বাকশালঃ কিছু স্মৃতি কিছু জানা-৪

সায়েদুল আরেফিন

 

অর্থনৈতিক কর্মসূচী –

বঙ্গবন্ধু যখন ভূমি রাজস্ব আদায়ের জন্য ২৫ বিঘা পর্যন্ত জমিম খাজনা মকুফ আর বেশী জমিওয়ালাদের জন্য অধিকহারে ট্যাক্স আরপ করার ঘোষণা দিনেন, তখন সরকারী দলের কিছু বড় নেতাও প্রভাব খাটিয়ে গেজেট প্রকাশ ৩/৪ দিন পিছিয়ে দিতে সচেষ্ট ছিলেন। কারণ ঐ ফাঁকে তারা তাঁদের জমির বিরাট অংশ তাঁদের পরিবারের অন্য সদস্যদের নামে লিখে দিলেন। এটা দেখেই বঙ্গবন্ধু ভাবলেন সামাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার মতো সব জমি রাষ্ট্রের করা ঠিক হবে না। তাতে মানুষ খুব অসন্তুষ্ট হবেন, কষ্ট পাবেন। তিনি বললে ভারী শিল্পের মালিক হবে রাষ্ট্র। সত্যি কথা বলতে কি ভারী শিল্প প্রতিষ্ঠার মতো অর্থশালী লোকও দেশে তখন খুব একটা ছিল না। পাকিস্তানীদের ফেলে যাওয়া আর সরকারী মালিকানাধীন কিছু শিল্প প্রতিষ্ঠান সরকারের হাতে ছিল। তাঁর পরেও কোন বিশেষ সেক্টরের মনোপলি যাতে কারো হাতে চলে না যায় সেই ভাবনা থেকেই এই আয়োজন বা ব্যবস্থা।

বঙ্গবন্ধু বললেন, যেহেতু দেশ কৃষি নির্ভর, তাই কৃষি দিয়েই আমাদের এগুতে হবে। খাদ্যে স্বয়ম্ভর হলে অন্য পণ্য আমদানী রপ্তানী সহজ হয়ে যাবে। তাই আমাদের কৃষি উৎপাদন বাড়াতে হবে; তাকে নিতে হবে ঈর্ষনীয় পর্যায়ে। তাতেই আমাদের অর্থ-মুক্তির সংগ্রাম সফল হবে। এর জন্য দরকার গ্রাম পর্যায়ে বাধ্যতামূলক গ্রাম সমবায় পদ্ধতি। কেমন ছিল তা?

গ্রাম মানে একটা মৌজা; যার অধীনে থাকে অনেকগুলো খতিয়ান আর প্লট। কোন প্লটের সাইজ ১ বিঘা, কনটা দুই বিঘা আবার কারোটা অনেক বড়। ক্ষুদে চাষীদের জমি খুব ছোট ছোট প্লটে ভাগ করা। প্রতি জমির চার পাশে থাকে আইল। যে আইলে কমপক্ষে ৫ লিংক করে জমি নষ্ট হয়। প্রতি লিংক মানে হ’লো ৭ দশমিক ৯২ ইঞ্চি। মানে ১ বিঘা জমি হলো ১৪,৪৪০ বর্গফুট যার চার পাশে আইলে থাকে ১১১৫।৪ বর্গফুট। এর ৪ ভাগের ১ ভাগ হলো ২৭৮ দশমিক ৮৫ বর্গফুট। ধরে নিই, যদি একটা মৌজায় মানে একটা গ্রামে ৩০০০ বিঘা জমিও থাকে তাহ’লে আইলের জন্য জমি নষ্ট হয় প্রায় ৫৭ বিঘার মতো। বঙ্গবন্ধু বললেন এই জমির হিসাব করে রাখবে গ্রামের বেকার যুবক যুবতীরা। আর একই লেভেলের জমি হবে একটা প্লট যাতে ম্যাকানাইজড ওয়েতে মানে কৃষি যন্ত্রপাতি দিয়ে (ট্রাক্টর/ পাওয়ার ট্রিলার) চাসাবাদ করা যায়। সেচেও সুবিধা হয়। নতুন করে আইল করতে গিয়ে কিছু জম নষ্ট হলেও একটা ভালো পরিমান জমি চাষযোগ্য হবে সেটা হিসাব রাখতে হবে। এই জমির উৎপাদিত ফসল যাবে গ্রামের দুস্থ মানুষের কল্যাণে। সরকারের মুখের দিকে না তাকিয়ে গ্রামের মানুষ গ্রামের মানুষের কল্যান করবেন। বাকী জমির জন্য চাষের, সেচের,মাড়াই যন্ত্রপাতিসহ, সমস্ত কৃষি উপকরণ মানে সার, বীজ, কীট নাশক, ইত্যাদি দেবে সরকার। এছাড়াও সরকার শ্রমিকের/ কর্মচারীদের হাজিরা/ বেতন দিতে সরকার ঋণ দেবে স্থানীয় ব্যাংকের মাধ্যমে।

শ্রমের ও শ্রেণীবিভাগ ছিল। কঠিন কাজের কর্ম ঘণ্টা তুলনামুলক কম আর কম কায়িক শ্রমের কাজের জন্য কর্মঘণ্টা ছিল বেশী। মানে যারা মাটি কাটবে, লাঙ্গল দিয়ে চাষ করবে তাঁদের কর্ম ঘন্টা ৬ ঘণ্টা কিন্তু যারা হিসাব রাখার কাজ করবেন তাঁদের কাজের সময় ১০ ঘন্টা এমন। উৎপাদন হবার পরে তা ৩ ভাগে ভাগ করা হবে। এই তিন ভাগে ভাগ করার আগেই পুরো উৎপাদন থেকে হিসেব করে রাখা আইলের জমির পরিমান ফসল গ্রামের দুঃস্থ মানুষের জন্য আলাদা করে রাখা হবে। আর বাকীর ১ ভাগ সরকার, ১ ভাগ জমির মালিক আর বাকী অংশ শ্রমিক/ কর্মচারীর দেওয়া হবে। শ্রমিকের অংশের পণ্য সরকারের কাছে বিক্রি করে মুনাফার অংশ সরকারে কাছ থেকে নেওয়া ঋণ শোধ হবে বাকীটা মুনাফা হিসেবে পাবেন শ্রমিক/ কর্মচারীরা। মুনাফা ১০০ ভাগ নিশ্চিত কারণ উৎপাদন খরচের চেয়ে সরকারী ক্রয় মুল্য বেশী হবে তা নিশ্চিত। বর্তমানে অনেক কৃষক তাঁর পন্যের উৎপাদন খরচ না পেয়ে নিঃস্ব হয়ে যান, তা হবে না এই ক্ষেত্রে। এর আরেকটি কারণ হল দেশের যে এগ্রো ইকোলজিক্যাল যোনে যে পণ্যের ভালো উৎপাদন হবে সেখানে সেই পন্য চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদিত হবে পরিকল্পিতভাবেই। গ্রামের সাধরণ মানুষ গ্রামেই কাজ পাবেন, বাকীরা আসবেও বা যাবেন দূরে।

বিচার বিভাগীয় কর্মসূচী-
আইনজীবীদের মধ্যে ব্যারিস্টার, অ্যাডভোকেট, মোক্তার এই তিন শ্রেণী বিভক্তি লোপ করে সবাইকে অ্যাডভোকেট শ্রেণীভুক্ত করা হয়। তাতে ব্যারিস্টার ও অ্যাডভোকেট শ্রেণী অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়েছিল। তখনকার বিখ্যাত আইনজীবি মির্জা গোলাম হাফিজঅত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়ে বলেছিলেন, ‘আমি আইনের পেশাই ছেড়ে দেব। শেখ মুজিব কি চান? মোক্তার –মুহুরিদের পঙক্তিতে আমাদের নিয়ে বসাতে চান’? বঙ্গবন্ধু অ্যাডভোকেটদের মোক্তার পর্যায়ে নামাতে চাননি, চেয়েছিলেন মোক্তারদের জন্য ট্রেনিংয়ের শর্ট কোর্স প্রবর্তন করে অ্যাডভোকেট পর্যায়ে উন্নীত করতে। তিনি সারা দেশে হাইকোর্টের শাখা স্থাপনের ঘোষণাও দিয়েছিলেন। যাতে মানুষ সুবিচার পায়, তাড়াতাড়ি। তিনি কিছু কেস বাদে সকল কেস ৯০ দিনে নিস্পত্তির কথা বলেছিলেন। এতেও উকিল সাহেবরা খুব নাখোশ। কারণ একটা কেস পেলে তাঁরা বংশ পরম্পরায় চালিয়ে টাকা ইঙ্কাম করতে পারেন। বাকশাল ব্যবস্থায় তা বন্ধ হয়ে যাবে, বা কমে যাবে।

প্রশাসনিক কর্মসূচী-
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের বাকশাল ব্যবস্থায় নির্বাচিত জেলা গভর্নরদের অধীনে আমলাতন্ত্রকেন্যস্ত করা হয়েছিল। ফলে দেশের সিভিল ব্যুরোক্রেসি ভয়ানকভাবে ক্ষুব্ধ হয় এবং তাদের বহু যুগের আধিপত্য ধ্বংস হতে বসেছে জেনে বঙ্গবন্ধুবিরোধী চক্রান্তে শামিল হয়।

সাংবাদিক আব্দুল্ল গাফফার চৌধুরী তাঁর এক লেখায় বলেছেন, ‘বাকশাল পদ্ধতিতে সমাজের মাথাওয়ালাদের সুযোগ ও স্বাধীনতা প্রয়োজনে খর্ব করে সমাজের তৃণমূল পর্যায়ে সুদূর অতীত থেকে অনুপস্থিত গণতান্ত্রিক সুযোগ-সুবিধা ও অধিকারগুলো এই প্রথমবারের মতো পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ফলে বাকশালের বিরুদ্ধে যে বিরাট চিৎকার শুরু হয়েছিল, তা সমাজের উপরতলার শিক্ষিত ও সুবিধাভোগী শ্রেণীগুলোর চিৎকার। তৃণমূলের জনগোষ্ঠীর চিৎকার ছিল না’।…….চলবে……………….।

 

Leave a Reply