বিশ্বকাপ ফুটবলের পর্দা উঠছে আজ

অপেক্ষার পালা শেষ। বিশ্বকাপ ফুটবলের পর্দা উঠে গিয়ে মাঠে গড়াবে বল। এবার বাজবে বাঁশি। মস্কোর লুজনিকি স্টেডিয়ামে একুশতম বিশ্বকাপ ফুটবলের উদ্বোধনী খেলায় স্বাগতিক রাশিয়া এবং সৌদি আরব মুুখোমুখি হবে আজ বৃহস্পতিবার। বাংলাদেশ সময় রাত ৯টায় শুরু হবে খেলা। এই খেলাটি পরিচালনা করবেন আর্জেন্টিনা এবং ব্রাজিলের রেফারি ও সহকারী রেফারিরা। মেসির দেশের রেফারি নেসর পিটানাকে বাঁশি বাজাতে দেয়া হয়েছে। ৮১ হাজার দর্শক ধারণ ক্ষমতা লুজনিকি মাঠের। সারা দুুনিয়া তাকিয়ে রয়েছে মস্কোর দিকে।
লাখ লাখ দর্শক এখন রাশিয়ায় অবস্থান করলেও ফুটবল দুনিয়ার সিংহভাগ দর্শক টিভিতে খেলা উপভোগ করবেন। প্রায় দেড় মাস ফুটবল দুনিয়া মেতে থাকবে বিশ্বকাপ ফুটবলের শিরোপার যুদ্ধ নিয়ে। এমনকি সারাপৃথিবীর অন্যতম ক্ষমতাধর ব্যক্তিত্ব রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনও ফিফার কার্যক্রম নিয়ে ব্যস্ত রয়েছেন। ফুটবল নিয়ে তিনি মাথা ঘামাচ্ছেন দিনরাত।
আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ময়দানে অস্ত্রের ঝনঝনানি যতই থাকুক, তবে ফুটবল মাঠে গেলে সবাই হয়ে উঠেন এক আত্মার মানুষ। মাঠের দর্শকদের হূদয় যেন একটি অদৃশ্য বন্ধনে আবদ্ধ। নেই কোনো ভেদাভেদ। মস্কো শহরে গত সাতদিন ঘুরেফিরে একজন দর্শককেও ঝগড়া করতে দেখা যায়নি। কেউ কাউকে চেনেন না। কেউ কারো ভাষাও বুঝেন না। অথচ এখানে সবার ভাষা যেন একটাই, ফুটবল আর ফুটবল। ফুটবলের ভাষা সবাইকে এক সুতোয় বেঁধে দেয়। সবাইকে একই স্রোতে মিলিয়ে দেয়। সবার মধ্যে কী এক অদ্ভুত মিল। আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক যুদ্ধের লড়াইয়ে বিশ্বনেতারা এক টেবিলে বসতে না পারলেও তাদের দেশের মানুষ ঠিকই একই সঙ্গে বসে বিশ্বকাপের শহরে টেবিলে খাচ্ছেন। নাচ করছেন, গান গাইছেন। বিয়ারের গ্লাসে গ্লাসে টোকা দিচ্ছেন। যার যার দেশের পতাকা নিয়ে গগনবিদারী আওয়াজে গান গাইছেন। একই সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আনন্দ উল্লাস করছেন পথে পথে, স্টেডিয়ামে। একজন দর্শক আরেক জনকে দেখে জানতে চাইছেন আপনি কোন দেশের। জবাব পাওয়ার আগেই গলা জড়িয়ে ধরছেন। আলিঙ্গন করছেন। মুহূর্তেই অচেনা মানুষটির সঙ্গে তৈরি হচ্ছে ভালোবাসার সম্পর্ক। কোটপিন বিনিময়, মুদ্রা বিনিময়, আরো কতো কিছু দেওয়া নেওয়ার মাঝে ভুলে যাচ্ছেন ধর্ম-বর্ণ, ভৌগোলিক সীমানা। চোখের পলকে সম্পর্কের ব্যাপ্তি জানিয়ে দিচ্ছে অস্ত্রের পৃথিবী চাই না। বাসযোগ্য সুন্দর পৃথিবী চাই।
২০১৪ ব্রাজিল বিশ্বকাপ ফুটবল শেষ হয়েছে চার বছর আগে। মনে হচ্ছে এই তো সেদিনের কথা। এখনও ব্রাজিল বিশ্বকাপের সোনালি রঙ আর হাসি-কান্নার নানা ঘটনা ফুটবল অনুরাগীদের চোখে লেগে আছে। জার্মানির চ্যাম্পিয়ন হওয়া, ফাইনালের অতিরিক্ত সময়ে একমাত্র গোল হজম করে আর্জেন্টিনার হেরে যাওয়া, জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে ব্রাজিলের সেই হারের কথা দর্শকের কাছে যেন গতকাল বিকালের ঘটনা। দর্শক কথায় কথায় সেটা মনে করিয়ে দেয়। মস্কোর শহরেও যেন ব্রাজিলের পেছনে ছুটছে জার্মানি ভূত। জার্মানরা ৭-১ লিখে নিয়ে এসেছে। আর ব্রাজিলিয়ানরা বলছেন ওটা ভুলে যাও। দুর্ঘটনা বারবার হয় না।
বিশ্বকাপ ফুটবলের ষষ্ঠ শিরোপা এনে দেয়ার কঠিন অভিযানে নেইমার। নতুন চ্যালেঞ্জ। দেশকে কিছু দিতে হবে। ইনজুরি কাটিয়ে উঠা নেইমার তার সোনার ব্যাগ নিয়ে রাশিয়ায় পা রেখেছেন। সেই ব্যাগে সোনার ট্রফি ঢুকবে কিনা তা বলা কঠিন। বাংলাদেশের ঘরে ঘরে ব্রাজিলের সমর্থকরাও তাকিয়ে নেইমারের দিকে। সুস্থ হয়ে তিনি ফিরেছেন মাঠে। ব্রাজিলের সমর্থকরা যতটা না খুশি বাংলাদেশের দর্শক যেন তার চেয়ে বেশি আনন্দিত।
নেইমারের মতো ইনজুরিতে ছিলেন না আর্জেন্টাইন তারকা লিওনেল মেসি। তার উপর তাকিয়ে আছে আর্জেন্টিনার কোটি কোটি দর্শক। মুখিয়ে আছে বাংলাদেশের দর্শক। যদি এমন হয়, এটাই মেসির শেষ বিশ্বকাপ। তাহলে? মেসি তার জীবন দিয়ে ট্রফি উপহার দেবেন এমন বিশ্বাস আছে দর্শকদের। তবে আর্জেন্টিনার সমস্যা তাদের খেলোয়াড়দের মধ্যে ইনজুরি আছে অনেকের। আর্জেন্টাইন সাংবাদিকরা মস্কোতে জানিয়েছেন আর্জেন্টিনা এবারও চ্যাম্পিয়ন হতে পারবে না। তাদের মুখে ছাই পড়ুক। বাংলাদেশের আর্জেন্টাইন ভক্তরা মনে করেন মেসি হচ্ছে ট্রেনের ইঞ্জিন।
মেশিনের মতো ফুটবল খেলবে জার্মানি। তারা রাশিয়া এসে নিজেদের লুকিয়ে রেখেছেন। ফরমেশন নিয়ে মুখে যত কথাই বলুক না কেন খেলার দিন তারা খোলস ছেড়ে বেরিয়ে আসবেন এমন ইঙ্গিত দিচ্ছেন জার্মান সাংবাদিকরা। বিশ্বকাপ ফুটবলে পানামা এবং আইসল্যান্ডের প্রথম অভিষেক হতে যাচ্ছে। ১৯৯০ বিশ্বকাপের পর মিসর আবার বিশ্বকাপে জায়গা পেয়েছে। পর্তুগিজ তারকা রোনালদো একাই টেনে নিয়ে যাবেন খেলা। রাশিয়ার মাঠে কোনো শক্তি রোনালদোকে রুখে দিতে পারবে না এই বিশ্বাসের কথা জানিয়েছেন মস্কোতে আসা পর্তুগিজ দর্শক। রোনালদোকে তারা মেসি, নেইমারের চেয়ে উঁচু মনে করেন। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে পর্তুগিজরা জানিয়েছেন টাইটানিক জাহাজ ডুবেছে তাদের ভুলে। কিন্তু আমাদের রোনালদোর টাইটানিক জাহাজ পর্তুগাল ডুববে না। ট্রফি নিয়ে ঘরে ফেরার জন্যই এসেছি। রাশিয়া হবে আমাদের স্মরণীয় বিশ্বকাপ। ৩২ দেশের লড়াই হবে ৮ গ্রুপে। সোনায় মোড়ানো ট্রফি জিততে হলে ৭ ম্যাচ জিততে হবে।
বিশ্বকাপ ফুটবল যেন পায়ের জাদু দেখানোর বড় মঞ্চ। ফুটবল দুনিয়া তো সেই জাদু দেখবেই, যারা হাতের জাদু দেখান তারাও ফুটবলের জাদু দেখে মোহিত হন। মেসি, নেইমার, রোনালদোর দিকে ফোকাস থাকবে ফুটবল দুনিয়ার। সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে আবার জার্মানি কিংবা বেলজিয়াম ট্রফি নিয়ে যায় কিনা তা দেখার অপেক্ষায় থাকতে হবে ১৫ জুলাই পর্যন্ত।
সূত্র:ইত্তেফাক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *