ভূমিকম্প ঝুঁকি ও বাংলাদেশ!

হিন্দুকুশ পর্বতে গত সোমবার ৭ দশমিক ৫ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে শত শত মানুষ নিহত হওয়া ছাড়াও আহত হয়েছে বহু মানুষ। ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও ভারতে। দিল্লি, কাশ্মির, হিমাচল, হরিয়ানা ও পাঞ্জাবে এই ভূকম্পন অনুভূত হলেও হতাহতের তেমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। আর এ ভূমিকম্প শুধু ভারত নয়, অনুভূত হয়েছে বাংলাদেশেও। ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে আশঙ্কাও প্রকাশ করা হয়েছে। সাম্প্রতিককালের মধ্যে ভয়াবহ ভূমিকম্প সংঘটিত হয়েছিল নেপালে। সেখানে ভয়াবহভাবে মানবিক বিপর্যয় ঘটেছিল।এবারের ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল আফগানিস্তানের জারম থেকে ৪৮ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে, ভূপৃষ্ঠের ২১২ কিলোমিটার গভীরে। মূলত ওই এলাকার কাছেই পাকিস্তান ও তাজিকিস্তানের সীমান্ত।

বাংলাদেশ ভূমিকম্পের জন্য সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ, বিশেষ করে উচ্চমাত্রায় ভূমিকম্প হলে রাজধানী ঢাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে। দেশ-বিদেশের ভূতত্ত্ববিদরাও বিভিন্ন গবেষণার মাধ্যমে এমনটিই বলেছেন। উল্লেখ্য, ১৮৯৭ সালের ১২ জুন ঢাকা থেকে ২৫০ কিলোমিটার দূরে ডাউকি নদীর তলদেশে ৮.৫ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়। এতে হাজার হাজার মানুষ, লাখ লাখ পশুপাখি ধ্বংস হয়ে যায়। ১৯৫০ সালের ১৫ আগস্ট আসামে সংঘটিত ৮.৭ মাত্রার ভূমিকম্পের পর বিগত ৬৫ বছরে বাংলাদেশ ও এর আশপাশে এত শক্তিশালী ভূমিকম্প আর হয়নি। সর্বশেষ ১৯৩৪ সালের ১৫ জানুয়ারি বিহারে ৮.৩ মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল। এর আগে বাংলাদেশের শ্রীমঙ্গলে ১৯১৮ সালের ৮ জুলাই ৭.৬ মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল। নেপালের ভূমিকম্পটি হিমালয়ের পাদদেশে ভারতীয় প্লেট ও ইউরেশিয়ান প্লেটের মধ্যে সৃষ্ট সংঘর্ষের কারণে সৃষ্টি হয়েছে। ভূমিকম্পের কারণে নেপাল ও সিকিমে টেলিযোগাযোগ ও বিদ্যুৎ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। রাজধানী ঢাকার অবস্থা খুবই নাজুক। ৭.৫ বা তার চেয়ে অধিক মাত্রার ভূমিকম্প হলে পুরান ঢাকার অবস্থা যে কী রকম করুণ আকার ধারণ করবে তা অনুমান করা যায়।

ভূমিকম্পবিশারদদের মতে কোনো এলাকায় একবার ভূমিকম্প হলে সেখানকার মাটিস্তর আলগা হয়ে যায়। আলগা মাটির সর ধীরে ধীরে শক্ত হতে থাকে এবং এতে প্রায় ১০০ বছর লেগে যায়। ১৮৯৭ সালের পর ১০০ বছর পার হয়ে গেছে। তাই প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মেই বাংলাদেশের দরজায় ভয়াবহ আকারের আরেকটি ভূমিকম্প কড়া নাড়ছে। মধুপুরচ্যুতি অথবা আসামের ডাউকি নদীর তলদেশচ্যুতি থেকে যদি ৮ মাত্রা বা তার চেয়ে অধিক মাত্রার ভূমিকম্প আঘাত হানে তবে বাংলাদেশের ব্যাপক ক্ষতি হবে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকার ক্ষতি হবে অকল্পনীয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে প্রায় ৭০ হাজার বাড়ি মুহূর্তেই ধসে পড়বে। লাখ লাখ মানুষ নিমেষেই প্রাণ হারাবে। কারণ ঢাকা শহরের ৩৫ ভাগ স্থাপনা শক্ত মাটিতে এবং বাকি ৬৫ ভাগ স্থাপনা বালু দিয়ে বিভিন্ন জলাশয় ভরাট করে এক রকম নরম মাটিতে তৈরি করা হয়েছে। জাতিসংঘের আর্থকোয়েক ডিজাস্টার রিস্ক ইনডেস্কের এক বুলেটিনে বিশ্বের ২০টি ঝুঁকিপূর্ণ শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান দ্বিতীয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ভূমিকম্পে ঢাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির জন্য দায়ী কারণগুলো হচ্ছে জনসংখ্যার ঘনত্ব, অল্প জায়গায় অধিক ভবন, অপরিকল্পিত অবকাঠামো, প্রয়োজনীয় খোলা জায়গার অভাব, গলিপথ, লাইফলাইনগুলোর অব্যবস্থাপনা ইত্যাদি।

যদি কখনো ঢাকা শহরে বড় ধরনের ভূমিকম্প আঘাত হানে তবে সরু গলিপথের কারণে উদ্ধারকাজ ব্যাহত হবে। ফলে ভূমিকম্প-পরবর্তী সময়ে ব্যাপক প্রাণহানি ঘটবে। তা ছাড়া উদ্ধার তৎপরতা চালানোর জন্য অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব তো রয়েছেই। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির অবকাঠামো ও সরবরাহব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বড় ধরনের বিপর্যয়ের সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে বাংলাদেশ। বার বার কড়া নাড়ছে মাঝারি ও ছোট আকারের ভূমিকম্প। তারা বলছেন, মূলত টেকটনিক প্লেটের সংঘর্ষে ভূমিকম্প হয়। বাংলাদেশ এ ধরনের তিনটি প্লেটের মধ্যে অবস্থিত। এ ছাড়া দেশের মধ্যে থাকা চ্যুতি বা ফল্ট লাইনগুলো যেকোনো সময় ডেকে আনতে পারে ভয়াবহ ভূমিকম্প।
ভূমিকম্প এমন একটি দুর্যোগ তা প্রতিরোধের উপায় মানুষের এখনো অজানা। এ দুর্যোগের পূর্বাভাস দেওয়ার ক্ষমতাও এখনো মানুষ আয়ত্তে আনতে পারেনি। সেহেতু দুর্যোগ নেমে এলে ক্ষয়ক্ষতি কীভাবে কমানো যায় এবং উদ্ধার কাজ কীভাবে চালানো যায় সেদিকেই আমাদের প্রস্তুতি থাকতে হবে। কিন্তু ঘূর্ণিঝড় বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশের সক্ষমতা প্রশংসার দাবিদার হলেও ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে আমরা পিছিয়ে। অস্তিত্বের স্বার্থে এ বিষয়ে আমাদের সচেতন হতে হবে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares