জানাঅজানা

ডুবন্ত গ্রাম এবার বিলীন হওয়ার মুখে!

Advertisements

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে। এতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের উপকূলীয় এলাকাগুলো ডুবছে ধীরে ধীরে। ফিলিপাইনের সিতিও পারিয়াহান তেমনই একটি ডুবন্ত গ্রাম। এর অবস্থা এমন যা খুব অল্প সময়ের মধ্যে বিলীন হয়ে যাওয়ার হুমকির মধ্যে রয়েছে।

দেশটির রাজধানী ম্যানিলা থেকে উত্তরে মাত্র ১৭ কিলোমিটার দূরে গ্রামটির অবস্থান। ইতোমধ্যে গ্রামটি ডুবে আছি পানিতে। এখানে প্রতিবছর পানির উচ্চতা ৪ সেন্টিমিটার (১ দশমিক ৫ ইঞ্চি) করে বাড়ছে। এভাবে চলতে থাকলে একসময় পানিতে তলিয়ে যাওয়ার কারণে বসবাসের অনুপযোগী হয়ে যাবে গ্রামটি। যদিও একসময় এটি ছিল দ্বীপ।

পানিতে ডুবে যাওয়ার পরও এখানে বাস করছে বহু পরিবার। এরমধ্যে রয়েছে দানিকা মার্টিনেজের পরিবারও। তার পরিবারের দৈনন্দিন জীবনযাপন এবং গ্রামের অবস্থা নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স। প্রতিবেদনটি তুলে ধরা হলো।

দানিকা মার্টিনেজ।

১৬ বছর বয়সী দানিকা মার্টিনেজ সিতিও পারিয়াহান গ্রামের বাসিন্দা। সে এমন ঘরে বেড়ে উঠেছে এবং বাস করছে যা পানির উচ্চতা বাড়ার কারণে কয়েকবছরের ব্যবধানে বারবার উঁচু করে তৈরি করতে হয়। তবে, তার বাবা বাঁশের সাহায্যে বাড়ির মেঝে এমনভাবে উঁচুতে স্থাপন করেছেন যেন পানি সে পর্যন্ত না পৌঁছায়।

বিশেষজ্ঞরা আশংকা করছেন, বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে যেভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ছে এতে একসময় গ্রামটি বসবাসের অযোগ্য হয়ে যাবে। এশিয়ার অন্য অনেকগুলো দেশও একই সমস্যার মুখোমুখি। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে দরিদ্র জনগোষ্ঠী।

পানিতে ডুবে আছে গ্রাম।

এ গ্রামে পানির একমাত্র উৎস হচ্ছে গভীর নলকূপ। এর পানি দিয়েই বাসিন্দারা গোসল থেকে শুরু করে রান্না, খাওয়াসহ বাকি কাজ সারেন। বাড়ির টিনের ছাদ যেন তাদের খেলার মাঠ!

প্রায় প্রতিটি বাড়ির ছাদেই সোলার প্যানেল স্থাপন করা হয়েছে বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে। আর অধিকাংশ সময়েই টেলিভিশন দেখতে হয় প্রতিবেশীদের সঙ্গে নিয়ে। যখন বিদ্যুতের সরবরাহ থাকে না তখন গ্রামের বাসিন্দারা সময় পার করেন জুয়া খেলে।

টিনের ছাদ যেন খেলার মাঠ!

মার্টিনেজের অবশ্য এ গ্রাম নিয়ে ভিন্ন অভিজ্ঞতাও রয়েছে। কারণ জলমগ্ন এ গ্রামের ভিন্ন রূপও দেখেছিল সে। কারণ গ্রামটি সবসময় এমন ছিল না। গ্রামে একসময় আয়োজিত বাস্কেটবল টুর্নামেন্ট এবং মেলার কথা মনে পড়ে তার। একইসঙ্গে গ্রামের চার্চে আয়োজিত নানা অনুষ্ঠান উপভোগ করতে মানুষ আসতো পাশের শহর থেকেও। যদিও এখন এসব স্মৃতি তার কাছে।

গ্রামের বাস্কেটবল খেলার কোর্ট এখন সম্পূর্ণ পানিতে নিমজ্জিত। আর গির্জা? গির্জার শরীরজুড়ে ছোপ ছোপ দাগ, জমেছে শ্যাওলা।

গ্রামের গির্জা।

২০১১ সালে ফিলিপাইনে আঘাত হানে টাইফুন নেসাট। এসময়েই এ গ্রাম সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা খায়।

মার্টিনেজের ভাষায়, সেসময় বাড়ির সমান উঁচু উঁচু ঢেউ আছড়ে পড়েছে গ্রামে। আমি দেখেছিলাম কীভাবে ঘরবাড়ি একে একে খড়খুটার মতো ভাসতে ভাসতে চলে গেছে সমুদ্রে। সেবার আমি এবং ভাই-বোনেরা বেঁচে গিয়েছিলাম বাঁশের খুঁটির জোরে। আমাদের স্কুল ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। প্রায় ৫০টির মতো পরিবার গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে, যারা আর ফেরেনি।

মার্টিনেজ এবং তার ভাই-বোনেরা এখন স্কুলে যায় ৩০ মিনিট বোটে চড়ে। মাঝেমধ্যে ঢেউয়ের পানি আছড়ে পড়ে নৌকায়, ভিজিয়ে দেয় তাদের স্কুল ইউনিফর্ম।

‘এটা ভয় জাগায় মনে। কিন্তু আপনি যখন এখানে বাস করবেন আপনাকে এতে বাধ্যতামূলকভাবে অভ্যস্ত হয়ে যেতে হবে। এটা কঠিন যদিও; আবার অন্যদিক দিয়ে মজাও।’

জীবন ধারণের জন্য মার্টিনেজদের পরিবার এ বোটের ওপর নির্ভর করে। মার্টিনেজের মা ম্যারি মার্টিনেজ বলেন, ‘এখানে বোট ছাড়া আপনি সম্পূর্ণ অকেজো।’

বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা।

এখানে থাকা দিনকে দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে ঠিকই এরপরও ম্যারি জেইন শহর থেকে এ গ্রামকেই বেশি প্রাধান্য দেন।

‘এখানে কঠোর পরিশ্রম করলেই শুধু অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা সম্ভব। আপনাকে সমুদ্রে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে খাদ্যের খোঁজে। আর ভূমিতে করতে হবে কঠোর পরিশ্রম। যদিও যথেষ্ট পরিমাণে ভূমি নেই বললেই চলে’, যোগ করেন ম্যারি।

ম্যারির স্বামী ডমিঙ্গোর মতে, আসলে এ গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়াই একমাত্র বিকল্প নয়। আর আমাদের যাওয়ার তেমন কোনো জায়গা নেই বললেই চলে। অবশ্য আমরা নিকটবর্তী শহরে বাসা ভাড়া নেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম একবার কিন্তু সেখানে থাকা হয়নি।

‘আমাদের ঘরবাড়ি এখানে। যদি আমাদের এ দ্বীপ ছেড়ে যেতে হয় তবে জীবন ধারণ করা কঠিন হয়ে যাবে’, বলেন ডমিঙ্গো।

ডমিঙ্গো সমুদ্র থেকে কাঁকড়া শিকার করে বাজারে বিক্রি করেন।

জলাবায়ু বিশেষজ্ঞ ফার্নান্দো সিরিগান সিতিও পারিয়াহান নিয়ে গবেষণা করেছেন। তার মতে, ম্যানিলার উত্তরের এ অংশের পরিবেশ দ্রুত বদলে যাচ্ছে। কেননা এসব এলাকায় একদিকে কমছে ভূমির পরিমাণ অন্যদিকে বাড়ছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা।

ডিসেম্বরের ২ থেকে ১৩ তারিখ পর্যন্ত স্পেনের মাদ্রিদে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতিসংঘের জলবায়ু বিষয়ক সম্মেলন। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং অস্ট্রেলিয়ায় ভয়াবহ দাবানল, ইউরোপের বিভিন্ন অংশে বন্যার ঘটনা জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। এবারের সম্মেলনটি তাই জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব থেকে বিশ্বকে রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ।