদ তথ্য জানতে সমর্থ হবেন।

ট্যুরিস্ট প্যালেস অব বাংলাদেশ :বাংলাদেশের পর্যটন আকর্ষণ বিষয়ক এ অ্যাপটির মাধ্যমে ব্যবহারকারীরা বাংলাদেশের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সম্পর্কে ধারণা লাভ করবেন। এ অ্যাপের সাহায্যে এর ব্যবহারকারীরা তাদের পছন্দের পর্যটন আকর্ষণ ও স্থান যেমন প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও নিদর্শনসমূহ, ইকোপার্ক, পিকনিক স্পট, রিসোর্ট ইত্যাদি সম্পর্কে খোঁজ করতে ও প্রয়োজনীয় তথ্য পেতে সমর্থ হবেন।

জন্ম নিবন্ধন :জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কী, নিবন্ধন পেতে আবেদন প্রক্রিয়া, আবেদনের ফরম এবং কার্যালয়ের তালিকা পাওয়া যাবে। ২.১ মেগাবাইট আকারের অ্যাপটিতে চাইলে কোড নম্বর দিয়ে নিজের জন্ম সনদ যাচাই করাও যাবে।
এটিএম বুথ ও সিএনজি ট্রাকার: কাছের এটিএম বুথ খুঁজে পেতে এটিএম বুথ ট্রাকার অ্যাপ্লিকেশন ধারণাটি চমৎকার। ব্যাংকের নাম লিখে সার্চ দিলেই গুগল ম্যাপসের সহায়তায় আশপাশে থাকা কাঙ্ক্ষিত এটিএম বুথের অবস্থান জানা যাবে। তবে অ্যাপটি খানিকটা ধীরগতির। অনেকের কাছে এ জন্য বিরক্ত লাগতে পারে। আকার : ৩.১ মেগাবাইট । এ ছাড়া সিএনজি স্টেশন খুঁজতে সিএনজি ট্রাকার অ্যাপটি দারুণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশ ওয়েদার :ঝড় কিংবা বন্যার পূর্বাভাস, দিনের তাপমাত্রা, বাতাসের আর্দ্রতাসহ আবহাওয়া সংশ্লিষ্ট হালনাগাদ খবর পাওয়া যাবে ২.১ মেগাবাইটের অ্যাপটিতে।
ডাক্তার আর চিকিৎসার তথ্য :কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসক খুঁজে পেতে ব্যবহার করতে পারেন ‘ডক্টরস হাব’ অ্যাপ। এতে বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের যোগাযোগ নম্বরসহ বিস্তারিত তথ্য রয়েছে। ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য গ্গ্নুকোজ ট্র্যাকার, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দাতাদের তালিকা খুঁজে পেতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে ‘অর্গান ডোনার’ অ্যাপ। ১.১ মেগাবাইটের অ্যাপটিতে দাতাদের ঠিকানা ও সেলফোন নম্বর রয়েছে, যাতে প্রয়োজনে রোগীর পক্ষ থেকে দ্রুত যোগাযোগ করা যায়। এ ছাড়া গর্ভবতী মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ‘গর্ভবতীর পঞ্জিকা’ এবং ‘মা ও শিশু’ অ্যাপ হতে পারে কাঙ্ক্ষিত।
পড়াশোনায় হরেক অ্যাপ :পড়াশোনার জন্য আইকিউ টেস্ট, সিননিমস অ্যান্ড অ্যান্টনিমস, ইডিয়ামস অ্যান্ড ফ্রেজেস, বাংলা প্রবাদ, বাংলা ধাঁধা, অ্যাব্রিভিয়েশন, সমার্থক শব্দ, প্রোভার্স, ভোকাবুরারি, ওয়ার্ড বুক, বিখ্যাতদের বক্তব্য নিয়ে স্কোলার্স কোটস, ম্যাথ অব কিডস, গেমস অব ম্যাথ, বাংলা বুকস অ্যাপস, বিসিএস এক্সাম ডাউনলোড করে নিতে পারেন। মোবাইলে বাংলা লেখার জন্য ‘বাংলা কিবোর্ড’ ডাউনলোড করে নিতে পারেন।
হজ অ্যাসেনশিয়ালে হজের তথ্য :হজের নানা নিয়মকানুনসহ হাজি নিজের অবস্থান জেনে নিতে পারবেন ৪.৬ মেগাবাইটের হজ অ্যাসেনশিয়াল অ্যাপ থেকে।
সফটওয়্যারের বদলে অ্যাপে হিসাব সংরক্ষণ :সফটওয়্যারের পরিবর্তে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা তাদের পণ্য তালিকা আকারে সংরক্ষণ করতে পারেন ২.৫ মেগাবাইটের ‘অ্যাসেট ট্র্যাকার’ অ্যাপটিতে।
ট্রাফিক তথ্য :ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন সংশ্লিষ্ট কোন অপরাধে কত টাকা জরিমানা হবে জেনে নেওয়া যাবে ‘ট্রাফিক ফাইন ইনফো’ থেকে। এ ছাড়া ট্রাফিক সাইনের অর্থ জানতে কাজে লাগবে ‘ট্রাফিক সাইন’ অ্যাপ।
রয়েছে চ্যালেঞ্জ এবং সীমাবদ্ধতা :জনগণের দোরগড়ায় মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে সেবা পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য। তবে অ্যাপ্লিকেশনগুলো নিয়মিত হালনাগাদ না হলে ব্যবহারকারীদের তেমন কাজে আসবে না। বিশেষ করে তিন শতাধিক মন্ত্রণালয়-অধিদপ্তর-বিভাগকে জনগুরুত্ব সম্পূর্ণ তথ্য তাদের ওয়েবে হালনাগাদ করতে হবে। আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক সমকালকে বললেন, অ্যাপ্লিকেশনগুলো সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, অধিদপ্তর কিংবা বিভাগের সঙ্গে ইন্টিগ্রেট করা। সংশ্লিস্টরা তাদের ওয়েবসাইট হালনাগাদ করলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এসব অ্যাপও হালনাগাদ হয়ে যাবে। তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কিংবা বিভাগ কতটুকু যোগ্যতা এবং আন্তরিকতার সঙ্গে কাজটি করবে তা নিয়ে অনেকেই সন্দিহান। বিশেষ করে বাজার দর কিংবা সিএনজি ট্রাকারের মতো অ্যাপস হালনাগাদ না হলে শুরুতেই এসব অ্যাপ আবেদন হারাবে। পাশাপাশি শুধু অ্যান্ড্রয়েড চালিত হওয়ায় অ্যাপলের আইওএস কিংবা মাইক্রোসফটের উইন্ডোজ ডিভাইসে এসব অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করা যাবে না। এসব অ্যাপ গুগল প্লেস্টোর কিংবা িি.িহধঃরড়হধষ৫০০ধঢ়ঢ়ং.পড়স ঠিকানা থেকে ডাউনলোড করা যাবে।
উন্মোচিত হল নতুন সম্ভাবনার দ্বার :একযোগে ৫০০ অ্যাপস উন্মোচনের মাধ্যমে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। সরকার এ অ্যাপস্টোরের মাধ্যমে গুগল প্লেস্টোর থেকে অর্থ আয়ও করতে পারে। চাইলে সরকারি সেবামূলক কাজের বিজ্ঞাপনও যোগ করা এসব অ্যাপে। তবে আইসিটি প্রতিমন্ত্রী বললেন, সহজে জনগণের দোরগোড়ায় ডিজিটাল সেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে আমরা ৫০০ অ্যাপস ডেভেলপ করেছি। এসব অ্যাপ থেকে আয়ের মানসিকতা আমাদের বিশেষ করে আইসিটি উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের নেই। আমরা নানা উদ্যোগের মাধ্যমে জনগণ এবং সরকারের মধ্যে সেবা প্রাপ্তির ব্যবধান ঘুচিয়ে দিতে চাই। পাশাপাশি জনগণের জন্য সেবামূলক কর্মকাণ্ড নিশ্চিত করতে এ ধরনের উদ্যোগ অব্যাহত থাকবে বলেও জানালেন তিনি।

Leave a Reply