শাপলা মণিহার

জয়শ্রী বীথি

পাহাড় থেকে কাঠ নিয়ে কেউ ফেরেনি এখনো। এই ফাঁকে কয়টা মাছ ধরে রান্না করে ফেললে মন্দ হয় না। মা ফিরেই ভাত খেতে পারবে। সকালের ঠাণ্ডা ভাত আছে। গরম তরকারি হলে খেতে ভালোই হবে। এমনটাই ভেবে সুনিতা জাখা ঝুলপি হাতে নিয়ে বাড়ির পেছনে ছরায় নামে। বৃষ্টিতে জল বেড়েছে অনেকটা। এভাবে একটানা বৃষ্টি হতে থাকলে নদী আর মাঠের সীমানা খুঁজে পাওয়া কঠিন হবে। সুবিধা হলো জল বেশিক্ষণ আটকে থাকছে না। পাহাড় থেকে নেমে আসা ছরার বুক বেয়ে জল বয়ে যাচ্ছে নদীতে। নদীরও এখন ঢলঢল অবস্থা। সুনিতা হাজং ঝুলপি কোমরে বেঁধে জাখা চালায়। সাঁতরে যাওয়া মাছগুলো জাখায় এসে বসে। ধরতে গেলে কোনোটা ফসকে যায়, কোনোটা ধরা দেয়।

ঝুলপিতে লাফাচ্ছে রুপালি মাছ। সুনিতা জাখা তুলে নেয়। ঝুলপিতে জমা করা অনেক মাছের মধ্যে কয়েকটি মাছ আবার জলে ছেড়ে দেয়। অনেক হয়েছে এরা থাক, সাঁতার কাটুক। ছাড়া পেয়ে মাছগুলো হাসতে হাসতে চলে যায়। সুনিতার—মাছেদের সাথে জলে ভেসে যেতে ইচ্ছে করে। কিন্তু সুখিতা হাজংয়ের আসবার সময় হয়ে এলো প্রায়। এরমধ্যে মাছকয়টা কেটে বেছে রান্না করতে পারলে সে এসে খেতে পারবে। সকালে অল্প কয়টা খেয়ে গেছে পাহাড়ে। যে খাওয়া পাহাড়ে উঠতে উঠতেই হজম হয়ে যায়।

সুনিতা মাছ নিয়ে ঘরে ফিরে। ছোট মাছ। তেমন আঁচিল নেই। কোনোমতে পেটটা কেটে ধুইয়ে বাটিতে রাখে। এরপর একটা ছোট্ট পিঁয়াজ কুঁচি কুঁচি করে কাটে। কাটা পিঁয়াজ, হলুদ, মরিচসহ একসাথে পাটায় বেটে নেয়। কাটা মাছে লবণ হলুদ মাখায়। চুলার উপরের মাঁচা থেকে দুটো গোবরের গইঠা বের করে আগুন জ্বালায়।

তেলের বোতলটি সুনিতা আগেই উপর করে রেখেছিল। এবার বোতলের মুখটি খুলে কড়াইয়ের উপর ধরে। শিশি নিংড়ানো তেল কড়াইয়ে পড়ে ছ্যাৎ করে ওঠে। বাটির মাছগুলো কড়াইয়ে দিয়ে অল্প একটু জল দিয়ে ঢেকে দেয়।
কিছুক্ষণের মধ্যেই রান্না হওয়া মাছের গন্ধ বেরোয়। নয়া জলের মাছ। রান্নাও মজা, খেতেও মজা। মাছের তরকারি কড়াই বাঁশের মাঁচায় উঠিয়ে রেখে সুনিতা বারান্দায় বসে মায়ের জন্যে অপেক্ষা করে।

আজ ভেবেছিল নদীতে যাবে। ছরায় জল থাকায় নদীতে বড়বেশি যাওয়া হয় না। কিন্তু এখনো কাউকে নেমে আসতে দেখা যাচ্ছে না। মাছ ধরায় এমনিতেই পাথিন ভিজে গেছে। বেশিক্ষণ ভেজা কাপড়ে থাকলে জ্বর আসতে পারে। অনেকক্ষণ ভেবে সুনিতার মনে হয় নদী থেকে পাহাড় দেখা যাবে। আর যখন সবাইকে নামতে দেখা যাবে তখন দ্রুত পা চালালেই সে মায়ের আগে চলে আসতে পারবে। এমনটি ভেবেই সুনিতা উঠে যায়। আলনা থেকে পাথিন আর গামছা টেনে নিয়ে উঠানে দাঁড়িয়ে হাঁক ছাড়ে—

জলে গেলাম ছান করতে। সবাই আইলো।

Leave a Reply