রাজনীতি আর সংস্কৃতির আড়ালে সানি লিওনের ঢাকা সফর !

রাজনীতি এবং বড় আজব রাজনীতির এই দেশে গত কয়েকদিন ধরে একটি খবর বেশ আলোচিত হচ্ছে। যারা সাদাসিধে মনের মানুষ তারা এই খবরে রাজনীতি খুঁজে পাবেন না। আর যারা গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটলের মতো মনে করেন, ‘মানুষ মাত্রই রাজনৈতিক প্রাণী’ তাদের কথা ভিন্ন। তারা জেব্রার গায়ে সাদার ওপর কালো ডোরা দাগ, না কালোর ওপর সাদা ডোরা দাগ- এ কথার মধ্যেও রাজনীতি খুঁজবেন। তা তারা খুঁজতেই পারেন। কিন্তু যারা মনে করেন, রাজনীতিই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে এবং আমাদের দেশের রাজনৈতিক ইতিহাস গৌরবের- তাদের আত্মতৃপ্তির ঢেঁকুর তোলার দিন ফুরিয়েছে অনেক আগেই। শুধু রাজনীতিই বা বলি কেন, সমাজ সংস্কৃতি কোথাও যেন আজ কোনো গৌরব নেই।

তবে ‘রব’টা আছে। আমরা শোরগোল তৈরিতে ওস্তাদ! শহরে নতুন শোরগোল সানি লিওনের আগমনকে কেন্দ্র করে। বিষয় হলো, এ ধরনের অনুষ্ঠানের আগে যেভাবে প্রচার প্রচারণা চালানো হয়, এ ক্ষেত্রে তেমনটা দেখিনি। সত্য বলতে কী, ‘মসজিদের শহর’ ঢাকায় সানি লিওনের কোনো অনুষ্ঠান করতে দেওয়া হবে না- হেফাজতে ইসলামের এই ঘোষণার পরই আমি প্রথম সানি লিওনের ঢাকায় আসার খবর জানতে পারি। এ ক্ষেত্রে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, আয়োজকেরা কি তাহলে নীরবে প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন? এর উত্তর পাওয়া যাবে হেফাজতে ইসলামের এই স্পষ্ট হুঁশিয়ারিতে। দলটি সানি লিওনকে ‘পতিতা’ আখ্যায়িত করে বলেছে, অনুষ্ঠানটি বন্ধ করা না হলে সর্বস্তরের তওহিদি জনতাকে নিয়ে গণপ্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে এবং যে কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতির জন্য সংশ্লিষ্টরা দায়ী থাকবেন।

প্রশ্নটা হলো, এই পরিস্থিতি তৈরির জন্য দায়ী আসলে কে? যারা এর আয়োজক তারা নিশ্চয়ই সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় বা সংশ্লিষ্ট বিভাগ থেকে অনুমতি নিয়েই আয়োজন করবেন। তাহলে তারা কেন ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়টি বিবেচনা না করেই অনুমতি  দেবেন। এ দেশের সংস্কৃতির সঙ্গেও তো বিষয়টি মেলে না। ‘অপসংস্কৃতি’ শব্দটি আমি ব্যবহার করার পক্ষপাতি নই। কেননা একেক দেশের মানুষের সংস্কৃতি একেক রকম হওয়াই স্বাভাবিক। আমার সঙ্গে তা না মিললে আমি সেটাকে অপসংস্কৃতি বলতে পারি না। সানি লিওন এক সময় পর্নোস্টার ছিলেন। এখন তিনি মুম্বাই ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করছেন। যদিও তার অভিনয় কতটা হচ্ছে বা এর উদ্দেশ্য নিয়ে আমার যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। এমন একজন যৌনাবেদনময়ী বিতর্কিত চলচ্চিত্রাভিনেত্রীকে নিয়ে এসে কেন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করতে হবে এটা আমার বোধগম্য নয়। তবে আয়োজকেরা সংস্কৃতির নামে দু’পয়সা উপার্জনের জন্যই যে এ উদ্যোগ নেবেন এতে কোনো সন্দেহ নেই। এটা সমর্থনযোগ্য নয়।

অবাক ব্যাপার হলো, ভিন দেশের বা পাশ্চাত্য সংস্কৃতির কারণে ‘গেল! গেল! সব রসাতলে গেল’ বলে যারা কপাল চাপড়ান সেইসব সাংস্কৃতিক প্রজ্ঞাবানরা কিন্তু এর প্রতিবাদ করেননি। এর আগেও যে এই শহরে এমন অনুষ্ঠান হয়নি তা নয়। তখনও যে সব শোবিজ স্টাররা এসে কোমর দুলিয়ে, বুক নাচিয়ে গেছেন তাতে আমাদের সংস্কৃতির অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলেও আমি এর বিরুদ্ধে কোনো প্রতিবাদ দেখিনি। ‘স্টার জলসা’, ‘জি বাংলা’ নিয়ে এ দেশে যত সমালোচনা হয়, এ ধরনের স্টার নাইট নিয়ে ততটা কখনও হয়নি।

উল্টো এবার অনেককেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটিয়ে বলতে শুনেছি, হুজুররা কীভাবে সানি লিওনের কথা জানল? অর্থাৎ এই সাবেক পর্নোস্টারকে তারা চেনে কীভাবে? এ প্রশ্ন একেবারেই অবান্তর। কারণ মাওলানা বা হুজুর হয়েছেন বলেই যে তারা দিন-দুনিয়ার খোঁজ রাখেন না বা রাখবেন না- এমন যদি ভেবে থাকেন তাহলে আপনি বোকার স্বর্গে বাস করছেন। সবকিছু এতো সস্তা চিন্তা দিয়ে বিচার করা ঠিক নয়। আজ যে কারণে হুজুরেরা প্রতিবাদ করছেন, তাদের ভিন্ন মতাদর্শের কারণে তাদের কাতারে দাঁড়িয়ে আপনি যদি প্রতিবাদ করতে না-ও পারেন, আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বিবেচনা করে অন্তত প্রতিবাদ করুন।

এ দেশে যাত্রাপালা এক সময় গৌরবের বিষয় ছিল। শাহ আব্দুল করিমের গানে তার প্রমাণ পাওয়া যায়। তিনি গেয়েছেন :

‘হিন্দু বাড়িতে যাত্রা গান হইত
নিমন্ত্রণ দিত আমরা যাইতাম
জারি গান, বাউল গান, আনন্দের তুফান
(আমরা) গাইয়া সারি গান নৌকা দৌড়াইতাম।
আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম।’

সেই সুন্দর দিনগুলো এখন ভিন্নভাবে আসে। যাত্রা এখন অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত। যাত্রাপালার কথা উঠলেই এক শ্রেণীর লোক অশ্লীলতার অভিযোগ তুলে প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন। তাহলে এ ধরনের স্টার নাইটের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হবে না কেন? এ দেশে ভারতীয় চলচ্চিত্র প্রদর্শন করা যাবে না- এ দাবিতে যারা এই কিছুদিন আগেও সোচ্চার ছিলেন তারা এখন নিশ্চুপ কেন? তারা কি তাহলে সানি লিওনকে আমাদের সংস্কৃতির জন্য হুমকি মনে করেন না? যত হুমকি ওই ভারতীয় চলচ্চিত্র আর  টেলিভিশন চ্যানেল! পাঠক লক্ষ্য করুন, ভারতীয় চলচ্চিত্র এ দেশে প্রদর্শনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছে চলচ্চিত্রকর্মীরা। হেফাজত এ বিষয়ে নীরব। আবার অন্যদিকে এ দেশে সানি লিওনের আগমন ঠেকাতে প্রতিবাদ করছে হেফাজত, পক্ষান্তরে সংস্কৃতিকর্মীরা এর বিরুদ্ধে নীরব। তাহলে ঘটনাটা কী দাঁড়াল? যার বিকাশ যেখানে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে সে সেখানে তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছে। সাংস্কৃতিক চেতনা এখানে একেবারেই গৌণ বিষয়।

আনন্দ ভাগ করলে দুটি জিনিস পাওয়া যায়; একটি জ্ঞান এবং অপরটি প্রেম। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এই কথা ধরেই যদি বলি, তাহলে অনুষ্ঠিতব্য এই আনন্দযজ্ঞ থেকে আমরা কোনটা পাব? সানি লিওনের কাছ থেকে কেউ জ্ঞান নিতে চাইবেন বলে মনে হয় না। বাকি থাকল প্রেম। টিকিট কেটে প্রেম কেনা যায়, এমনটা বোকাও বিশ্বাস করবে না। তাহলে কোন বিশ্বাসে আমাদের এই পতন? সব দেখেশুনে শাহ আব্দুল করিমের সেই গানটিই পুনরায় মনে পড়ছে :

‘করি যে ভাবনা
সেদিন আর পাব না
ছিল বাসনা সুখি হইতাম
দিন হতে দিন
আসে যে কঠিন
করিম দীনহীন কোন পথে যাইতাম?’

Leave a Reply