পাহাড়িদের দলগুলো বিভক্ত হয়ে পড়ছে কেন?

বাংলাদেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, পার্বত্য চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের ব্যাপারে কিছু সন্দেহভাজনকে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করে তাদের ধরার জন্য অভিযান চালানো হচ্ছে। প্রয়োজনে সেখানে সেনাবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যৌথ অভিযান আরও জোরদার করার কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন।

রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমা হত্যাকাণ্ড এবং পরদিনই আরও পাঁচজনকে গুলি করে হত্যার ঘটনা পার্বত্য এলাকায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

বিশ্লেষকরা বলেছেন, পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতার কারণে পাহাড়িদের মধ্যে হতাশা থেকে এমন পরিস্থিতি হচ্ছে।

রাঙামাটিতে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় কাউকে এখনও গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি বলে সেখানকার প্রশাসনের কর্মকর্তারা বলছেন।

তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, কিছু সন্দেহভাজনকে প্রাথমিকভাবে শনাক্ত করা গেছে এবং তাদের ধরার জন্য পার্বত্য এলাকায় অভিযান চালানো হচ্ছে। সেনাবাহিনী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো যৌথভাবে এই অভিযান চালাচ্ছে।

মি: খান মনে করেন, পাহাড়ি দু’টি গোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব থেকে সর্বশেষ এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।

“এটাতো তাদের নিজেদের দুই গ্রুপের মারামারি, এখনও পর্যন্ত আমাদের কাছে তা অনুমান হচ্ছে। সন্দেহভাজন যাদের শনাক্ত করতে পেরেছি, তাদের ধরার জন্য প্রচেষ্টা চলছে।”

তিনি আরও বলেছেন, “প্রধানমন্ত্রী সবসময় জিরো টলারেন্সের কথা বলছেন। এই ঘটনায়ও উনি আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে অভিযান চালিয়ে এই অস্ত্র উদ্ধার এবং এদের ধরা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরিয়ে আনতে যা যা করার আমরা করবো।”

গত কয়েক মাস ধরেই পার্বত্য অঞ্চলে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ রাঙামাটির নানিয়ারচরের হত্যাকাণ্ডের ঘটনার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পাহাড়িদের দু’টি গোষ্ঠীর দ্বন্দ্বকে দায়ী করছেন।

কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম মনে করেন, এই হত্যাকাণ্ড পাহাড়ে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির জন্য চুক্তি বিরোধী মহলের দীর্ঘদিনের তৎপরতার অংশ।

“এই হত্যাকাণ্ড আকস্মিক আমি বলবো না। পার্বত্য চট্টগ্রামে যখন শান্তিচুক্তি হয়, তখন থেকেই একটি মহল এর বিরোধিতা করেছে। তাদের তৎপরতা আছেই। এছাড়া এখনকার ঘটনাগুলোর পিছনে বাইরের যে উস্কানি আছে, এবং বাইরের কোন কোন সংস্থা এর মধ্যে সম্পৃক্ত, এতে আমার কোন সন্দেহ নাই।”

১৯৯৭ সালে পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের সময় পাহাড়ে সন্তু লারমার নেতৃত্বাধীন জনসংহতি সমিতির আধিপত্য ছিল। চুক্তির পরে জনসংহতি সমিতির বিরুদ্ধে ইউপিডিএফ নামের একটি দল গঠিত হয়।

এখন চুক্তির পর বিশ বছরে আঞ্চলিক এই দলগুলো নিজেরা আরও বিভক্ত হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক কমিটির সদস্য নিরুপা দেওয়ান মনে করেন, চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারের ধীরগতির কারণেই পাহাড়ে পরিস্থিতি এতটা খারাপ হয়েছে।

“চুক্তি বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রিতা। একারণে তাদের মধ্যে কোন্দলটা বেড়ে গেছে। এবং তারা মনে করছে, আসলে এটা ভুল হয়েছিল। তাদের মধ্যে বিভিন্ন দল হয়ে গেছে। আমি বলবো, হতাশা থেকে এমনটা হয়েছে।”

যদিও চুক্তির বেশিরভাগ বাস্তবায়ন হয়েছে বলে সরকার দাবি করে থাকে। তবে পার্বত্য এলাকার এখনকার পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এইচ টি ইমাম বলেছেন, পার্বত্য অঞ্চলে আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির জন্য সেনা-পুলিশের যৌথ অভিযান অব্যাহত রেখে তা আরও জোরদার করার সিদ্ধান্ত যেমন সরকার নিয়েছে, একইসাথে রাজনৈতিক দিক থেকে সরকার চুক্তির পক্ষের পার্বত্য এলাকার নেতৃবৃন্দের সাথে আলোচনা করে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের পথ খুঁজবে।

“এটি গুরুতর বিষয়। যথেষ্ট উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী খুব শক্ত অবস্থানে গিয়ে শক্তভাবে ব্যবস্থা নিতে বলেছেন। এছাড়া সেখানকার নেতৃবৃন্দ যারা আছেন, তাদের সাথে বৈঠক করে সকলের কাছে গ্রহণযোগ্য একটা সমাধান বের করতে হবে। এটা নিয়ে কাজ চলছে।”

চুক্তির পর বিশ বছরেও পার্বত্য অঞ্চলের ভূমি সমস্যা নিয়ে সমাধানের কোন উদ্যোগ নেয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। এখন সরকার মূল সমস্যাগুলো সমাধানে নজর দেয়া কথাও বলছে।

সূত্র: বিবিসি বাংলা

Leave a Reply