Advertisements

স্বাস্থ্যখাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের পদায়ন, সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে চিকিৎসকদের উপেক্ষা করায় স্বাস্থ্যমন্ত্রীর উপস্থিতিতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন চিকিৎসক নেতারা। তারা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে এ নিয়ে অভিযোগ করে বলেন, প্রশাসন চিকিৎসকদের জায়গা দখল করে নিচ্ছে।

রবিবার ( ১৮ অক্টোবর) রাজধানীর একটি হোটেলে সোসাইটি অব সার্জনস অব বাংলাদেশ আয়োজিত ‘বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে কোভিড-১৯ মহামারিতে সার্জনদের ভূমিকা শীর্ষক’ অনুষ্ঠানে তারা এ ক্ষোভ প্রকাশ করেন। আর এসব সমস্যার সমাধান না হলে ভবিষ্যতে কর্মসূচিও দেবেন বলেও হুঁশিয়ারি দেন তারা। তারা বলেন, আমরা এর আগেও হুঁশিয়ারি করেছি। কিন্তু প্রশাসনের কানে পানি যাচ্ছে না। স্বাস্থ্যখাতে প্রশাসনের অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধ না হলে দেশের চিকিৎসক সমাজ কঠোর আন্দোলনে যেতে বাধ্য হবে।

 চিকিৎসকরা দাবি করেন, ১৯৬২ সালের পাকিস্তানী আইনে প্রশাসনে অতিরিক্ত সচিবের পদ আছে ১১৩টি, বর্তমানে অতিরিক্ত সচিব হিসাবে পদোন্নতি পেয়েছেন ৬১০ জন। এদের পদায়ন করতে স্বাস্থ্য খাতে হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে। এটি আমলাতন্ত্রের অনন্য নজির।

একইসঙ্গে, স্বাস্থ্য সচিব আব্দুল মান্নানের ভ্যাকসিন সংক্রান্ত বক্তব্যের সমালোচনা করেন চিকিৎসকরা। তারা উল্লেখ করেন, অক্সফোর্ড ভ্যাকসিন তৈরি করবে ১০ ডোজ। সেখান থেকে তিন কোটি ডোজ বাংলাদেশে আনার তথ্যটি ভুল।

এ আয়োজনে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ ( স্বাচিপ) সভাপতি ও কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় পরমর্শক কমিটির সদস্য অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান বলেন, কোভিড মোকাবিলায় সারা বিশ্বের সরকার চিকিৎসকদের সঙ্গে পরামর্শ করেছেন। কিন্তু বাংলাদেশ প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তারা ‘বিজ্ঞানকেও নিয়ন্ত্রণ করার’ চেষ্টা করছেন।

কেবল তিনিই নন, বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন-বিএমএ সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী দুলাল, স্বাচিপ মহাসচিব অধ্যাপক ডা. এম এ আজিজ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। এই চার চিকিৎসক নেতাই স্বাস্থ্য খাতে প্রশাসনের অযাচিত হস্তক্ষেপ এর বিরোধীতা করেন, ক্ষোভ প্রকাশ করে তীব্র প্রতিবাদ জানান। তারা বলেন, স্বাস্থ্যের বিজ্ঞানীদের প্রশাসন নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, এটা খুবই দুঃখজনক। স্বাস্থ্য খাত প্রশাসন দখলে নিতে চায়, তারা দখলের পায়তারা করছে।

অধ্যাপক ডা. ইকবাল আর্সলান বলেন,  বিজ্ঞানীদের পরার্মশকে পাশ কাটিয়ে প্রশাসন ক্যাডার নিজেদের মনগড়া সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের চেষ্টা করছেন। এ বিষয়টি নিয়ে স্বাস্থ্য বিষয়ক সংসদীয় কমিটিকে ভূমিকা পালন করা উচিত।

তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক নেতারা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে নীতি নির্ধারণ করবেন আর প্রশাসনের কর্মকর্তারা তা বাস্তবায়ন করবেন।’

অধ্যাপক ইকবাল আর্সলান বলেন, আমলারা বৃটিশ আমলের শাসন ব্যবস্থায় রয়ে গেছি। সেই সময়ে যারা ডেপুটি কালেক্টর ছিলেন, পরবর্তী একটা সময়ে তারা হলেন ডিস্ট্রিক্ট কমিশনার, এরপরে হলেন জেলা প্রশাসক। আর জেলা প্রশাসক হয়ে তারা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছেন। নিয়ন্ত্রণ করার মানসিকতা থেকেই এসব করা হচ্ছে। কোভিড মহামারির সময় আরেকটা সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছেন।

 তিনি আরও বলেন, অতিমারির সুযোগে দেশে অসাধু পায়তারা চলছে। বাংলাদেশ মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশন অতীতে যেভাবে সব আন্দোলন পরিচালনা করেছে, ভবিষ্যতেও একইভাবে আন্দোলন-সংগ্রাম করবে।

সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব সরকারের আদেশ-উপদেশ পরামর্শ অক্ষরে অক্ষরে পালন করা, মাতাব্বরি নয় বলে মন্তব্য করেছেন বিএমএ-র মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী।

স্বাস্থ্যমন্ত্রীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, চিকিৎসকদের ভাষা বোঝার চেষ্টা করুন।

বিএমএ-র মহাসচিব কেন্দ্রীয় ঔষধাগারের ( সিএমএসডি) পরিচালকের উদ্দেশ্যে বলেন, তার পদ  স্বাস্থ্য অধিদফতরের অধীনস্থ একটি পদ। এখানে একজন অতিরিক্ত সচিবকে পদায়ন করা হয়েছে,  কিন্তু মহাপরিচালকের অধীনে চাকরি করেও তিনি সভায় যোগ দেন না, তার নির্দেশনা মানেন না বলে জানান তিনি।

ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী বলেন, ‘সিএমএসডির পরিচালক অ্যাডিশনাল সেক্রেটারি না সেক্রেটারি আমাদের বিবেচ্য বিষয় নয়। তিনি একজন একজন পরিচালক হিসেবে যোগ দিয়েছেন, সুতরাং মহাপরিচালকের সভায় তাকে আসতে হবে।  নতুবা চাকরি ছেড়ে চলে যান, কে বলেছে আপনাকে এখানে আসার জন্য।  ধৃষ্টতা দেখাবেন না। এই পদে (সিএমএসডির পরিচালক) প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়ার সময় চিকিৎসকরা প্রতিবাদ করেছিলেন, কিন্তু সে সময় তাদের কথা শোনা হয়নি।’

তিনি আরও জানান,  এজন্য বিএমএ এবং স্বাচিপের উদ্যোগে সোমবার বিএমএ ভবনে দেশের জ্যেষ্ঠ চিকিৎসকদের সভা ডাকা হয়েছে। আগামী সপ্তাহে কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন, ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনসহ অন্যান্য পেশাজীবী সংগঠনের সঙ্গে মতবিনিময়, প্রতি সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন জেলার পেশাজীবী সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক হবে। তারপর পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।

স্বাচিপের সাধারণ সম্পাদক ডা. এম এ আজিজ অনুষ্ঠানে বলেন, নতুন ৬১০জনকে পদায়নের জন্যই বিভিন্ন জায়গায় নতুন নতুন পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ে বসে তারা (প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা) ষড়যন্ত্র করছেন।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, ‘স্বাস্থ্য অধিদফতরের বিভিন্ন বিভাগে চিকিৎসক কর্মকর্তারা কাজ করছেন। কিন্তু অ্যাডমিনের লোকজন ঢোকানো হচ্ছে। নার্সিং,পরিববার পরিকল্পনা তাদের লোকজন বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। শুনতে পাচ্ছি ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশনেও অ্যাডমিনের লোক দেওয়ার পাঁয়তারা চলছে যেখানে টেকনিক্যাল জনবল লাগে। তারা আমাদের কাজের পরিবেশ তৈরি করে দিবেন তা না করে খবরদারি করছেন।’

বিএমএর সভাপতি ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেককে উদ্দেশ্য করে বলেন, বাংলাদেশের চিকিৎসকদের পিঠে আরেকবার ছুরি বসানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।

অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, চিকিৎসকদের স্বার্থহানি হয় এমন কিছু তিনি করবেন না। পদ-পদবী নিয়ে যে আশঙ্কা করেছেন তা ভেবে দেখা হবে। এ বিষয়ে আপনাদের আশ্বস্ত করতে চাই সেটা হলো, আমার হাত দিয়ে এমন কোনও কাজ হবে না যেটা স্বাস্থ্য সেবার বা ডাক্তারদের স্বার্থ হানি হবে।আপনারা আমার পূর্ণ সহযোগিতা পাবেন। আপনারা যেভাবে কাজ করে যাচ্ছেন, সহযোগিতা করছেন এজন্য আমি আপনাদের ধন্যবাদ জানাই।

By Abraham

Translate »