জাতীয়

ডেঙ্গুর ভয়াবহতা বাড়ছে প্রকোপ ৬২ জেলায়

Advertisements

দিন দিন বেড়েই চলেছে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত রোগী এবং নতুন এলাকার সংখ্যা। ৬২ জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে ডেঙ্গু। ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ১৩৩৫ জন ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছেন।

অর্থাৎ প্রতি ঘণ্টায় ৫৫ জনের বেশি। মঙ্গলবার নতুন করে আরও পাঁচজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপসচিবের স্ত্রী রয়েছেন।

এদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, দ্বিতীয়বার ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন এমন রোগীর ক্ষেত্রে মৃত্যুহার পাঁচ শতাংশ। প্রতিবছর একটি বা দুটি সেরোটাইপে ডেঙ্গু রোগের সংক্রমণ ঘটলেও এবার চারটি সেরোটাইপেই সংক্রমণ ঘটছে।

সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন ১৬-৩০ বছর বয়সীরা। আগস্টে এ রোগের প্রকোপ আরও বাড়তে পারে।

বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালগুলোয় রোগী সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। স্থান সংকুলান না হওয়ায় হাসপাতালের ফ্লোর, বারান্দাসহ বিভিন্ন খালি জায়গায় রোগীদের রেখে চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। শুধু জুলাইয়ের ২৯ দিনে ভর্তি হয়েছেন ১৩ হাজার ১৮২ জন।

আর জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত মোট ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৫ হাজার ৩৬৯ জন। এর মধ্যে বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৪ হাজার ৪০৮ জন এবং সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন ১০ হাজার ৯৫৩ জন। সরকারি হিসাবে এ পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৮ জনের।

তবে বেসরকারি বিভিন্ন সূত্রমতে, মৃতের সংখ্যা কমপক্ষে ৫ গুণ এবং আক্রান্তের সংখ্যা ১০ গুণ বেশি। তবে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগী ও মৃতের সংখ্যা নিয়ে ধূম্রজাল কাটছে না।

রাজধানীর সরকারি-বেসরকারি কোনো হাসপাতালে রোগীদের তিলধারণের অবস্থা না থাকলেও অধিদফতরের কন্ট্রোলরুমে তথ্য আসছে ১২টি সরকারিসহ মাত্র ৩৫টি হাসপাতাল থেকে। অথচ ঢাকায় স্বাস্থ্য অধিদফতরের নিবন্ধিত ও অপেক্ষমাণ বেসরকারি হাসপাতালের সংখ্যাই প্রায় ৩০০।

সেই হিসাবে মাত্র ৭ ভাগ ডেঙ্গু রোগীর তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। আর ৯৩ ভাগ তথ্যই অজানা থেকে যাচ্ছে বলে জানায় সংশ্লিষ্ট সূত্র। পরিস্থিতি উত্তরণে বৃহস্পতিবার রাজধানীর সব প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর।

ওইদিন ঢাকার সব মেডিকেল কলেজসহ চিকিৎসা সংক্রান্ত ৭০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা স্কুলের শিক্ষার্থীদের ডেঙ্গু বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে ধারণা দেবে।

বৃহস্পতিবার সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত এ কার্যক্রম চলমান থাকবে। মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত সভায় এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

এ প্রসঙ্গে স্বাস্থ্য অধিদফতরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের ডিপিএম (ডেঙ্গু) ডা. এমএম আক্তারুজ্জামান যুগান্তরকে বলেন, বুধবার মেডিকেল শিক্ষার্থীদের একটি ডেসিমিনেশন করা হবে।

যাতে পরদিন তারা স্কুলের শিক্ষার্থীদের এ পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় সম্পর্কে বলতে পারে। আমরা আশা করি, এই প্রক্রিয়ায় স্কুলের শিক্ষার্থীরা তাদের বাসা-বাড়ি ও আশপাশের এলাকায় অবস্থিত ডেঙ্গুর প্রজননক্ষেত্র ধ্বংস করতে সংক্ষম হবে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেঙ্গুবিষয়ক গবেষণার বিষয়ে মঙ্গলবার ভাইরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী সাংবাদিকদের জানান, বর্তমানে ঢাকাসহ সারা দেশে ডেঙ্গু এবং এর ব্যাপক প্রাদুর্ভাব চিকিৎসকসহ সব মহলে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

১ জানুয়ারি থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত ভাইরোলজি বিভাগ পরিচালিত এক গবেষণায় ৬১২৯ জনের মধ্যে ১২৭৮ জনের ডেঙ্গুর সংক্রমণ ধরা পড়েছে। অর্থাৎ গড়ে ২১ শতাংশ ডেঙ্গু ধরা পড়েছে। আক্রান্তদের মধ্যে নারী ও পুরুষ অনুপাত হল ১:২ দশমিক ৭।

গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিবছর একটি বা দুটি সেরোটাইপে ডেঙ্গুর সংক্রমণ ঘটলেও এবার ৪টি সেরোটাইপের ডেঙ্গুর সংক্রমণ ঘটছে। আক্রান্তদের মধ্যে বেশির ভাগই পুরুষ। যাদের বয়স ১৬ থেকে ৩০ বছর।

আক্রান্তদের মধ্যে ২৬ শতাংশ এনএস১ পজেটিভি, ৬ শতাংশ আইজিএম পজেটিভ, ৫ শতাংশ আইজিএম ও আইজিজি পজেটিভ। অধ্যাপক মুন্সী বলেন, প্রতি ১০০ জন আইজিএম ও আইজিজি পজেটিভ রোগীর মধ্যে মাত্র ৫ শতাংশের ডেঙ্গু হেমোরিজিক হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বিগত ৮ বছরের গবেষণায় একটি বিষয় স্পষ্টত প্রতিয়মান হয়েছে, এই সময়ে প্রতিবছর আগস্টে ডেঙ্গু সবচেয়ে প্রকট আকার ধারণ করে। তিনি জানান, ভাইরোলজি বিভাগ থেকে বিনামূল্যে পরীক্ষা করা হচ্ছে।

এছাড়া বিগত ২০০০ সালের ডেঙ্গু প্রাদুর্ভাবের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগে দেশে প্রথম নির্ণয় করা হয় এবং পরে ২০১৩ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত এ সংক্রান্ত গবেষণা পরিচালিত হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে উপাচার্য অধ্যাপক ডা. কনক কান্তি বড়ুয়া জানান, ২৯ জুলাই পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের বহির্বিভাগে ডেঙ্গু চিকিৎসাসেবা নিয়েছেন ৩ হাজার ৭০০ জন।

যাদের মধ্যে বয়স্ক ২২০০ জন এবং শিশু ১ হাজার ৫০০ জন। বর্তমানে ডেঙ্গু রোগীদের সিবিসি ই পিবিএফ প্লাস, এন্টি ডেঙ্গু এনএস১, এন্টি ডেঙ্গু আইজিএম প্লাস আইজিজি ইত্যাদি রুটিন টেস্ট ফ্রি করা হচ্ছে। তাছাড়া ভর্তি রোগীর জন্য প্রয়োজনীয় অন্য সব পরীক্ষা ফ্রি করা হচ্ছে। ভর্তি রোগীকে সব ধরনের ওষুধ বিনামূল্যে দেয়া হচ্ছে।

বর্তমানে ২ জন রোগী আইসিইউ এবং এইচডিইউতে ভর্তি আছেন। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে ডেঙ্গু রোগীর বেড সংখ্যা ১৫০টি ছাড়াও মেডিসিন ও শিশু বিভাগে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি আছে।

সেখানে শিশু বিভাগে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ জন ডেঙ্গুর সংক্রমণ নিয়ে আসছে। শিশু বহির্বিভাগে দুই সপ্তাহে ২০০ ডেঙ্গু রোগী চিহ্নিত হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩৪ জন ভর্তি হয়েছে। ৩৪ জনের মধ্যে ডেঙ্গুজ্বর হল ১২, ডেঙ্গু হেমোরেজিক জ্বর ১৬, ডেঙ্গু শক সিনড্রম ৬ জন শিশু।