আইন-আদালত জাতীয়

নুসরাত হত্যা মামলায় অধ্যক্ষ সিরাজসহ ১৬ জনের মৃত্যুদন্ড

Advertisements

ফেনীর সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা মামলার রায়ে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার বরখাস্তকৃত অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলাসহ ১৬ জনকে মৃত্যুদন্ড দিয়েছেন আদালত।
আজ বৃহস্পতিবার ফেনীর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মো. মামুনুর রশিদ আসামিদের উপস্থিতিতে এ রায় ঘোষণা করেন।
রায়ে মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত প্রত্যেককে ১ লাখ টাকা করে জারিমানাও করা হয়।
রায়ে জরিমানার অর্থ আইন মোতাবেক আদায় করে নুসরাতের পিতামাতাকে দেয়ার জন্য জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট ফেনীকে নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
এসময় ১৬ আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়। এর আগে সকালে প্রিজন ভ্যানে করে তাদের ফেনী জেলা কারাগার থেকে আদালতের হাজতখানায় আনা হয়।
মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্তরা হলেন, সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার বরখাস্তকৃত অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা, রুহুল আমিন, সোনাগাজী পৌরসভার কাউন্সিলর মাকসুদুল আলম, মাদ্রাসার শিক্ষক আবদুল কাদের, প্রভাষক আফসার উদ্দিন, মাদ্রাসার ছাত্র নূর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ যোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, কামরুন নাহার মনি, উম্মে সুলতানা পপি ওরফে তুহিন, আবদুর রহিম শরিফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন মামুন, মোহাম্মদ শামীম ও মহি উদ্দিন শাকিল।
বিচারক সকাল ১১ টা ১০ মিনিটে মানবতা বিরোধী কর্মকান্ড আখ্যায়িত করে এ রায় পাঠ শুরু করেন। এ রায়ে বিচারক আসামীদের অপরাধের বিবরণ উল্লেখ করেন।
রায়ে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসার বরখাস্তকৃত অধ্যক্ষ সিরাজুদ্দৌলাকে, ভিকটিম নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার নির্দেশদাতা উল্লেখ করা হয়।
এছাড়া অন্যান্য আসামিদের নুসরাতকে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার পরিকল্পনাকারী, বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেয়া ও সর্বাত্মক সহযোগিতা করা এবং পরিকল্পনা মাফিক গেটের বাইরে পাহারা দেয়া, নুসরাতের গায়ে আগুন দেবার জন্য কেরোসিন সংগ্রহ, নুসরাতকে হাত পা বেঁধে ছাদে ফেলে দিয়ে তার মুখ ও মাথা চেপে ধরে আগুন দেয়ায় সরাসরি অংশগ্রহন করার জন্য দায়ী করেন।
এছাড়া অপর আসামীদের তাকে হত্যার পরিকল্পনা, বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেয়া, হত্যায় সহযোগিতা প্রদান, অগ্নিসংযোগ ঘটানোর জন্য ১০ হাজার টাকা প্রদান, হত্যাকান্ডের ঘটনাকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টার জন্য দায়ী করা হয়। অগ্নিকান্ডে ব্যবহৃত বোরকা ও হাত মোজা সংগ্রহ করা, নুসরাতকে সাইক্লোন সেন্টারের ছাদে ফেলে শুইয়ে দিয়ে বুক চেপে ধরে অগ্নিসংযোগ নিশ্চিত করা, পরিকল্পনা মাফিক নুসরাতকে সাইক্লোন সেন্টারের ছাদে ডেকে নেয়া, অগ্নিসংযোগের সময় ফ্লোরে ফেলে দিয়ে পা চেপে ধরা ইত্যাদি প্রমাণিত হওয়ায় বিচারক এ রায় ঘোষণা করেন।
মামলার বাদী নুসরাতের বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা চেয়েছেন বলেই এত দ্রুততম সময়ের মধ্যে রায় দেওয়া সম্ভব হয়েছে। নোমান আরো বলেন, ‘অপরাধ করে কেউ পার পাবে না। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয় এটা আবার প্রমাণিত হল।
এ মামলার বাদী পক্ষের আইনজীবী এডভোকেট শাহজাহান সাজু মামলার রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, দেশে আইনের শাসন রয়েছে এ রায়ে তা প্রমাণিত হয়েছে।
পাবলিক প্রসিকিউটর এডভোকেট হাফেজ আহম্মদ বলেন, এ রায়ে আমরা সন্তুষ্টি প্রকাশ করছি। তিনি আরো বলেন, যে সহিংসতা ফেনীবাসী দেখেছে তার উপযুক্ত বিচার হয়েছে। তিনি দ্রুত এ রায় কার্যকর প্রত্যাশা করেন।
মামলার রায়ে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে আসামীপক্ষের আইনজীবি গিয়াস উদ্দিন নান্টু বলেন, সাক্ষীদের কেউই মামলায় অভিযুক্তদের হত্যাকারী হিসেবে চিহ্নিত করতে পারে নি। তিনি বলেন, আমরা উচ্চ আদালতে এ রায়ের বিরুদ্ধে আপীল করব।
রায় শুনে আসামীরা প্রত্যেকে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। সিরাজ উদ্দৌলাকে কাঁদতে দেখা যায়। অন্যান্য আসামীরাও এজলাসে কাঁদতে থাকে।
উল্লেখ্য, ২৭ মার্চ ফেনীর সোনাগাজী ইসলামীয়া ফাজেল (ডিগ্রী) মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাতকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ এনে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনের ১০ ধারায় মামলা করে তার মা। ২৮ মার্চ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট এএসএম এমরানের আদালতে নুসরাত তার উপর যৌন নিপীড়নের জবানবন্দি প্রদান করে। একই দিন সোনাগাজী থানা পুলিশ অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করে।
গত ৬ এপ্রিল ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসায় আলিম পরীক্ষা কেন্দ্রে গেলে নুসরাতকে ছাদে ডেকে নিয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। ৮ এপ্রিল তার ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদি হয়ে সোনাগাজী মডেল থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা করে। ১০ এপ্রিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শেখ হাসিনা বার্ণ ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নুসরাতের মৃত্যু হয়।
এ মামলা ১০ এপ্রিল পুলিশ ব্যুরো ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) কে হস্তান্তর করা হয়। ১৬ জনকে অভিযুক্ত করে চলতি বছরের ২৯ মে পিবিআই পুলিশ আদালতে চার্জশীট দাখিল করে। আদালত ২৭ জুন হতে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে মোট ৬১ কার্যদিবসে ৮৭ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে আজ এ রায় ঘোষনা করেন।