Advertisements

রিয়াদের বিলাসবহুল একটি ক্যাফেতে চেয়ারে বসে চারদিকে খুব সতর্কতার সঙ্গে চোখ রাখছেন রিমা। দেখছেন সেখানে কেউ তার পরিচিত আছেন কিনা। এরপর ইলেক্ট্রনিক সিগারেটে টান মরে ধোঁয়ার কুণ্ডলী ছাড়লেন তিনি।

সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ২৭ বছর বয়সী এই তরুণী ফরাসি বার্তাসংস্থা এএফপিকে বলেন, আমি মনে করি প্রকাশ্যে এই ধূমপান আমার সদ্যজয়ী স্বাধীনতার অবাধ চর্চার অংশ। আমি খুশি যে, এখন নিজের মতো করে যেকোনও কিছু বেছে নিতে পারি।

বিশ শতকের গোড়ার দিকের পাশ্চাত্যের নারীবাদীদের মতো সৌদি আরবে সামাজিক কিছু পরিবর্তনের যুগে এসে দেশটির নারীরা সিগারেট, সীসা পাইপ অথবা ভ্যাপিং টানাকে ‘মুক্তির প্রতীক’ হিসাবে গ্রহণ করছেন।

গত কয়েক মাসে সৌদি আরবে খোলামেলা স্থানে প্রকাশ্যে নারীদের ধূমপানের ঘটনা খুব বেশি দেখা যাচ্ছে। যা অতি-রক্ষণশীল সৌদি আরবে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক সংস্কারে নেয়া উদ্যোগের আগে একেবারে অকল্পনীয় ছিল।

 

সৌদি আরবের উচ্চাভিলাষী ডি ফ্যাক্টো নেতা ও ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংস্কারের মাধ্যমে দেশটিকে তেল নির্ভর অর্থনীতি থেকে বের করে ব্যবসাবান্ধব করতে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছেন। তার নেয়া এসব উদ্যোগের কারণে সৌদি আরবের নারীরা এখন প্রকাশ্যে গাড়ি চালানো, খেলার মাঠে অংশগ্রহণ ও কনসার্টে যোগ দিতে পারেন। শুধু তাই নয়, পরিবারের পুরুষ সদস্যের অনুমতি ছাড়াই নিজেদের পাসপোর্টও করতে পারেন তারা।

দুই বছর আগে ধূমপান শুরু করা রিমা তামাকের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে খুব বেশি উদ্বিগ্ন নন। তবে তার এই ধূমপানের খবর পরিবারের সদস্যরা জেনে যেতে পারেন; সেটি নিয়েই বেশি চিন্তিত তিনি। রিমা বলেন, তিনি পরিবারের সদস্যদের কাছে চরম পরীক্ষা দেয়ার জন্য প্রস্তুত আছেন।

মাথার চুল সোনালী রঙয়ের হিজাবে ঢেকে চিরায়ত কালো কাপড়ের আবায়া পরিহিত সৌদি এই তরুণী বলেন, আমি তাদের বলবো না এটি আমার ব্যক্তিত্বের স্বাধীনতা। কারণ তারা বুঝবে না যে, পুরুষের মতো একজন নারীও অবাধে ধূমপান করতে পারেন।

 

রিমার মতো ধূমপান করেন ২৬ বছর বয়সের নাজলা; যিনি নিজের নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, দ্রুত সামাজিক পরিবর্তন সত্ত্বেও সৌদি আরবে এখনও দ্বৈত নিয়ম-নীতি বিদ্যমান রয়েছে। এখানে নারীদের ধূমপান এখনও অসম্মানজনক এবং কেলেঙ্কারি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ক্যাফের একটি টেবিলে বেশ কয়েকজন পুরুষ ধূমপায়ীর পাশে তিনিই একমাত্র নারী। নাজলা বলেন, এই সমাজকে ও মানুষের নোংরা দৃষ্টিভঙ্গিকে চ্যালেঞ্জ জানাতে চান তিনি।

এক মেয়ে বন্ধুর ধূমপানের খবর পরিবারের সদস্যরা জেনে যাওয়ার পর তাকে মাদকাসক্ত ক্লিনিকে ভর্তি করা হয় উল্লেখ করে নাজলা বলেন, আমার পরিবার যখন আমাকে একজন ধূমপায়ী হিসেবে মেনে নেবে, তখন আমার অধিকারগুলো পূর্ণ শ্রদ্ধা পাবে।

 

সৌদি আরবের কিং আব্দুল আজিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যাল অনুষদের ২০১৫ সালের এক গবেষণার বরাত দিয়ে আরব নিউজ বলছে, দেশটির হাই স্কুলগামী প্রায় ৬৫ শতাংশ মেয়ে শিক্ষার্থী গোপনে ধূমপান করেন। নাজলাও হাই স্কুলে থাকাকালীন ধূমপান শুরু করেছিলেন বলে জানান।

সবকিছু অবাধ, তারপরও রয়েছে সীমাবদ্ধতা

যে দেশটিতে কয়েক বছর আগেও নেইল পোলিশ করার কারণে অথবা হিজাবের ফাঁক গলে চুল বেরিয়ে পড়ার কারণে মেয়েদের তাড়া করে ধরতো ধর্মীয় পুলিশ; সেই দেশটিতে ব্যাপক সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হলেও এখনও বেশ কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। উত্তর রিয়াদের একটি ক্যাফেতে কর্মরত লেবানিজ এক ওয়েটার বলেন, আমাদের অধিকাংশ নারী গ্রাহক এখন সীসার অর্ডার করেন। এটি এমন একটি বিষয়; যা তিন মাস আগেও একেবারে অকল্পনীয় ছিল।

৩৬ বছর বয়সী ধূমপায়ী হেবা ওই ক্যাফেতে বসে আছেন। সবকিছুই নিষিদ্ধের একটি দেশের এমন বদলে যাওয়ার বর্ণনা দিচ্ছিলেন তিনি। হেবা বলেন, আমি ক্যাফেতে পুরুষদের পাশে বসে প্রকাশ্যে সীসা ধূমপান করতে পারবো; এটি কখনই কল্পনা করতে পারি নাই।

 

‘এখন সবকিছুর অনুমতি রয়েছে। নারীরা এখন হিজাব, আবায়া ছাড়াই বাইরে বেরিয়ে আসছেন। এমনকি প্রকাশ্যে ধূমপানও করছেন তারা।’

সৌদি আরবে ব্যাপক সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হলেও দেশটির বেশ কিছু বুদ্ধিজীবী, ধর্মীয় নেতা ও নারী মানবাধিকার কর্মীকে আটকে রাখার অভিযোগ রয়েছে। যে কারণে প্রতিনিয়ত আন্তর্জাতিক বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা সৌদি আরবের ক্ষমতাসীন রাজপরিবারের তীব্র নিন্দা করছে।

২০১৮ সালে নারীদের গাড়ি চালানোর ওপর কয়েক দশকের পুরনো নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেয়ার আগ মুহূর্তে দেশটিতে এক ডজনের বেশি নারী মানবাধিকার কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃত নারীদের অনেকেই জিজ্ঞাসাবাদের সময় যৌন নিপীড়ন এবং নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ গ্রেফতারকৃতদের এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।

By Abraham

Translate »