বাণিজ্য আর আন্দোলন থেকে দূরে থাক শিক্ষা

দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে শিক্ষার্থীদের টিউশন ফির ওপর সাড়ে ৭ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপের প্রতিবাদে গত কয়েক মাস ধরেই আন্দোলন করে আসছেন শিক্ষার্থীরা। এই ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবিতে তারা বৃহস্পতিবার রাজধানীতে রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ শুরু করেন। এ কারণে কয়েকটি রাস্তা বন্ধ হয়ে যায় এবং রাজধানী জুড়ে লেগে যায় তীব্র যানজট। নগরবাসী পড়েন ভোগান্তিতে।

 

রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় ইস্ট-ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থীরা আগের দিন বুধবার বিক্ষোভ করেন। এক পর্যায়ে তাদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ ঘটে। এর প্রতিবাদে এবং ভ্যাট প্রত্যাহারের দাবিতে বৃহস্পতিবার সকালেই রাস্তায় নেমে আসেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষার্থীরা। রাজধানীর উত্তরা, প্রগতি সরণিতে বসুন্ধরা আবাসিক গেইট, মেরুল বাড্ডা ও রামপুরা এলাকা, মহাখালীর ওয়্যারলেস গেইট এবং ধানমণ্ডি-২৭ নম্বর এলাকা ও আশুলিয়ায় সড়ক অবরোধ করে তারা বিক্ষোভ শুরু করেন। এতে এসব এলাকায় সড়কগুলোতে গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
রাজধানীর বাইরে চট্টগ্রাম, সিলেট ও রাজশাহীতে শিক্ষার্থীরা সংবাদ সম্মেলন করে একই দাবি জানিয়েছেন। চট্টগ্রামে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করেছেন। তাদের বিক্ষোভের কারণে চট্টগ্রাম নগরীর বাসিন্দাদেরকেও প্রচণ্ড যানজটে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে।

 

বিকেলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) পক্ষ থেকে মোবাইল টেলিফোনে এসএমএস দিয়ে জানানো হয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে আরোপিত ভ্যাট দেবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ, শিক্ষার্থীরা নয়।

 

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও জাতীয় সংসদ অধিবেশনে বলেন, ‘ভ্যাট শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নয়, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নেওয়া হবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এই ভ্যাট দিতে রাজি হয়েছে।’

 

বর্তমানে দেশে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৮৩। গত জুনে জাতীয় বাজেটে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ ও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের টিউশন ফির ওপর ১০ শতাংশ ভ্যাট আরোপ করা হয়। পরে তা কমিয়ে সাড়ে ৭ শতাংশ করা হয়।

 

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বলছে, এই ভ্যাট শিক্ষার্থীদেরকেই দিতে হবে। আর এনবিআর বলছে, ভ্যাট দেবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

 

ভ্যাট নিয়ে এনবিআর ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ যাই বলুক শিক্ষার্থীরা বলছেন, শিক্ষায় সব ধরনের ভ্যাট প্রত্যাহার করতে হবে।

 

টিউশন ফির ওপর শিক্ষার্থীদেরকে ভ্যাট দিতে হবে না; টিউশন ফি যা আছে তাই থাকবে, বাড়বে না- ইত্যাদি কথা সরকারের তরফ থেকে যতই বলা হোক, আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে যে, শিক্ষার ওপর ভ্যাট স্থায়ী হয়ে যাচ্ছে।

 

দেশের শিক্ষার্থদের একটি বিরাট অংশ উচ্চশিক্ষার জন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। কেবল স্বচ্ছল পরিবারের ছেলেমেয়েরাই যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাচ্ছেন তা নয়, অনেক সাধারণ পরিবারের ছেলেমেয়েরাও এখানে পড়তে আসেন। তাদের বাবা-মায়েরা জমি জিরাত বিক্রি করে সন্তানদের এখানে পড়তে পাঠান। আর এই যে ভ্যাট, তা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পরশোধ করবে ভালো কথা কিন্তু তা তারা নিশ্চয়ই শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ষোল আনা উসুল করে নেবে।

 

মোটকথা, শেষমেষ যা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আশঙ্কা রয়ে যায়, তা হলো শিক্ষা ক্ষেত্রে বাণিজ্য। যা মোটেও কাম্য নয়। এমনিতেই দেশে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির সুযোগ কমে এসেছে। এখন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির জন্য পরীক্ষা একবারই দেওয়া যায়। ফলে উচ্চশিক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের সামনে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোই ভরসা। সেখানে টিউশন ফি নেহায়েত কম নয়। বাবা-মায়েরা যারা সন্তানদেরকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠান তারা বোঝেন এই অর্থ জোগার করা কতটা কঠিন। ভ্যাটের জন্য যদি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ টিউশন ফি বাড়িয়ে দেয় তাহলে সেটা হবে অনেক বাবা মায়ের জন্য মরার ওপর খাড়ার ঘা।

 

ভ্যাটের ভার যাতে শেষ পর্যন্ত শিক্ষার্থী ও তাদের বাবা মায়ের কাঁধে গিয়ে না পড়ে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বাণিজ্য থেকে শিক্ষাকে দূরে রাখতে হবে- আর এ বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে সরকারকেই।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares