Advertisements

টলমল পায়ে ঐশিক সবে ইস্কুলে যেতে শুরু করেছে। দু’এক জন করে বন্ধুও হচ্ছে। তারা সকলেই মেয়ে। ছেলেদের সঙ্গে ঐশিকের মোটেই বনছে না। ছেলের এই অবস্থা দেখে মা-বাবা, আত্মীয়রা তো হেসে কুটোপাটি। ভাবখানা – দেখেছ কেমন মেয়েদের সঙ্গেই বন্ধুত্ব করছে। এখনই এত্ত মেয়ে বন্ধু!’

 

নার্সারি বা একটু জুনিয়র ক্লাসের বাচ্চাদের আত্মীয়ের মধ্যে এই ধরনের কথোপকথন কান পাতলেই শোনা যায়। এতে তাঁদের কোনও দোষ দেওয়া যায় না। কারণ আমাদের সমাজের বাঁধুনিটাই যে এ রকম। ছোটবেলা থেকেই ‘বন্ধু’র বদলে মেয়ে বন্ধু-ছেলে বন্ধু মাথার মধ্যে গেঁথে দেওয়া হয়। সে জন্য ছেলেমেয়েকে পাশাপাশি হাঁটতে দেখলে বা একসঙ্গে বসে কোথাও আড্ডা মারতে দেখলে বা খেতে দেখলে – সহজেই তা হয়ে ওঠে ‘প্রেম’, আর বিবাহিত হলে ‘পরকীয়া।’ সে কথাই বললেন হলদিয়া গভার্নমেন্ট কলেজের সমাজতত্ত্বের শিক্ষিকা ও বন্ধুত্ব নিয়ে গবেষণা করে অনন্যা চট্টোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, ‘ছেলেমেয়ের অবাধ মেলামেশা যে থাকতে পারে, ভেঙে বলতে গেলে যৌনতার বাইরেও যে একজন নারীর সঙ্গে এক জন পুরুষের সম্পর্ক থাকতে পারে ও তা নিখাদ বন্ধুত্বের, সেই জায়গাটাই এখনও সমাজ গ্রহণ করতে শেখেনি। সেখান থেকেই এই ধরনের হিংসাত্মক ঘটনা ঘটে।’ তাঁর ব্যাখ্যা, শিশু মনকে বন্ধুত্ব না বুঝিয়ে ছেলে-মেয়ে বোঝানো হয়, তাতে নিকট আত্মীয়রা শরিক। এরাই তো বড় হয়। তখন সেই পুরোনো ধ্যানধারণা ভাঙতে পারে না।

কিন্তু কেন নারী-পুরুষের বন্ধুত্ব নিয়ে সব সময়ই এই তির্যক দৃষ্টিভঙ্গি? নারী অধিকার কর্মী ও অধ্যাপক শাশ্বতী ঘোষ মনে করছেন, ‘যুগ যুগ ধরেই বলা হচ্ছে ঘি আর আগুন একসঙ্গে থাকতে পারে না। মেয়েরা ঘি ও ছেলেরা আগুন। সেটাই আমাদের সমাজের মননে গেঁথে গেছে। তাই কৃষ্ণের সঙ্গে কৃষ্ণার যে অসাধারণ সুন্দর বন্ধুত্ব তা আমরা গ্রহণ করতে পারি না।’

কালনায় ‘পুরুষ’ বন্ধু নিয়ে যে ঘটনা ঘটেছে তাতে অবশ্য অবাক নন কেউ-ই। অনন্যা জানালেন, এটা জানা গিয়েছে বলে খবর হচ্ছে। বাকিগুলো হয়তো এত গুরুতর হয় না, তাই খবর হয় না। শাশ্বতী ঘোষ বললেন, ‘বিয়ের পর থেকে স্ত্রী সম্পত্তি। তাই স্বামী ‘অ্যালাউ’ করছেন কি না তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মানে স্বামী যদি অন্য পুরুষের সঙ্গে কথা বলতে দেন, তা হলেই স্ত্রী তা বলতে পারবেন। এমনকী ২০১৫-১৬র ফ্যামিলি হেল্থ সার্ভেতে উঠে এসেছে স্বামীর ‘অ্যালাউ’ করার প্রশ্ন, তাতেই তো স্পষ্ট কতটা গভীরে এর শিকড়।’

 

সাইকো অ্যানালিস্ট শাওনি বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, ‘গোড়াতেই তো গলদ। এর মধ্যে লুকিয়ে আছে গভীর মনস্তত্ত্ব। এবং সেটা শুধু ছেলেদের নয়, মেয়েদেরও। অনেক সময় তারা নিজেরাও মনে করে বিষম লিঙ্গে বন্ধুত্ব হতে পারে না। এই ভাবনা একদিনে আসেনি। এ বহুদিনের প্র্যাক্টিসের ফল।’

তাই পরিশেষে বলাই যায়, সমাজের এই বস্তাপচা চিন্তাকে ছুড়ে ফেলতে, মুক্ত মনে ছেলে-মেয়েকে নিজেদেরই এগিয়ে আসতে হবে। এ কথা ভুললে চলবে না আত্মীয়তাকেও অনেক সময় ছাপিয়ে যায় বন্ধুত্ব আর তার কোনও লিঙ্গ হয় না।

Translate »