বাকশালঃ কিছু স্মৃতি কিছু জানা-৩

সায়েদুল আরেফিন

বঙ্গবন্ধু দেশের বিদেশের বন্ধুদের সংগে আলাপ করে নতুন কর্মসূচী নিলেন। জাসদ বাদে মোটা দাগের বাংলাদেশের সব দল নিয়ে বঙ্গবন্ধু গঠন করলেন জাতীয় দল, অনেকটা জাতীয় সরকারের মত। যা ছিল অনেকটা সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার দেশের মত একদলীয় গন্তান্ত্রিক ব্যবস্থা। যা তখন চীন আর রাশিয়া সহ বিশ্বের অনেক দেশেই সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছিল। বঙ্গবন্ধু তাই ১৯৭৫ সালের ২৪ জানুয়ারি বাংলাদেশের সংবিধানের চতুর্থ সংশোধনীবলে বহুদলীয় সংসদীয় সরকার পদ্ধতি পরিবর্তন করে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন এবং দেশের সকল রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে একটি জাতীয় দল গঠন করেন।
এই বাকশালের কর্মসূচীর চারটা প্রধান দিক ছিল-
(১)। রাজনৈতিক
(২)। অর্থনৈতিক
(৩)। প্রশাসনিক
(৪)। বিচার বিভাগীয়।

বাকশালের রাজনৈতিক কর্মসূচী-
কারা সদস্য হতে পারবেনঃ বাকশাল ব্যবস্থায় সরকারী ও আধা সরকারী কর্মচারী-কর্মকর্তা, পুলিশ, মিলিটারী সদস্য সাংবাদিক, বেসরকারী কর্মচারী-কর্মকর্তারাও জাতীয় দলের সদস্য হতে পারবেন। কিন্তু দলের চেয়ারম্যানের অনুমোদন লাগবে। এটা রাখা হয় যাতে রাজাকারগন দলের সদস্য হতে না পারে। কাঠামো থাকবে রাজনৈতিক দোলগুলোর কাঠামোর মত, তবে তৎকালীন মহকুমাকে সাংগঠনিক জেলার মর্যদা দেওয়া হয়। বাকাশাল কাঠামোতে তদানীন্তন বাংলাদেশে জেলা হবার কথা ৬৪টা। জেলার নীচে, থানা, ইউনিয়ন, গ্রামে কমটি থাকবে, মূল দল, কৃষক, শ্রমিক, মহিলা, যুবক, ছাত্রদের নিয়ে অংগ সংগঠন থাকবে সংগঠনের প্রতিটি স্তরে, এমন কথা ছিল বাকশালের কর্মসূচীতে।

কারা আর কিভাবে নির্বাচন করতে পারবেনঃ বঙ্গবন্ধু দেখলেন যারা রাজনীতি করতে চান তাঁদের অধিকাংশই মুখ আর অন্তরে ঠিক নেই। মুখে দেশ আর দশের সেবার কথা বললেও আসলে তারা আসলে তারা চান ক্ষমতা বা ক্ষমতায় গিয়ে অর্থবিত্তের মালিক হতে। কিন্তু মুখে তারা স্বীকার করেন না। তাছাড়া ১৯৭৫ সালে আমাদের মতো দেশে যেখানে শতকরা মাত্র ২০ভাগের মত মানুষ সাক্ষর জ্ঞান সম্পন্ন ছিল সেখানে প্রকৃত স্নাতকের সংখ্যা খুব কম ছিল তার প্রমাণ হল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেবার মত প্রাতিঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষ ছিল না। আমাদের দেশের রাজনীতিতে রাজনৈতিক নেতার যগ্যতার চেয়ে তাঁদের দলের মার্কা ছিল মুখ্য (যদিও এখনো অনেকটা তাই)। ভোটাধিকার প্রয়োগে সেখানে ভালো মন্দ বিচার করা হয় প্রতীক দেখে, মানুষ দেখে নয়। এতে ভালো মানুষ, কাজের মানুষ বা সৎ-দেশপ্রেমিকি মানুষ সংসদ সদস্য পদে নির্বাচিত হতে পারেন না। তাঁর উপর আছে টাকার খেলা। টাকা লাগে অনেক এসব নির্বাচন করেতে। তাহলে যারা এতো টাকা খরচ করে নির্বাচন করবেন তারা তো এতিমখানার মালিক না, আর জনগনও এতিম না। তাহলে সেই টাকা উঠবে কীভাবে। সংগত কারণেই নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিগন খরচের টাকা উঠাতেন বা উঠাতে চান। আর পরবর্তী নির্বাচন আর নিজের পরিবারের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে আর দেশ আর জনগনের কল্যাণ করা হয়ে ওঠে না। লুটেরার দলে নিজের অজান্তেই নিজের নাম লিখে ফেলেন রাজনীতিক নেতারা, তাদের ব্যবহার করে মোটা হয় সিভিল বা অন্য প্রশাসনের মানুষ।

তখনকার দিনের ব্যক্তিগত, পারিবারিক মূল্যবোধ সিনিয়র মানুষদের মাঝে তুলনামুলকভাবে বেশী ছিল, কিন্তু তুলনামুলক বয়সে তরুন্দের মাঝে এটার অভাব শুরু হল ১৯৭১ এর পর থেকেই। এটা কিন্তু চলমান প্রক্রিয়া। আমরা এখনো বলি এ যুগের ছেলেরা/ মেয়েরা ভালো না; অর্থাৎ তাঁদের সাথে আমাদের মুল্যবোধের ফারাক আছে। বঙ্গবন্ধু চাইলেন সৎ দেশপ্রেমিক মানুষ রাজনীতিতে আসুক তারা দেশের ৯৫ ভাগ গরীব মানুষের কল্যাণে কাজ করুক। তাই এক দল হলে তখন আর মার্কার প্রভাব থাকবে না, মানুষ দেখবে কে ভালো মানুষ, কাজের মানুষ তাকেই তারা ভোট দেবে। একটি পদে নির্বাচিত হবার জন্য তাঁর ঐ এলাকার যারা সক্রিয় রাজনীতি করবেন তাঁদের মধ্য থেকে পার্টির একাধিক কর্মী/ সদস্য প্রার্থী হতে পারবেন, নিমিনেশন পাবেন। নির্বাচনী সকল ব্য্যভার বহন করবে সরকার। পোস্টার ছাপানো, মিটিঙয়ের/ জনসভার জন্য মাইকিং, স্টেজ করা, তাবত কাজ। মানে নির্বাচিত প্রতিনিধি যেন নির্বাচিত হয়ে তাঁর নির্বাচনী খরচের টাকা উঠানোর ধান্দা না করেন। এতে ভালো লোক রাজনীতিতে বাড়বেন, সুস্থ্যরাজনীতি চর্চা শুরু হবে।

অনেকের কাছে এটা অবাস্তব মনে হলেও এটার বাস্তবায়নও বঙ্গবন্ধু করেছিলে। কুষ্টিয়ার এমপি ও বঙ্গবন্ধু ঘনিষ্ঠ সহচর গোলাম কিবরিয়া সাহেবকে ঈদের নামাজরত অবস্থায় জাসদের গনবাহিনীর লোকেরা হত্যা করলে সংসদের সেই আসন শূন্য হয়। উনি আমার আত্মীয় বিধায় খুব ভালো মনে আছে সব। যা হোক, সেখানে বাকশালের এই পদ্ধতিতে নির্বাচন সম্পন্ন হয়। ময়মনসিংহ তেও এমন নির্বাচন হয়েছিল। ….. চলবে………………….…..।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares