Advertisements

মুষলধারে বাইরে বৃষ্টি পড়ছে। এমন দিনে অনেকেই ঘরে বসে বাহারি খাবার খায় সঙ্গে বৃষ্টি উপভোগ করে থাকেন। তবে কর্মজীবীদের সেই উপায় নেই। বৃষ্টিতে ভিজেই যেতে হচ্ছে কর্মস্থলে। একে তো গরম তার উপর আবার বৃষ্টি, সব মিলিয়ে জ্বর-ঠাণ্ডা, কাশি, গলাব্যথা হওয়াটাই স্বাভাবিক।

ভরা বর্ষায় সাধারণত ভাইরাস ফিভার বলা হয়। এক্ষেত্রে প্রচণ্ড জ্বরের সঙ্গে মাথা ও পুরো শরীর ব্যথা, খুসখুসে কাশি, দুর্বলতা, খাবার দেখলে বমি বমি ভাব হওয়া এবং মাথা মুড়ানো ইত্যাদি হয়ে থাকে। এ জ্বরে শরীর এতই দুর্বল হয় যে, দাঁড়িয়ে থাকাও কষ্ট মনে হয়। কোনো কাজ করার এনার্জি থাকে না। এ জ্বর অত্যন্ত ছোঁয়াচে এবং বাসার একজনের এ জ্বর হলে একে একে পরিবারের সবার হবে। বিশেষ করে ছোট শিশুরা বেশি ভুগে থাকে।

ছিটেফোঁটা বৃষ্টিতে জ্বর

এই সময় ছিটেফোঁটা বৃষ্টিতে গরম আরো প্রকট হয়ে ওঠে। একে তো মহামারি করোনাভাইরাসের তাণ্ডবে প্রাণ হারাচ্ছে সবাই। তাই সামান্য জ্বর, ঠাণ্ডা ও কাশিতে এখন সবাই করোনা ভেবে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হওয়াটাই স্বাভাবিক। তবে বর্ষায় সাধারণ জ্বর-ঠাণ্ডার সঙ্গে আবার ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া ও জ্বর হচ্ছে ঘরে ঘরে।

ভাইরাস ফিভার হলেও কোনো পরিবারের সবাই আক্রান্ত হতে পারে। এ জ্বর ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়াজনিত হয়ে থাকে। তবে ভাইরাসজনিত প্রকোপেই বেশি। এ জ্বরের তাপমাত্রা ১০১ থেকে ১০২ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠতে পারে। শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা হয়, মাথাব্যথা করে এবং খাবার খেতে প্রচণ্ড অনীহা হয়। শরীর খুবই দুর্বল লাগে। এ জ্বরের মেয়াদ তিন থেকে পাঁচ দিন হতে পারে। জ্বরের মধ্যে চোখ লাল হওয়া, খাবারের প্রতি অনীহা হওয়া ইত্যাদি দেখা যায় নাক দিয়ে পানি পড়ে, খুসখুসে কাশি হয় এবং কখনো কখনো কাশি বেশি পরিমাণে ওঠে।

তবে এ জ্বরের ঘাবড়ানোর কারণ নেই। তিন থেকে পাঁচ দিনেই সেরে যায়। তবে জ্বর সেরে যাওয়ার পরও শরীর খুব দুর্বল লাগে। মাথা ঘোরায়। এ উপসর্গগুলো আস্তে আস্তে ভালো হয় এবং খাবারের রুচি ফিরে আসে। এ ভাইরাস জ্বরে তেমন কোনো ওষুধ লাগে না। জ্বর হলে প্যারাসিটামল বা পেইনকিলার খেতে হবে। তবে খালি পেটে নয়। আর যদি জ্বর পাঁচ দিনেও না সারে তবে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে এবং রক্ত পরীক্ষা করে দেখতে হবে টাইফয়েড বা প্যারাটাইফয়েড বা ডেঙ্গু জ্বর কি না।

জ্বরের সময় ঠাণ্ডা পানিতে মাথা ধুলে ভালো লাগবে এবং সঙ্গে সঙ্গে ভেজা পরিষ্কার কাপড় দিয়ে মুছে দিতে হবে। তখন জ্বর কমে আসবে, খুসখুসে কাশি হলে কফ সিরাপ খেতে হবে। অ্যান্টি অ্যালার্জি ওষুধ খেলে ভালো হয়। পথ্য হিসেবে আনারস, কাগজী লেবু, কালিজিরা ভর্তা দিয়ে গরম ভাত খুব উপকারী। এমন জ্বর হলে শরবত, আনারসের রস ইত্যাদি খেতে হবে। ভয়ের কোনো কারণ নেই। তিন দিন পর এ জ্বর সেরে যাবে।

যেভাবে ঠাণ্ডা বা সর্দি থেকে দ্রুত উপশম লাভ করা সম্ভব

সর্দি-জ্বর পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি হওয়া রোগগুলোর একটি। ওষুধ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যাকমে’র সিনিয়র ম্যানেজার ও চিকিৎসক আফরোজা আখতার জানান, একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির বছরে ৪ থেকে ৬ বার এবং একটি শিশুর বছরে ১০ থেকে ১২ বার সর্দিজ্বর হওয়া স্বাভাবিক বিষয়। অর্থাৎ, আপনার জীবদ্দশায় ২০০ বারের বেশি সর্দি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে আপনার।

ঠাণ্ডা বা সর্দি-জ্বর থেকে বাঁচার ক্ষেত্রে ভিটামিন সি’র ভূমিকা অনেক আগে থেকেই প্রমাণিত। ঠাণ্ডা পরিবেশে বসবাসকারী মানুষ উচ্চমাত্রায় ভিটামিন সি গ্রহণ করে সর্দি-জ্বর বা ঠাণ্ডার হাত থেকে বাঁচতে পারেন বলে প্রমাণিত হয়েছে। সূর্যের আলো বা অন্য কোনো উৎসের মাধ্যমে পর্যাপ্ত পরিমাণ ভিটামিন ডি গ্রহণও শরীরকে ঠাণ্ডার হাত থেকে বাঁচাতে সাহায্য করে।

শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে ১৯৩০ এর দশকে ভিটামিন সি ছিল সবচেয়ে প্রচলিত চিকিৎসা। এটি ৭০ এর দশকে এসে আরো বেশি জনপ্রিয় হয় যখন নোবেল বিজয়ী লিনাস পোলিং গবেষণা করে প্রমাণ করেন যে ভিটামিন সি ঠাণ্ডাজনিত রোগ উপশমে অনেকবেশি কার্যকর।

সম্প্রতি ককরেন গ্রুপের গবেষণায় দেখা গেছে, ঠাণ্ডা থেকে মুক্তিতে ভিটামিন সি’র ভূমিকা খুব বেশি নয়। এটি শরীরের জন্যে ক্ষতিকর নয় এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত ভিটামিন সি শরীর থেকে মূত্রের সঙ্গে বেড়িয়ে যায়। অন্যদিকে জিঙ্ক ক্ষতিকর হয়ে দাঁড়াতে পারে যদি মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। সুতরাং সেক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলাই ভালো।

খুব সামান্য কারণেই ঠাণ্ডা বা সর্দি-জ্বরে আক্রান্ত হতে পারে যে কেউ। সাধারণত কয়েকদিনের মধ্যেই মানুষের সর্দি-জ্বর ভালোও হয়ে যায়। তবে কয়েকটি উপায়ে স্বাভাবিকের চেয়ে দ্রুত সময়ে সর্দিজ্বর ভাল করা সম্ভব বলে বলছেন চিকিৎসকরা।

> ঘুম মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। কাজেই ঠাণ্ডা বা সর্দি-জ্বরের সময় বিশ্রাম নিলে বা বেশি ঘুমালে দ্রুত আরোগ্য লাভ সম্ভব।

> সর্দি-জ্বরের সময় উষ্ণ পরিবেশে থাকা বা উষ্ণ পোশাক পড়ে থাকলে ফলে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

> প্রচুর পরিমাণ পানি বা ফলের রস পানের মাধ্যমে পানিশূন্যতা রোধ করলে ঠাণ্ডা থেকে দ্রুত আরোগ্য লাভ করা যেতে পারে।

> ঠাণ্ডার একটি সাধারণ উপসর্গ গলা ব্যাথা। লবণ পানি দিয়ে গার্গল করা অথবা লেবু এবং মধু দিয়ে হালকা গরম পানীয় তৈরি করে পান করলে গলা ব্যথা দ্রুত উপশম হতে পারে।

ডাক্তার আফরোজা আখতার বলেন, সর্দি-জ্বর সাধারণত কয়েকদিনের মধ্যে সেরে গেলেও বেশিদিন সর্দিজ্বর থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত। টানা সাতদিনের বেশি সর্দি-জ্বর থাকলে বা টানা তিনদিনের বেশি সর্দির সঙ্গে উচ্চমাত্রায় জ্বর থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত।

শিশুদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়ার ক্ষেত্রে সাতদিন অপেক্ষা না করার পরামর্শ দেন মিজ আখতার। শিশুদের তিনদিনের বেশি সর্দি থাকলেই চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত বলে মনে করেন তিনি।

বর্ষার মৌসুমে রোগ জীবাণুর হাত থেকে বাঁচতে সেবন করতে পারেন পাঁচন-

বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার জন্য ভিন্ন রকমের পাঁচন সেবন করা হয়। তুলসী, আদা, মধু, চিনি, গুড়, জিরে, লবঙ্গ, দারুচিনি ইত্যাদি দিয়ে প্রস্তুত পাঁচন সেবনের ফলে আমাদের স্বাদকোরকগুলোও উজ্জীবিত হয়। এসব মশলা এবং হার্ব প্রতিদিনের রান্নায় ব্যবহার করা হয়। তাই প্রায় প্রত্যেকের ঘরেই এসব উপাদানগুলো থাকে। এই বর্ষায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে এবং সুস্থ থাকতে পাঁচন খেতে পারেন।

তুলসি-গুড়ুচি পাঁচন- তুলসি পাতা এবং গুড়ুচি দিয়ে তৈরি পাঁচন রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। ফলে ঠাণ্ডা লেগে হওয়া জ্বর, সর্দি, কাশি উপশম হয়। এই পাঁচন তৈরি করতে প্রয়োজন দুই কাপ পানি, এক চা চামচ চিনি, এক চা চামচ গোলমরিচ গুঁড়া, এক চা চামচ আদা কুচি, এক চা চামচ দেশি ঘি, দুইটি লবঙ্গ ও তুলসি পাতা।

প্রণালী- সসপ্যানে ঘি গরম করুন। একে একে লবঙ্গ, গোল মরিচ, আদা, তুলসি পাতা যোগ করুন। মশলাগুলো ফাটা বন্ধ হলে পানি ও চিনি যোগ করুন। মাঝারি আঁচে ১৫ থেকে ২০ মিনিট মিশ্রণটা ফুটিয়ে নিন। এর মধ্যে কয়েকটি তুলসি পাতা যোগ করে আরো দুই মিনিট ফোটান। এরপর গরম গরম পাঁচন সেবন করুন। ভালো ফল পেতে দিনে দুইবার সেবন করুন।

সূত্র: বিবিসি, এনডিটিভি

By Abraham

Translate »