মোদির সফরে কী পেল বাংলাদেশ

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দুদিনের ঢাকা সফরের পর যে প্রশ্নটি বড় হয়ে দেখা দিয়েছে তা হচ্ছে, এই সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ কী পেল? এই সফরকে নানাভাবে বিশ্লেষণ করা যায়। অর্থনৈতিক, নিরাপত্তা, কিংবা কানেকটিভিটি এই তিন আলোকেই আমরা যদি মোদির এই সফরকে বিশ্লেষণ করি, তাহলে দেখব পাল্লাটা ভারতের দিকেই বেশি হেলে পড়েছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রাপ্তি খুব বেশি নয়।

অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ২০০ কোটি ডলারের একটি আশ্বাস পেয়েছে। ভারতীয় অর্থে বাংলাদেশি বেশ কিছু প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে। যেমন একটি হচ্ছে আশুগঞ্জ-আখাউড়া সড়কের অবকাঠামো উন্নয়ন। আশুগঞ্জ-আখাউড়া সড়ক চারলেনে উন্নীত করা হবে। এই ঋণ প্রকল্পের আওতায় ৫০০টি ভারতীয় বাসও কেনা হবে। প্রশ্ন হচ্ছে এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বার্থ নাকি ভারতীয় স্বার্থ রক্ষিত হবে? এই সড়কে ভারতীয় বাস চলাচল করে। তথাকথিত কানেকটিভিটির আওতায় ভারতীয় বাস এখন কলকাতা থেকে বাংলাদেশের ভেতরে আশুগঞ্জ হয়ে আখাউড়া হয়ে ত্রিপুরা যাবে। তাতে লাভ হলো ভারতেরই। বাস কেনা হবে ভারতীয়। চলবে ঢাকাসহ অন্যান্য শহরে। প্রশ্ন হচ্ছে, ঢাকা শহর কি এখন এসব গাড়ি ধারণ করার ক্ষমতা রাখে? এমনিতেই যানজটে মানুষ অসহায়। রাস্তার তুলনায় গাড়ির সংখ্যা বেশি। ঢাকার বাইরে রাস্তাঘাটের অবস্থা খারাপ। সে ক্ষেত্রে গাড়ি চলার সুযোগ কোথায়? খোঁজ নিলে দেখা যাবে, বিআরটিসির শত শত গাড়ি ডাম্পিং স্টেশনে পড়ে থাকতে থাকতে নষ্ট হয়ে গেছে। অথচ এগুলো সারিয়ে তুলে চলাচলের উপযুক্ত করা যেত। তা ‘অদৃশ্য কারণে’ বিআরটিসি করেনি। এখন আবার নতুন করে গাড়ি ক্রয় করা হবে।

ভারতীয় ঋণের একটা সমস্যা হচ্ছে এই ঋণ নেওয়া হয় ‘সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিট’-এর আওতায়, যেখানে ভারতীয় ঋণ থাকে বেশি। আমি দীর্ঘদিন ধরে মিডিয়ায় বলে আসছি, সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিট কোনো ভালো ঋণ না। এতে করে ঋণ দেওয়া দেশের কাছে (এ ক্ষেত্রে ভারত) ঋণগ্রহীতা দেশের পরিপূর্ণ দায়বদ্ধতা তৈরি হয়। ভারত যে দ্বিতীয়বারের মতো সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিটে ঋণ দিল, তাতে বাংলাদেশ নয় বরং ভারতীয় ঋণই রক্ষিত হবে বেশি। সম্প্রতি ভারতের পত্রিকা টাইমস অব ইন্ডিয়াও একই ধরনের মন্তব্য করেছে। তারা বলেছে, ঋণের অর্থে যেসব প্রকল্প খরচ করা হবে, তার কাঁচামাল, যন্ত্রপাতি ও সেবা ভারত থেকে কিনতে হবে। অর্থাৎ ঋণের দায় বাংলাদেশের, আর সুদাসল ছাড়াও রফতানি ব্যবসা হবে ভারতের। এই ঋণের টাকায় যেসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে, তাতে ভারতের ৫০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হবে। এখন দেখা যাবে, এসব প্রকল্পে যেসব পণ্য দরকার হবে (ঠিকাদার, ইস্পাত, সিমেন্ট, ইট, যন্ত্রপাতি, ইঞ্জিনিয়ার) তা সরবরাহ করবেন ভারতীয় ব্যবসায়ীরা। এমনকি অদক্ষ জনশক্তিও আসতে পারে। আবার এসব পণ্য বাংলাদেশ উৎপাদন করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা বিদেশেও রফতানি হয়। আমাদের দক্ষ জনশক্তি (ইঞ্জিনিয়ার, আর্কিটেক্ট) আছে। কিন্তু আমরা তাদের এ ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারব না। তাই আমরা কখনো বলি না সাপ্লাইয়ার্স ক্রেডিট একটি ভালো ঋণ। একসময় সমাজতান্ত্রিক দেশগুলো এ ধরনের ঋণ দিত (তারা … বার্টার ট্রেড করত। আমাদের পণ্য নিত বিনিময়ে)। ভারত কিন্তু তা করবে না।

মোদির সফরের প্রাক্কালে আমাদের প্রত্যাশা ছিল অনেক। যেমন বলা যেতে পারে, তিস্তাসহ সকল নদীর পানি … বাণিজ্য ঘাটতি কমানো, অঞ্চলিক যোগাযোগ বা কানেকটিভিটি, ভারতের স্থলবন্দরগুলোতে ওয়্যার হাউস নির্মাণ, এলসি ওপেন করার ব্যাপারে ভারতের সাতবোন রাজ্যে অবস্থিত ব্যাংকগুলোতে সুযোগ দান, কান্ট্রি অব অরিজিন-এর ঝামেলা দূর করা, ওষুধের ক্ষেত্রে ভারতের নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা, সীমান্ত হত্যা বন্ধ করা, ভিসা সহজীকরণ এবং শুল্ক-অশুল্ক বাধা দূর করা। এ ক্ষেত্রে কোনো একটি ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট অগ্রগতি হয়েছে, তা বলা যাবে না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ঘোষণা ও প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। এতে করে আমাদের স্বার্থ রক্ষিত হয়েছে কম। তবে ৬৫ দফা যৌথ … কয়েকটি উল্লেখযোগ্য প্রতিশ্রুতি আমরা পেয়েছি, যা আমাদের আশান্বিত করেছে। যেমন বলা যেতে পারে, টিপাইমুখ বাঁধ নির্মাণের কথা। যৌথ ঘোষণায় ২১ নম্বর দফায় এটা বলা হয়েছে যে ভারত সাংবিধানিক কারণে এখন আর এ প্রকল্পে অগ্রসর হবে না। এটা একটা ভালো সিদ্ধান্ত। কেননা বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের মানুষ ভারতের এই প্রকল্প নিয়ে বড় ধরনের দুশ্চিন্তায় ছিল। এ ক্ষেত্রে একটা প্রশ্ন কিন্তু থাকলই আর তা হচ্ছে এরই মধ্যে সেখানে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়ে গেছে, তার কী হবে? আন্তনদী সংযোগ প্রকল্প নিয়েও আমাদের দুশ্চিন্তা ছিল। এখন যৌথ ঘোষণায় বলা হয়েছে, ভারত এমন কিছু করবে না যাতে বাংলাদেশের ক্ষতি হয়। ভারত যদি সত্যিকার অর্থে আন্তনদী সংযোগ প্রকল্প নিয়ে এগিয়ে না যায়, আমার ধারণা তাতে করে ভারত একদিকে যেমনি উপকৃত হবে, ঠিক তেমনি উপকৃত হবে বাংলাদেশও। কেননা ভারতের পরিবেশবাদীরাও এই আন্তনদী সংযোগ প্রকল্পের বিরুদ্ধে। তবে একটা কথা এখানে মনে রাখা দরকার আর তা হচ্ছে আন্তনদী সংযোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ভারতের উচ্চ আদালতের একটি নির্দেশনা রয়েছে।

ভারত ও বাংলাদেশ একটি উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতায় নীতিগতভাবে সম্মত হয়েছে। এটির নামকরণ করা হয়েছে বিবিআইএন। অর্থাৎ বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত (সাতগেজ রাজ্য) এবং নেপালের সহযোগিতায় একটি উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা। এই উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার কথা সম্মেলনে এ ধরনের একটি সিদ্ধান্ত হয়ে আছে। এ ধরনের একটি উদ্যোগ প্রথমে নিয়েছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী আই কে গুজরাল। তারই মতবাদ পরবর্তীকালে ‘গুজরাল ডকট্রিন’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল। এখন নরেন্দ্র মোদি নতুন আঙ্গিকে এটি নিয়ে এলেন। বাংলাদেশ ভারতকে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী আসনেও সমর্থন দিয়েছে। এটা যৌথ ঘোষণায় আছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে জাপানের ক্ষেত্রেও একটি সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কেননা জাপানও নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য হতে চায়। জাপানে আমাদের যথেষ্ট স্বার্থ রয়েছে। জাপানকে বাদ দিয়ে আমরা এককভাবে ভারতকে যদি শুধু এ পদে সমর্থন দিই, তাহলে বিতর্ক বাড়বে এবং জাপান-বাংলাদেশ সম্পর্ক প্রশ্নের মুখে থাকবে।

তারেক শামসুর রেহমান : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

Leave a Reply