Advertisements

কারও কাছে প্রিয় ‘পুলুদা’, কারও কাছে সৌমিত্রবাবু, কারও কাছে আবার শুধুই সৌমিত্র ছিলেন। কেউ ছিলেন অপুর অপর্ণা, কেউ অমূল্যর মৃণ্ময়ী, কেউ আবার অমলের চারুলতা। পর্দায় এভাবেই বারবার সৌমিত্রের সফল সঙ্গিনী হয়ে উঠেছিলেন শর্মিলা ঠাকুর, অপর্ণা সেন, মাধবী মুখোপাধ্যায়, সুচিত্রা সেন, তনুজা থেকে স্বাতীলেখা সেনগুপ্তরা।

প্রত্যেক নারীর সঙ্গে পর্দায় ভিন্ন রসায়ন ফুটিয়ে তুলেছিলেন অভিনেতা সৌমিত্র।

সৌমিত্র’র ক্যারিয়ার শুরু শর্মিলা ঠাকুরের সঙ্গে। শর্মিলারও তাই। ‘অপুর সংসার’ দিয়ে এ জুটির সফর। তাদের মিষ্টি দাম্পত্যের রসায়ন কালজয়ী হয়ে আছে। পরবর্তীকালে তারা আরও হাজির হয়েছেন ‘দেবী’, ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’, ‘বর্ণালী’ সিনেমায়।

এদিকে অমূল্য আর মৃণ্ময়ীর সম্পর্কে ছিল ভিন্নতার ছোঁয়া। শহুরে যুবক অমূল্য প্রথম দেখাতেই গ্রামের ডানপিটে মেয়েটার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন। মাত্র ১৬ বছরের অপর্ণার সঙ্গে ২৬ বছরের সৌমিত্র অভিনয় করেছিলেন সত্যজিৎ রায়ের ‘তিনকন্যা’র ‘সমাপ্তি’ ছবিতে। প্রথম ছবিতেই বন্ধুত্ব হতে বেশিক্ষণ সময় লাগেনি। শুটিংয়ের ফাঁকে নাকি সৌমিত্রর সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার সুযোগ খুঁজতেন অপর্ণা সেন।

অনেক কিছু শিখতে পারতেন তার থেকে। দু’জনের এই পারস্পরিক সম্মানের সম্পর্ক দর্শদকের উপহার দিয়েছে ‘আকাশ কুসুম’, ‘বাক্স বদল’, ‘নিশিমৃগয়া’, ‘বসন্ত বিলাপ’, ‘পারমিতার একদিন’, ‘বসু পরিবার’।

‘আমি চিনি গো চিনি তোমারে ওগো বিদেশিনী’- ‘চারুলতা’ সিনেমার নায়িকা চারুলতার হৃদয়ে জড়িয়ে ছিল অমলের গাওয়া গান। রচিত হয়েছিল ‘নষ্টনীড়’-এর ভিত। বউদি হয়েও দেবর অমলের প্রতি চারুলতার অনুরাগকে দর্শক গ্রহণ করেছিল সৌমিত্র আর মাধবীর অভিনয়ের জোরে। এরপর তারা ‘কাপুরুষ’, ‘জোড়াদীঘির চৌধুরী পরিবার’ সিনেমাতেও মিষ্টি রসায়নের ছাপ রেখেছিলেন।

সৌমিত্রের সঙ্গে সিনেমায় জুটি হয়ে দারুণ সাফল্য পেয়েছেন সুচিত্রা সেনও। এই নামের সঙ্গে প্রথম নাম হিসেবে সবসময় উত্তমকুমারের নামই উঠে আসে। তবে একটি সিনেমা দিয়ে সৌমিত্র প্রমাণ দিয়েছেন সুচিত্রার সঙ্গে তিনিও অনেক বেশি মানানসই। সেই সিনেমার নাম ‘সাত পাঁকে বাঁধা’। যেখানে অভিনয় করে সুচিত্রাও মুগ্ধ হয়েছিলেন সৌমিত্রের অভিনয়ে। যেখানে উত্তমের সঙ্গে রোমান্টিক প্রেম কিংবা প্রেমের টানে বাড়ি পালানোর সাহসী প্রেমিকা সুচিত্রা সেখানে ভেঙে সংসার নতুন করে জোড়া দিয়ে সুখী দম্পতি হওয়ার রসায়নটা সুচিত্রা সৌমিত্রের কাছেই পেয়েছেন। সেই ছবি বাংলা সিনেমার ইতিহাসে কালজয়ী হয়েছে। এই জুটিকে দেখা গেছে আরও দুটি সিনেমায়। তার মধ্যে ‘দত্তা’-য় তাদের রসায়ন ছিলো বেশ জমজমাট।

সৌমিত্রের সিনেমার দিকে তাকালে খুব সহজেই আরও একটি নাম মনে আসে তার সফল সঙ্গীনী হিসেবে। তিনি হলেন বলিউডের অভিনেত্রী কাজলের মা তনুজা। এই কিংবদন্তি অভিনেত্রীর সঙ্গে সৌমিত্রের রসায়ন দর্শককে মুগ্ধ করে রেখেছে আজও। ‘হয়তো তোমারই জন্য, হয়েছি প্রেমে যে বন্য’- এমন সর্বানাশা প্রেমের আহ্বান তনুজাকেই জানিয়েছেন সৌমিত্র। এ জুটির ‘তিন ভুবনের পারে’, ‘প্রথম কদম ফুল’ ছবিগুলো দর্শকের মনে খুব সহজেই দাগ কাটে।

স্বদেশের আন্দোলন চুলোয় দিয়ে বিমলার সঙ্গে গল্প করে জীবন কাটিয়ে দিতে চেয়েছিল সন্দীপ। নিছকই কথার কথা! কিন্তু বাসনা-আকাঙ্খা মেশানো আবেগের বহিঃপ্রকাশ। সত্যজিৎ রায়ের ‘ঘরে বাইরে’ আজও ক্লাসিক। ক্লাসিক স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের রসায়ন। সেই রসায়ন আবারও দারুণভাবে দর্শক মাতিয়েছে ‘বেলাশেষে’ সিনেমায়। এখানে বৃদ্ধ বয়সের সৌমিত্র আর স্বাতীলেখা ছিলেন অনবদ্য।

সৌমিত্র অভিনয় দিয়ে মন জয় করেছিলেন উত্তমকুমার বলতে অজ্ঞান অভিনেত্রী সুপ্রিয়া দেবীকেও। সেই অভিনেত্রীর সঙ্গে বেশ কিছু সিনেমায় রসায়ন জমিয়েছিলেন সৌমিত্র।

বাংলাদেশের অভিনেত্রী ববিতার সঙ্গেও সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে দেখা গেছে ‘অশনি সংকেত’ সিনেমায়। এখানে প্রেমের চেয়ে দাম্পত্যের সংগ্রাম, মানুষের বেঁচে-টিকে থাকার চিত্রই মূখ্য। তবে নিজ নিজ চরিত্রে সৌমিত্র-ববিতা ছিলেন অনবদ্য।

Translate »