বাকশালঃ কিছু স্মৃতি কিছু জানা-২

সায়েদুল আরেফিন

স্বাধীনতার বঙ্গবন্ধু প্রথম বড় রাজনৈতিক ধাক্কা খেলেন ছাত্রিলীগের বিভেদ নিয়ে। ছাত্রলীগের দুই গ্রুপ মিটিং ডাকলো। দুই জায়গায় প্রধান অতিথি বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধু এক জায়গায় গেলেন। মুহূর্তেই অপর গ্রুপ বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে স্লগান দিতে শুরু করল। যার ফলে ৩১শে অক্টোবর ১০৭২ সালে জাসদ গঠিত হলো এই গ্রুপ থেকেই। তাদের স্লোগান ছিল বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার। জাসদ সশস্ত্র গনবাহিনী তৈরী করে সারা দেশে চালাতে লাগলো ব্যাপক সন্ত্রাস। কী কেউ ধরা পড়ে জেলে গেল। ৫ জন এম পি কে তাঁরা খুন করল। জাসদ তাদের মতবাদ প্রচারের জন্য গণকন্ঠ নামে একটা পত্রিকা বের কর ব্যাপক মিথ্যাচার শুরু করলো। তারা জাতীয় দিবসেও হরতালের মতো কর্মসূচী ঘোষণা করতে দ্বিধা করতো না। শেখ কামালের ব্যাংক ডকাতির তত্ব তাদের, যা ছিল ১০০ভাগ মিথ্যা। শেখ কামালের আহত হবার ঘটনা ভিন্ন, সেটাকে ডাকাতি বলে চালিয়ে দিলো সম্পাদক বিপ্লবী কবি আল মাহমুদ।

প্রকাশনা আইনের ফাক ফকর দিয়ে তাঁরা এটা করলেও আইনে তাদের কিছু করার ছিল না।তখন বাংলাদেশের সব দল সামাজতান্ত্রে বিশ্বাসী দল। ১৯৭৩ সালে এঁদেরে প্রাপ্ত ভোটের সঙ্খ্যা ৩৭% হলেও দিনে দিনে এদের সংখ্যা বাড়তে থাকলো। ১৯৭৫এর দিকে মনে হলো ৫০%এর বেশী কারণ তাঁর নিজ দলেও অনেকে ছিলেন সমাজতন্ত্রের কট্টর সমর্থক। সেই সাথে রাতের অন্ধকারে বাড়তে থাকে জাসদের গনবাহিনীর সশস্ত্র তান্ডব। সারা দুনিয়া জুড়ে তখন প্রবল খরা চলছে। কৃষি উৎপাদন খুব কম, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশে। আমেরিকা আর ইউরপের কিছু দেশ ছাড়া সব দেশেই খাদ্য উৎপাদনে ঘাটতি। বাংলাদেশের কৃষকদের অর্থনৈতিক অবস্থা এত খারাপ যে তারা কৃষি উপকরণ কিনে ঠিকমত চাষাবাদ করতেও পারে না, তার পরে বৈরী আবহাওয়া। আমেরিকা সহ অন্য দেশের নজর আমাদের পাটের দিকে। তারা খাদ্যের বিনিময়ে খুব কম দামে পাট নিতে চায়। তবে কিউবার মত সামাজতান্ত্রিক দেশে ভাল দাম অফার দিলো যাঁদের বাড়তি খাদ্য উৎপাদনের ক্ষমতা কম। আমাদের দেশে খাদ্যাভাব চরমে। কারণ এর কিছুদিন আগেই ১৯৭০ সালের মার্চ মাসে বাংলাদেশের(তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান) ভোলা সাইক্লনে উপকূল অঞ্চলে পৃথিবীর ভয়াবহ ১০দুর্যোগের একটা ঘটে গিয়েছিল তাতে যা ক্ষতি হয় তা টাকার অংকে হিসাব করলে দাঁড়ায় ৮৬ মিলিয়ন ইউএস ডলারের মতো।

এর মাঝে ১৯৭৪ সালের নভেম্বর মাসের গোঁড়ার দিকে রোমে শুরু হলো the World Food Conference যার স্টেটমেন্টে বলা হল “…that millions would die of starvation before the 1975 harvest”. যা Dale E. Hathaway, Director এর International Food Policy Research Institute এর THE WORLD FOOD CRISIS PERIODIC ORPERPETUAL? লেখায় ফুটে উঠেছে।

সদ্যস্বাধীন দেশের সব কিছুর অভাব। নেই দক্ষ কর্মকর্তা-কর্মচারী, নেই ভালো একটা সেনাবাহিনী, সদ্য গঠিত রক্ষীবাহিনীর নেই তেমন দক্ষতা, বিচার বিভাগ এলোমেলো, কৃষিতে উৎপাদনশীলতা ভাল না। খাদ্য হয়ে গেল সব কিছুর মূলে। কি করা যায় সেই চিন্তায় অস্থির বঙ্গবন্ধু। আবার দেশের অধিকাংশ মানুষ সমাজতন্ত্র চায়। আওয়ামীলিগের একটা বিরাট অংশ সমাজতন্ত্র পন্থী, যাঁদের শীর্ষে ছিলেন তাজুদ্দিন আহমেদ আর শেখ ফজলুল হোক মণি। মণি বঙ্গবন্ধুর আপ ভাগনা আর তাজুদ্দিন আহমেদ তার সব চেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু কাম সহকর্মী।

সরকারী কোষাগারে টাকা কম। উন্নয়ন তো দুরের কথা নুন্যতম অবকাঠামো মেরামত আর জরুরী কাজ আটকে যেতে লাগলো। কারণ বেশী টাকা আসে পাট রপ্তানী থেকে বেশী তা নিয়েই শুরু হয়েছে চক্রান্ত। রপ্তানী কম। আরেকটা খাত হলো ভুমি কর। বঙ্গবন্ধু দেখলেন বড় কৃষক, কিছু শিল্পপতি (সংখ্যায় তারা খুব কম) আর কিছু শিক্ষিত মানুষ যারা মোট জনসংখ্যার শতকরা ৫ ভাগের বেশী নয়। তারা সব কিছু নিয়ন্ত্রন করতে চায়। ক্ষুদে আর প্রান্তিক চাষীরা ভূমিকর দিতে পারেন না, তাই দেখে বড় চাষিরাও কর দেন না। বঙ্গবন্ধু ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমির খাজনা মাফ করে দিয়ে বড় বর চাষিদের কর দিতে চাপ দিলেন। সেখানেও শুরু নানা অসন্তোষ। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষাবস্থায় বঙ্গবন্ধু খুব ব্যথিত হলেন। সারা দেশ থেকে যে সব খবর আসলো তা ভালো না। বিদেশ থেকে নগদ টাকায় সামান্য দুই জাহাজ খাদ্য কিনলেন তিনি খুব চড়া দামে। তাঁর তৎকালীন খাদ্য প্রতিমন্ত্রী সেটাও সিঙ্গাপুরে বেঁচে দেন তাই দেশে ফেরার পরে ঐ মন্ত্রীকে বাদ দিয়ে তাঁর বদলে মন্ত্রীর এলাকা থেকে নতুন লোক (সৈয়দ আলতাফ হসেনকে) মন্ত্রীসভায় নেওয়া হয়। এদিকে সুযোগ বুঝে অতি রাজাকার ঘরণার এক সাংবাদিক একটা গরীব মেয়েকে টাকার বিনিময়ে জাল পরিয়ে ছবি তুলে পত্রিকায় ছাপিয়ে দিলো। শুরু হল হৈ চৈ। আগেই বলেছি তখন বাংলাদেশের প্রকাশনা আইন ছিল খুব দুর্বল, তাই যারা সংবাদ নিয়ে নোংরামী করে তাদের বিরুদ্ধে বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। বিশেষ ক্ষমতা আইন তৈরির এটি আরেকটা কারণ ছিল।

‘বঙ্গবন্ধু যখন বাকশাল গঠন করেন তখন সারা বিশ্বে সমাজতন্ত্রের প্রভাব পূর্ণমাত্রায় বহাল ছিল। সমাজতান্ত্রিক দেশ সোভিয়েত ইউনিয়ন বলিষ্ঠ সমর্থন দিয়ে আমাদের স্বাধীনতা অর্জনে বড় মাপের ভূমিকা রাখে। তাছাড়া ষাটের দশকের পর আওয়ামী লীগের মেনিফেস্টোর সঙ্গে সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচি সংযুক্ত করা হয়। এছাড়া তখনকার গলাকাটা হঠকারী রাজনীতি সামাল দেয়ার জন্য বঙ্গবন্ধু দ্বিতীয় বিপ্লবের কর্মসূচি হিসেবে শোষিতের গণতন্ত্র কায়েম করার লক্ষ্যে বাকশাল গঠন করলেন, এছাড়া তখন তাঁর কাছে কোন পথ খোলা ছিল না বলে তিনি মনে করলেন।

বঙ্গবন্ধু পরিষদের চেয়ারম্যান, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ডক্টর মশাররফ হসেন বলেছিলে, ‘ বাকশাল পদ্ধতির সঙ্গে অনেকের দ্বিমত থাকতে পারে কিন্তু বঙ্গবন্ধু বাকশাল গঠন করার পটভূমি হিসেবে যেসব সমস্যার কথা জাতির সামনে তুলে ধরেছিলেন, তার সঙ্গে কারো দ্বিমত থাকতে পারে না।

‘ইতিহাসের রক্ত পলাশ’ বইতে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী বলেছেন, ‘প্রচলিত গণতন্ত্রের ওপর তিনি বিদ্যমান পরিস্থিতির কারণে আস্থা হারিয়ে ফেলেছিলেন বলে বাকশাল গঠন করেছিলেন। কিন্তু বাকশালের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করার জন্য বেইস তৈরি করার আগেই তাঁকে হত্যা করা হয়’। বঙ্গবন্ধু এ কথা বলে রেখেছিলেন, ‘দরকার হলে সিস্টেম পরিবর্তন করা হবে’। বঙ্গবন্ধুর জামাতা ড. ওয়াজেদের বই থেকে জানা যায়, বেগম মুজিব বাকশাল সিস্টেমের সঙ্গে একমত ছিলেন না। তাছাড়া বঙ্গবন্ধু বাকশাল কায়েমই করতে পারেননি। বাকশাল ফর্ম গঠন করার পর পূর্ণ উদ্যমে তিনি কাজে হাত নেয়ার পরপরই তাঁকে হত্যা করা হয়। যে বউয়ের ঘোমটা উন্মোচন করে দেখার সুযোগ হলো না, তাকে সুন্দরী বা কুৎসিত বলার অর্থই হতে পারে না।যা হোক দেশের মানুষের কল্যাণে বঙ্গন্ধু শেষ চেষ্টা করতে চাইলেন। তিনি খবর পেলেন যে তাঁকে হত্যার সড়যন্ত্র হচ্ছে। তিনি এক সাক্ষাতকারে বললেন, “হয়তো শেষ পর্যন্ত ওরা আমাকে মেরে ফেলতে পারে। পরোয়া করি না। ও মৃত্যু আমার জীবনে অনেকবার এসেছে। একসিডেন্টলি আজো আমি বেঁচে আছি। অবশ্যই আমাকে মরতে হবে। তাই মৃত্যু ভয় আমার নেই। জনগন যদি বোঝে আমার আইডিয়া ভালো, তাহলে তারা তা গ্রহণ করবে। আমার কর্মসূচী বাস্তবায়ন করবে। আমার একটা বড় স্বান্তনা আছে, যুদ্ধের সময় আমি জনগনের সাথে থাকতে পারিনি। জনগণ আমারই আদেশ ও নির্দেশে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে।

আজকের এই শোষণমুক্ত সমাজতন্ত্র বা অর্থনৈতিক মুক্তির বিপ্লবে আমি যদি নাও থাকি, তাহলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস আমার বাঙালীরা যে কোনোমূল্যে আমার রেখে যাওয়া আদর্শ ও লক্ষ্য একদিন বাংলার বুকে বাস্তবায়িত করে ছাড়বে ইনশাল্লাহ”। ………চলবে………………………।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares