নারী সমাজকে সক্ষমতা অর্জন করতে হবে : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, সরকার নারীর ক্ষমতায়নে সমাজের সর্বস্তরে পুরুষের পাশাপাশি তাদের সমঅধিকার নিশ্চিত করেছে। তিনি বলেন, দেশের নারী সমাজকে নিজেদের ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে নিজেদেরই সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।

তিনি বলেন, নারীদের ক্ষমতা দেয়া হলেও (স্থানীয় সরকারে) তারা সব জায়গায় ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারেন না। যারা দায়িত্বে আছেন (স্থানীয় সরকারে) তাদের নিজেদের ক্ষমতা নিজেদের অর্জন করে নিতে হবে। ক্ষমতা কেউ কখনও কারও হাতে তুলে দেয় না। এটাই হল বাস্তবতা। শনিবার বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে নারী দিবস উদযাপন উপলক্ষে মহিলা ও শিশু মন্ত্রণালয় আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আরও বলেন, স্থানীয় সরকার আইনে আমরা এক-তৃতীয়াংশ নারী আসনের ব্যবস্থা করেছি। ইউনিয়ন ও উপজেলাসহ সব জায়গায় একজন চেয়ারম্যানের সঙ্গে ভাইস চেয়ারম্যানের পদ সৃষ্টি করেছি। তিনি বলেন, একটা কথা মনে রাখত হবে- শুধু আইন করলেই নারীর প্রতি সহিংসতা ও বৈষম্য দূর হবে না। এজন্য সমাজে সচেতনতা সৃষ্টি করা একান্তভাবে দরকার। এক্ষেত্রে আমাদের সবার মা-বোনরা যেখানে যারা আছেন সবাইকেই এক হয়ে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, সমাজের অর্ধেক নারীকে বাদ দিয়ে একটা সুষ্ঠু সমাজ কখনও গড়ে উঠতে পারে না। কাজেই সবাইকে এক হয়ে কাজ করতে হবে- এটাই সব থেকে বেশি প্রয়োজন।

শিশু ও নারী ধর্ষণকে অত্যন্ত গর্হিত একটি অপরাধ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী ধর্ষিতা নারীর পরিচয় গোপন রেখে ধর্ষণকারীর নাম-পরিচয় সমাজের সবার কাছে তুলে ধরার জন্য গণমাধ্যমের প্রতি আহবান জানান। তিনি বলেন, যারা (ধর্ষণ) করে তাদের প্রতি ঘৃণা এবং তাদের নাম, পরিচয় ভালোভাবে প্রচার করা দরকার।

যাতে সমাজের সর্বস্তরের মানুষ তাকে ঘৃণার চোখে দেখে। এছাড়া আইনগত ব্যবস্থা তো তাদের বিরুদ্ধে নেয়া হবেই। এসব অপরাধীর বিরুদ্ধে তার সরকার ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বলেও তিনি জানান। তিনি বলেন, এটা কেবল বাংলাদেশের সমস্যা নয়, উন্নত সভ্য দেশেও এ সমস্যা রয়েছে। কাজেই এর বিরুদ্ধে আরও জনমত সৃষ্টি করা দরকার।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, কন্যাশিশুরা যেন কোনোভাবেই বৈষম্যের শিকার না হয় সেই সচেতনতা আমাদের সমাজে ইতিমধ্যে এসে গেছে। আর সমাজকে গড়ে তুলতে হলে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবারই একান্তভাবে কাজ করা দরকার। ‘বিশ্বে যা কিছু সৃষ্টি চিরকল্যাণকর, অর্ধেক তার আনিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর’- কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার এ পঙ্ক্তি উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, কবি সমঅধিকারের কথা স্পষ্টভাবে বলে গেছেন। কাজেই সমাজ ও দেশকে কল্যাণময় করতে হলে নারী-পুরুষের একসঙ্গে কাজ করাটা জরুরি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের মেয়েরা এখন সব জায়গায় এগিয়ে গেছে। চাকরি-বাকরি, খেলাধুলা সব ক্ষেত্রে তারা এগিয়ে। এমনকি আমাদের মেয়েরা এভারেস্টও জয় করে ফেলেছে। সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীতে এখন অনেক নারী কাজ করেন। এমনিতে নারী পাইলট আছেন। আগামীতে নারীরা বিমান বাহিনীতে ফাইটার জেট চালাবে। তিনি বলেন, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর তিনিই সেনাবাহিনীতে প্রথম নারীদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, এছাড়া আমি কয়েকজন নারীকে প্রথম সচিবের পদমর্যাদা দিই।

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা বলেন, জাতির পিতা নারীদের এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন। স্বাধীনতার পর জাতির পিতা প্রথম যে সংবিধান দিলেন সেখানে তিনি মেয়েদের জন্য সংরক্ষিত নারী আসন দেন। তিনি মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক করে দিয়েছিলেন এবং তিনি বিশ্বাস করতেন- ‘একজন মেয়ে যদি অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীনতা অর্জন করে তাহলে সমাজে তার ভালো অবস্থান হয়।’ আগে জুডিশিয়াল সার্ভিসে কোনো নারীর চাকরির সুযোগ ছিল না। ‘বঙ্গবন্ধু এ আইন বাতিল করে দিয়েছেন’ উল্লেখ করে নাজমুন আরাকে জেলা জজের পদ থেকে হাইকোর্টে পদায়ন করার তথ্যও জানান শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘জেলা ডিসি, এসপির পদে মেয়েদের বাধা ছিল। যাকে প্রথম নারী এসপি করে মুন্সীগঞ্জে পাঠানো হয় তিনি দায়িত্ব নিয়েই ডাকাত ধরে ফেলেন। তার এ কাজের সঙ্গে আমিও জয়ী হয়ে গেলাম।’

প্রধানমন্ত্রী জানান, নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ এবং পারিবারিক সহিংসতা থেকে সুরক্ষা প্রদানের লক্ষ্যে তার সরকার কঠোর শাস্তির বিধান রেখে ‘পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) আইন-২০১০ এবং পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা) বিধিমালা-২০১৩ প্রণয়ন করেছে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে তার সরকারের ডিএনএ আইন-২০১৪, বাল্য বিবাহ নিরোধ আইন-২০১৭, যৌতুক নিরোধ আইন-২০১৮ প্রণয়ন এবং একই সঙ্গে বাল্য বিবাহ নিরোধ আইন-২০১৭ এর সংশ্লিষ্ট ধারাগুলো ‘ভ্রাম্যমাণ আদালত আইন-২০০৯’-এর তফসিলভুক্তকরণের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

সারা দেশের নারী উন্নয়নে তার সরকারের পদক্ষেপগুলোর উল্লেখ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০৩ (সংশোধিত) ও পারিবারিক পর্যায়ে সংঘটিত নারী নির্যাতন প্রতিরোধকল্পে মাল্টিসেক্টরাল প্রোগ্রামের মাধ্যমে ৬৭টি ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার স্থাপন করা হয়েছে। একই সঙ্গে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে ন্যাশনাল হেল্পলাইন ১০৯ চালু করা হয়েছে। অসহায় ও নির্যাতিত মহিলাদের দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ছয়টি বিভাগে নারী নির্যাতন প্রতিরোধ সেল ও মহিলা সহায়তা কর্মসূচি চালু থাকার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, সারা দেশে চার হাজার ৮৮৩টি ক্লাবের মাধ্যমে কিশোর-কিশোরীদের জীবনযাত্রার ইতিবাচক পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। বাল্য বিবাহ প্রতিরোধে ‘অ্যাকসেলারেটিং অ্যাকশন টু অ্যান্ড চাইল্ড ম্যারেজ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।

নারীদের পুনর্বাসন ও ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে ১৯৭২ সালে জাতির পিতা ‘নারী পুনর্বাসন বোর্ড’ গঠন করেন এবং সংবিধানে নারীর সমানাধিকার নিশ্চিত করেন উল্লেখ করে শেখ হাসিনা তার সরকারের ‘জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি ২০১১’ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের জন্য জাতীয় কর্মপরিকল্পনা-২০১৩ গ্রহণ এবং ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে নারী উন্নয়নে এক লাখ ৩৭ হাজার ৭৪২ কোটি টাকার জেন্ডার বাজেট প্রণয়নের উল্লেখ করেন। এছাড়া মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাসে উন্নীত করা এবং পিতার নামের পাশাপাশি মাতার নাম অন্তর্ভুক্ত করা বাধ্যতামূলক করাসহ আটটি কর্মজীবী মহিলা হোস্টেলে ১৯ হাজার ৯২৯ জন কর্মজীবী নারীর আবাসন সুবিধা প্রদান, কর্মজীবী নারীদের জন্য ৯৪টি ডে-কেয়ার সেন্টারের মাধ্যমে ৩৬ হাজার ১৮৩ জন শিশুকে দিবাযত্ন সেবা প্রদান এবং ২০০৯-২০১৮ জুন পর্যন্ত আটটি বিভাগ, ৬৪টি জেলা এবং ৪২৬টি উপজেলায় দুই লাখ ১৭ হাজার ৪৪০ জন সুবিধাবঞ্চিত দুস্থ নারীকে বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ প্রদানের কথা জানান। তিনি বলেন, ‘ভালনারেবল গ্রুপ ডেভেলপমেন্ট’ প্রকল্পের আওতায় সাত জেলার আট হাজার উপকারভোগী নারীকে স্বাবলম্বী করতে মাথাপিছু এককালীন ১৫ হাজার টাকা অনুদান এবং প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে।

নারীকে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য ‘জয়িতা’ ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২৮৩ কোটি ২২ লাখ ৬০ হাজার টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে উপজেলা পর্যায়ে মহিলাদের জন্য আয়বর্ধক প্রশিক্ষণ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। সেই সঙ্গে জেলাভিত্তিক মহিলা প্রশিক্ষণ প্রকল্পের আওতায় দেশব্যাপী ৬৪টি জেলায় ২৮ হাজার জন নারীকে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ে হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে।

শিক্ষা, খেলাধুলা, পেশাগত কাজ, নারীর ক্ষমতায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশি নারীদের সফলতার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা তার অর্জিত ‘লাইফ টাইম কন্ট্রিবিউশন ফর উইমেন অ্যাম্পাওয়ারমেন্ট’ অ্যাওয়ার্ড দেশের মানুষ এবং বিশ্বের নির্যাতিত নারীদের উৎসর্গ করেন। তিনি বলেন, ‘এ অ্যাওয়ার্ড আমার নয়, এটা দেশের মানুষের। আমি যে অ্যাওয়ার্ডই পাই না কেন, তার ভাগীদার এ দেশের মানুষ।’

মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি ও সাবেক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকির সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বাংলাদেশে ইউএনডিপি’র প্রতিনিধি মিয়া সেপো বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন। স্বাগত বক্তব্য রাখেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সচিব কামরুন নাহার। বিভিন্ন ক্ষেত্রে কৃতিত্বপূর্ণ অবদান রাখায় ‘জয়িতা’ পদকপ্রাপ্তদের হাতে সনদ ও পুরস্কার তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী।