শিরোপা জিতে বিশ্বকাপের প্রস্তুতি সারতে চায় বাংলাদেশ

আয়ারল্যান্ডের ত্রিদেশীয় ওয়ানডে টুর্নামেন্ট বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের কাছে বিশ্বকাপের প্রস্তুতির সিরিজ। একই ওয়েস্ট ইন্ডিজের কাছেও। লিগ পর্বে আয়ারল্যান্ড-ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দুর্দান্ত পারফরমেন্স করে দাপটের সাথেই ফাইনালে উঠে বাংলাদেশ। পারফরমেন্সের এই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখে ফাইনালের শিরোপাও জিততে চায় টাইগাররা। ত্রিদেশীয় সিরিজের শিরোপা জিতে বিশ্বকাপের প্রস্তুতি ভালোভাবে সাড়তে চায় বাংলাদেশ। ফাইনালে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ওয়েস্ট ইন্ডিজ। লিগ পর্বে দু’বারই বাংলাদেশের কাছে হেরেছে ক্যারিবীয়রা। তাই ফাইনালের মঞ্চে ফেভারিটের তকমা নিয়েই খেলতে নামবে মাশরাফির দল। আগামীকাল ডাবলিনের মালাহিডে বাংলাদেশ সময় ৩টা ৪৫ মিনিটে হবে সিরিজের ফাইনাল।
আয়ারল্যান্ডের উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়ার আগে ত্রিদেশীয় সিরিজকে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়েছিলেন বাংলাদেশ অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা। বিশ্বকাপকে মাথায় রেখেই এত বেশি গুরুত্ব ম্যাশের, ‘বিশ্বকাপে প্রথমেই নয়টা ম্যাচ খেলতে হবে। তার আগে আয়ারল্যান্ড সিরিজ আছে। কিন্তু নয়টা ম্যাচে কঠিন পরিস্থিতি আসবে। সে পরিস্থিতি মোকাবেলা করার মানসিকতা খুব বেশি জরুরি। উত্থান-পতন দুই থাকবে, তবে সেগুলো যেন পরের ম্যাচেই ঘুড়ে দাড়াতে পারি, এই ধরনের মানসিকতা খুব জরুরি। আমার মনে হয়, আয়ারল্যান্ড থেকেই সেটা আমাদের অনুশীলন করতে হবে। যাতে আমরা এসব পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে বিশ্বকাপে প্রস্তুত থাকি।’

শুধুমাত্র মাশরাফিই নন, ত্রিদেশীয় সিরিজকে গুরুত্ব দিয়েছিলো পুরো বাংলাদেশ দলই। কারন এই সিরিজ শেষেই যে ক্রিকেটের সবচেয়ে মর্যাদাকর বিশ্বকাপ টুর্নামেন্টে খেলতে নামবে টাইগাররা। তাই এখন অবধি ত্রিদেশীয় সিরিজে যা পারফরমেন্স করেছে বাংলাদেশ, তাতে বাহ-বা পাওয়ার যোগ্য রাখে মাশরাফি-সাকিব-মুশফিকুররা। তাদের এমন পারফরমেন্স বলে দেয়, বিশ্বকাপের জন্য নিজেদের বেশ ভালভাবেই তৈরি করছে বাংলাদেশ।
লিগ পর্বে ৪ ম্যাচের ৩টিতেই দাপট দেখিয়ে হেসেখেলে জিতেছে বাংলাদেশ। একটি ম্যাচ বৃষ্টির কারনে পরিত্যক্ত হয়। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৮ উইকেটে বড় জয় দিয়ে টুর্নামেন্ট শুরু করে টাইগাররা। ওয়েস্ট ইন্ডিজের ২৬২ রানের টার্গেট টপ-অর্ডারের প্রথম চার ব্যাটসম্যানের হাত ধরেই স্পর্শ করে ফেলে বাংলাদেশ। দুই ওপেনার তামিম ইকবাল-সৌম্য সরকার ১৪৪ রানের জুটি গড়েন। দু’জনই হাফ-সেঞ্চুরি তুলে চোখ ধাধাঁনো ইনিংস খেলেন। তামিম ৮০ ও সৌম্য ৭৩ রান করেন। এরপর সাকিব অপরাজিত ৬১ ও মুশফিকুর অপরাজিত ৩২ রান করেন। এ ম্যাচে বল হাতে উজ্জল ছিলেন বাংলাদেশের বোলাররা। অধিনায়ক মাশরাফি ৩টি, মোহাম্মদ সাইফউদ্দিন-মুস্তাফিজুর ২টি করে এবং সাকিব-মিরাজ ১টি করে উইকেট শিকার করেন।

এরপরের ম্যাচে বৃষ্টির কারনে আয়ারল্যান্ডের সাথে পয়েন্ট ভাগাভাগি করতে হয় বাংলাদেশকে। তাই প্রথম পর্ব থেকে একটি জয়কে সঙ্গী করে ফিরতি পর্বে আবারো ওয়েস্ট ইন্ডিজের মুখোমুখি হয় মাশরাফিবাহিনী। ঐ ম্যাচে বোলাররা বাংলাদেশের জয়ের স্বপ্ন দেখান। প্রথম ম্যাচে যেভাবে পারফরমেন্স করেছিলেন মাশরাফি-মুস্তাফিজ-সাকিবরা। এবারও দুর্দান্ত বোলিং নৈপুন্যে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ২৪৭ রানের মধ্যে আটকে রাখেন মাশরাফি-মুস্তাফিজ-সাকিবরা। মুস্তাফিজ ৪টি, মাশরাফি ৩টি ও সাকিব-মিরাজ ১টি করে উইকেট পকেটে ভড়েন।

২৪৮ রানের টার্গেট পেয়ে সহজেই তা স্পর্শ করে ফেলেন বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। তামিম ২১, সৌম্য ৫৪, সাকিব ২৯, মুশফিক ৬৩, মোহাম্মদ মিথুন ৪৩, মাহমুদুল্লাহ অপরাজিত ৩০ রান করে বাংলাদেশের ফাইনাল নিশ্চিত করে ফেলেন। তাই ম্যাচ শেষে বাংলাদেশ বোলারদের প্রশংসা করেন মাশরাফি, ‘আমরা সত্যিই ভালো বল করেছি। শুরুটা ভালো হয়নি, তবে পরবর্তীতে ব্রেক-থ্রু পেয়েছি। মাঝের ওভারগুলোতে ফিজ ভালো বল করেছে, সাকিব ও মিরাজও দারুণ করেছে। ফাইনালে যাওয়াটা আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ফাইনালেও আমরা নিজেদের সেরা পারফরমেন্সই করবো।’
তাই লিগ পর্বে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের শেষ ম্যাচটি হয়ে পড়ে নিয়মরক্ষার ম্যাচ। নিয়মরক্ষার হলেও নিজেদের পারফরমেন্সের ব্যাপারে বেশ সর্তকই ছিলো টাইগাররা। তারপরও রিজার্ভ বেঞ্চ ঝালিয়ে নিতে চারটি পরিবর্তন এনে সেরা একাদশ সাজায় বাংলাদেশ টিম ম্যানেজমেন্ট।

তবে ডান-হাতি পেসার আবু জায়েদের দুর্দান্ত বোলিং-এর পরও প্রথমে ব্যাট করে বড় সংগ্রহ দাঁড় করিয়ে ফেলে আয়ারল্যান্ড। ওপেনার পল স্ট্রার্লিং-এ সেঞ্চুরিতে ৮ উইকেটে ২৯২ রান করে আইরিশরা। জায়েদ ৯ ওভারে ৫৮ রান দিয়ে ৫ উইকেট শিকার করেন।

২৯৩ রানের বড় লক্ষ্য স্পর্শ করতে মোটেও বেগ পেতে হয়নি বাংলাদেশের। কারন ব্যাট হাতে দুর্দান্ত ফর্মেই রয়েছে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা। সৌম্যকে বিশ্রামে রেখে লিটন দাসকে ইনিংসের শুরুতে তামিমের সঙ্গী করে বাংলাদেশের টিম ম্যানেজমেন্ট। সুযোগ পেয়েই জ্বলে উঠেন লিটন। তামিমকে নিয়ে ১০০ বলে ১১৭ রানের জুটি গড়েন লিটন। নিজেদের ব্যক্তিগত রানটাও বলার মত করে দাড় করিয়েছেন তারা। তামিম ৫৩ বলে ৫৭ ও লিটন ৬৭ বলে ৭৬ রান করেন। এরপর সাকিব আহত অবসর হবার আগে ৫১ বলে ৫০, মুশফিক-মাহমুদুল্লাহ ৩৫ রান করে করলে ৭ ওভার আগেই ম্যাচ শেষ করে দেন। যার ফলে তিন জয় নিয়ে ফাইনালের মঞ্চে বাংলাদেশ।
এবার আসল লড়াইয়ে নিজেদের মেলে ধরার পালা বাংলাদেশের। বিশ্বকাপের আগে এই ট্রফিটি বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাস অনেকখানি বাড়িয়ে দিবে বলেও অভিমত দিয়েছিলেন টাইগার নেতা মাশরাফি, ‘যদি এখান থেকে জিতে বিশ্বকাপে যেতে পারি তাহলে ভালো হবে। দলের সকলের মধ্যেই আত্মবিশ্বাস কাজ করবে।’

আর গতকালও আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচ শেষে পুরস্কার বিতরনী অনুষ্ঠানে নিজের আত্মবিশ্বাসের কথা বললেন মাশরাফি। লিগ পর্বের ৩ জয়ে ফাইনালের জন্য প্রস্তুত বলে জানান ম্যাশ, ‘তিন জয়ে আমরা বেশ ফুরফুরা অবস্থায় রয়েছি। ফাইনালটি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য ফাইনালের দিন আমাদের অনেক বেশি পরিশ্রম করতে হবে।’
শিরোপা জয়ের জন্য মরিয়া ওয়েস্ট ইন্ডিজও। লিগ পর্বে দু’বারই বাংলাদেশের কাছে হারতে হয়েছে ক্যারিবীয়দের। কিন্তু ঐ স্মৃতি মাথা থেকে মুছে ফেলে ফাইনালের দিকেই চোখ দিতে চান ওয়েস্ট ইন্ডিজের অফ-স্পিনার অ্যাশলে নার্স। তিনি বলেন, ‘লিগ পর্ব শেষ, এখন আমাদের সামনে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ফাইনাল ম্যাচটি। লিগ পর্বে আমরা ভালো খেলেছি। ফাইনালে জায়গা করে নিয়েছি। তাই এখন আমাদের লক্ষ্য শিরোপা জয়।’
এখন পর্যন্ত ওয়ানডেতে ৩৬ বার মুখোমুখি হয়েছে বাংলাদেশ-ওয়েস্ট ইন্ডিজ। এরমধ্যে ১৩ বার জয় পেয়েছে টাইগাররা। ২১টি জয় ওয়েস্ট ইন্ডিজের। এই সিরিজের আগে ডাবলিনের ক্যাসেল এভিনিউতে একবার মুখোমুখি হয়েছিলো বাংলাদেশ ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ১৯৯৯ সালের বিশ্বকাপের ১২তম ম্যাচ ছিলো সেটি। ঐ ম্যাচে ৭ উইকেটে জয় পায় ক্যারিবীয়রা।

বাংলাদেশ দল(সম্ভাব্য) : মাশরাফি বিন মর্তুজা (অধিনায়ক), সাকিব আল হাসান (সহ-অধিনায়ক), তামিম ইকবাল, সৌম্য সরকার, লিটন কুমার দাস, মুশফিকুর রহিম, মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ, মোহাম্মদ মিঠুন, সাব্বির রহমান, মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত, সাইফউদ্দিন, ফরহাদ রেজা, তাসকিন আহমেদ, মেহেদি হাসান মিরাজ, রুবেল হোসেন, নাইম হাসান, ইয়াসির আলি চৌধুরি, মুস্তাফিজুর রহমান ও আবু জায়েদ রাহি।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ দল (সম্ভাব্য): জেসন হোল্ডার (অধিনায়ক), জন ক্যাম্পেবেল, ড্যারেন ব্রাভো, শাই হোপ, শেলডন কটরেল, শ্যানন গ্যাব্রিয়েল, কেমার রোচ, সুনীল অ্যামব্রিস, রেমন্ড রেইফার, ফ্যাবিয়ান অ্যালেন, অ্যাশলে নার্স, রোস্টন চেজ, শেন ডাউরিচ ও জনাথন কার্টার।