যে বিয়ে ছিলো দুনিয়া জুড়ে আলোচনার বিষয়

মোহাম্মদ হাসান শরীফ: আরব্য রজনীতে জৌলুসময় যে বর্ণনা রয়েছে, সেটাই ২১ শতকে নতুন মাত্রায় দেখা গেল ব্রুনেইতে। দেশটির সুলতান বিশ্বের অন্যতম ধনী। তার ছেলের বিয়ে কী সাধারণভাবে হতে পারে। ক্রিস্টাল-খচিত জুতা, কোয়েলের ডিম আকৃতির পান্না, রত্নপাথরের পুষ্পস্তবকে ফুটে ওঠেছিল জাঁকজমকের প্রদর্শনী।

বরের নাম প্রিন্স আবদুল মালিক, বয়স ৩১। সুলতান হাসান আল বলকিয়াহ ও রানি সালেহার সর্বকনিষ্ঠ সন্তান তিনি। সুলতান হওয়ার দৌড়ে এই প্রিন্সের অবস্থান দ্বিতীয়।

আর কণে দায়াঙকু রাবিয়াতুল আদাবিয়াহ পেনজিরান হাজি বলকিয়াহ। বয়স ২২। তিনি একসময় ছিলেন ডাটা এনালিস্ট ও আইটি ইনস্ট্রাক্টর হিসেবে কাজ করতেন।

অনুষ্ঠানটা হয় রাজধানী বন্দর সেরি বেগাবনে সুলতানের রাজপ্রাসাদ ইতসানা নুরুল ইমানে। বাস করা হয়, এমন প্রাসাদগুলোর মধ্যে এটাই বিশ্বে বৃহত্তম। এতে রয়েছে ১,৭৮৮টি কক্ষ, পাঁচটি সুইমিং পুল, ২৫৭টি বাথরুম ও ১১০টি গাড়ি রাখার মতো গ্যারেজ। অতিথিকক্ষে একসাথে পাঁচ হাজার অতিথি বসতে পারেন।

রাজকীয় বিয়ে। তাই অতিথিদের সংখ্যাও কম ছিল না। অনুষ্ঠানে তাদেরও জৌলুসময় উপস্থিতি দেখা যায়। ব্রুানেই টাইমসের মতে, বিশিষ্ট অতিথিদের মধ্যে মালয়েশিয়ার সাতটি রাজ্যের শাসক, সৌদি আরবের এক গভর্নর ছিলেন।

 

উৎসব শুরুহয় ৫ এপ্রিল। ১১ দিনের অনুষ্ঠান শেষ হবে ১৫ এপ্রিল। তবে তারা জনসম্মুখে উপস্থিত হন এই রোববারই। এটাই ছিল পুরো উৎসবের মূল আকর্ষণ।

অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল স্থানীয় একটি প্রথা দিয়ে। এ সময় বরের এক প্রতিনিধি কণের পরিবারে গিয়ে বিয়ের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেন। তারা তাতে সম্মতি দিলে তবেই আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ের কাজ শুরু হয়। প্রথম পর্বে হয় পরিশুদ্ধ করার পর্যায়। এতে উভয় পরিবারের সদস্যরা বর-কণেকে বিভিন্ন পাউডার ও তেল মেখে গোসল করান। তারপর হয় উপহার পর্ব।

মূল অনুষ্ঠানে খলিফা হারুন অর রশিদের বাগদাদই যেন নেমে এসেছিল ব্রুনেইয়ের রাজধানীতে। বর-কণের পরনে স্থানীয় ঐতিহ্যের সাথে মিল রেখে মূল্যবান পোশাক। তাদের বসার জন্য যে চেয়ার দুটি ছিল সেগুলোকে সিংসাহসনই বলা ভালো। নববধূ রাবিয়াতুলের হাতে যে তোড়াটি ছিল, সেটি ফুলের নয়, রত্নপাথরের। হীরার তৈরি তার নেকলেসটির ঠিক মাঝখানে আঙুর আকৃতির তিনটি পান্না শোভা পাচ্ছিল। এর সাথে মানানসই করে তৈরি করা হীরার ব্রোচে ডিম আকৃতির দুটি পান্না শোভা পাচ্ছিল।

জুতা থেকে শুরু করে পোশাকের প্রতিটি অনুষঙ্গই ছিল বিশেষভাবে তৈরি করা। মণি-মানিক্যের ব্যবহার কোথাও কম দেখা যায়নি, বরং অনেক ক্ষেত্রে জৌলুষ উপচে পড়তে চেয়েছে।

অনুষ্ঠানের অংশ হিসেবে রাজকীয় প্রহরীরা আনুষ্ঠানিক ঢাল ও বর্শা নিয়ে অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ করে।
দোয়া অনুষ্ঠানে নবদম্পতি পাশাপাশি বসেন। নববধূর জন্য বিশেষভাবে দোয়া করার সময় একপর্যায়ে সুলতান তার হাত ছেলের হাতে রেখে স্নেহের পরশ বুলিয়ে দেন।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে ছিল বিলাসবহুল ভোজ। ১৫ এপ্রিল শুকরিয়া নামাজ দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ হবে।
সুলতান বিয়ে করেছেন মোট তিনটি। তা থেকে তার মোট সন্তান ১২টি। এদের পাঁচটি ছেলে, সাতটি মেয়ে। প্রিন্স আবদুল মালিক হলেন সুলতান ও তার বর্তমান স্ত্রী রানি সালেহার (তাদের বিয়ে হয়েছিল ১৯৬৫ সালে) ষষ্ঠ সন্তান।

পূর্ব এশিয়ার বর্নিও উপকূলে ব্রুনেইয়ের অবস্থান। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার কাছে অবস্থিত দেশটি আয়তনে কম। তবে তেল ও গ্যাসের বিপুল মজুত রয়েছে দেশটিতে। অধিবাসীদের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ মালয় মুসলিম। ১৫শ’ শতক থেকেই দেশটির অস্তিত্ব দেখা যায়। ১৯৮৪ সালে ব্রিটেনের কাছ থেকে তারা স্বাধীনতা পায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Shares