Advertisements

ফিলিস্তিনের অন্যতম জ্যেষ্ঠ রাজনীতিবিদ সায়েব এরাকাত করোনা আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। মঙ্গলবার ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এ তথ্য জানিয়েছে।

জেরুজালেমের হাদাশাহ মেডিকেল সেন্টারে ৬৫ বছর বয়সে তিনি মারা যান।

এরাকাত প্যালেস্টাইন লিবারেশন অর্গানাইজেশনের (পিএলও) জেনারেল সেক্রেটারি এবং প্যালেস্টিনিয়ান অথোরিটির প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের উপদেষ্টা ছিলেন।

২৫ বছর ইসলাইলের সঙ্গে শান্তি আলোচনায় নেতৃত্ব দিয়েছেন এরাকাত। গুরুত্বপূর্ণ এ মধ্যস্থতাকারীর মৃত্যুতে তিন দিনের শোক ঘোষণা করেছে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ।

১৯৯৩ সালে ইসরাইল-ফিলিস্তিনের মধ্যে সই হওয়া ঐতিহাসিক ওসলো চুক্তি সম্পাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি। ওই চুক্তির আওতায় ১৯৬৭ সালের পর পশ্চিম তীর এবং গাজায় সীমিত আকারে সরকার গঠনের ‍সুযোগ পায় ফিলিস্তিনিরা।

এরাকাতকে প্রিয় ভাই, বন্ধু এবং বীরযোদ্ধা আখ্যা দিয়ে প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস বলেন, তার মৃত্যু ফিলিস্তিনের এবং আমাদের জনগণের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি।

৮ অক্টোবর এরকাত ঘোষণা দেন তিনি করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। অবস্থার অবনতি হওয়ায় ১১ দিন পর বাসা থেক পশ্চিমতীরের জেরিকোতে ইসরাইলের স্থাপন করা হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি।

চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, এরাকাতকে চিকিৎসা দেয়া চ্যালেঞ্জিং ছিল। কারণ তিন বছর আগে তার ফুসফুস প্রতিস্থাপন করা হয়। তার রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ছিল দুর্বল। করোনা ভাইরাস ছাড়াও শরীরে ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ছিল।

মৃত্যুর আগে তাকে ভ্যান্টিলেটরে রাখা হয়। তখন তিনি কোমায় ছিলেন।

বহুল আলোচিত দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের প্রবক্তা ছিলেন এরাকাত। সংকট সমাধানের মাধ্যমে স্বাধীন ফিলিস্তিন এবং ইসরাইল প্রতিষ্ঠার পক্ষে ছিলেন তিনি। দ্বিরাষ্ট্র সমাধান ছাড়া সম্প্রতি ইসরাইলের সঙ্গে আরব রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্ক স্থাপনের নিন্দা জানান তিনি।

আগস্টে ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয় সংযুক্ত আরব আমিরাত। আমিরাতের সিদ্ধান্তকে দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের হত্যাকারী বলে আখ্যা দেন তিনি। বলেন, প্র্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সরকার ইসরাইলকে যেভাবে সমর্থন দিচ্ছে তাতে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। ওয়াশিংটনকে সংকটের অংশ বলেও অভিহিত করেন এরাকাত।

পশ্চিম তীর, গাজা এবং পূর্ব জেরুজালেমে ইসরাইলের দখলদারিত্ব বন্ধের জন্য দেশটির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান তিনি। দখলকৃত ভূমিতে ইসরাইল পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোকে বর্জনের আহ্বানও জানান এরাকাত।

এরাকাত কিভাবে পিএলও’র গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে উঠলেন?

১৯৫৫ সালে জেরুজালেমে সায়েব এরাকাতের জন্ম। বেড়ে উঠেছেন জেরিকোতে।

১৯৭২ সালে পড়াশোনার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যান তিনি। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে সান ফ্রান্সিসকো স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।

যুক্তরাজ্যের ব্র্যাডফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে ‘বিরোধ নিষ্পত্তি এবং শান্তি অধ্যায়নে’ পিএইচডি’র জন্য স্কলারশিপ পাওয়ার আগে ফিলিস্তিনে ফিরে আসেন তিনি। অধ্যাপনায় যোগ দেন পশ্চিম তীরের নাবলুসের আল নাজাহ ইউনিভার্সিটিতে।

১৯৮৩ সালে স্নাতক সম্পন্ন করেন এরাকাত। তারপর থেকে ফিলিস্তিনিদের আল কুদস পত্রিকায় নিবন্ধ লেখা শুরু করেন তিনি। ফিলিস্তিনি এবং ইসরাইল শিক্ষাবিদদের আলোচনার আহ্বান জানান। আল নাজাহ ইউনিভার্সিটিতে তার ক্লাসে উপস্থিত হওয়ার জন্য ইসরাইলি শিক্ষার্থীদের আমন্ত্রণ জানান ফিলিস্তিনের বিখ্যাত এ রাজনীতিবিদ।

তার এ দুটি পদক্ষেপই সে সময় ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করে।

 

ছবির ক্যাপশন: ক্যাম্প ডেভিন সম্মেলনে প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন (বায়ে), সায়েব এরাকাত (মাঝে), প্রেসিডেন্ট ইয়াসির আরাফাত

১৯৯১ সালে শান্তি প্রতিষ্ঠায় মধ্যস্থতাকারী হিসেবে যোগ দেন এরাকাত। সে সময় ফিলিস্তিন-ইসরাইলের মধ্যেকার বহুল প্রত্যাশিত মাদ্রিদ সম্মেলনে ফিলিস্তিনি প্রতিনিধি দলের সহ- নেতা হওয়ার জন্য এরাকাতকে প্রস্তাব দেন প্রয়াত ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাত।

১৯৯৩ এবং ১৯৯৫ সালে ওসলো শান্তি চুক্তি সম্পাদনে নৈপূণ্যপূর্ণ সহাতায় করায় ফিলিস্তিনের প্রধান মধ্যস্থতাকারী হয়ে উঠেন এরাকাত।

২০০০ সালে আরাফাতের সঙ্গে ক্যাম্প ডেভিড সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন তিনি। ২০০১ সালের তাবা সমঝোতায় ফিলিস্তিনিদের পক্ষে প্রস্তাবনা উত্থাপন করেন। ২০০৭ সালে আনাপোলিস কনফারেন্সে আরাফাতের উত্তরসূরি মাহমুদ আব্বাসের সঙ্গে কাজ করেন তিনি।

পরবর্তী সমঝোতার জন্য সীমান্ত, জেরুজালেম এবং শরাণার্থী সংকটের মতো বিষয়গুলো ওসলো চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। পরবর্তী সম্মেলনে চূড়ান্ত মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় আর কোনো চুক্তি সই হয়নি।

মধ্যস্থতাকারীর পাশাপাশি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের স্থানীয় সরকার মন্ত্রী এবং জেরিকো থেকে ফিলিস্তিনের পার্লামেন্টের আইনপ্রণেতা ছিলেন এরাকাত।

২০০৯ সালে পিএলও’র নির্বাহী কমিটি এবং মাহমুদ আব্বাসের ফাতাহ মুভমেন্টের কেন্দ্রীয় কমিটিতে জায়গা করে নেন তিনি। ৬ বছর পর পিএলও’র জেনারেল সেক্রেটারি নির্বাচিত হন।

গেলো কয়েক বছর ধরে শারীরিক বিভিন্ন রোগে ভুগছিলেন এরাকাত। ২০১২ সালে তার হার্ট অ্যাটাক হয়। ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়ার একটি হাসপাতালে তার ফুসফুস প্রতিস্থাপন করা হয়।

বিবাহিত জীবনে এরাকাতের চার সন্তান রয়েছে। জমজ দুটি মেয়ে বাকি দু’জন ছেলে।

Translate »