জর্ডানের রাজপরিবারে দ্বন্দ্ব, ভাই ভাইয়ের মুখোমুখি

Advertisements

 

আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের শাসকদের মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘ সময় রাজত্ব করেছেন জর্ডানের প্রয়াত বাদশা হুসেইন। তার ৪৭ বছরের রাজত্বে একাধিকবার যুদ্ধে জড়ালেও স্থিতিশীল ছিল জর্ডানের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ। দেশটির বর্তমান বাদশা দ্বিতীয় আবদুল্লাহ তার জ্যেষ্ঠ পুত্র। ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত টোনি আভ্রিল গার্ডিনার ওরফে রানী মুনা আল হুসেইনের সন্তান তিনি। অন্যদিকে বাদশা হুসেইনের স্ত্রীদের মধ্যে সবচেয়ে প্রিয় ছিলেন মার্কিন বংশোদ্ভূত লিসা নাজিব হালাবি ওরফে নুর আল হুসেইন। সন্তানদের মধ্যে বাদশা হুসেইনের প্রিয়পাত্র ছিলেন রানী নুরের ছেলে প্রিন্স হামজা বিন হুসেইন।

মা আলাদা হলেও আবদুল্লাহ ও হামজা—দুজনের দেহেই প্রবাহিত হচ্ছে বাদশা হুসেইনের রক্ত। বাদশা হুসেইন চেয়েছিলেন জর্ডানে রাজত্ব করুক দুজনেই। এজন্য জ্যেষ্ঠ পুত্র হিসেবে আবদুল্লাহকে নিজের উত্তরাধিকার ঘোষণা করেছিলেন বাদশা হুসেইন। অন্যদিকে হামজার নাম ঘোষণা করেছিলেন আবদুল্লাহর উত্তরাধিকারী হিসেবে। দুই ভাইয়ের মধ্যে বেশ সদ্ভাবও ছিল। ফলে সিংহাসন নিয়ে রাজপরিবারে ভবিষ্যতে কোনো দ্বন্দ্ব হবে না বলে প্রত্যাশা ছিল বাদশা হুসেইনের। তবে তার সে প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। সিংহাসনে বসার কয়েক বছরের মধ্যেই ভাইকে উত্তরাধিকারীর পদ থেকে বরখাস্ত করেন আবদুল্লাহ। সে সময় কোনো সমস্যা না হলেও দুই ভাই এখন জড়িয়ে পড়েছেন বড় ধরনের বিবাদে। বড় ভাই আবদুল্লাহর অভিযোগ, বিদেশী শক্তির সহায়তায় জর্ডানের পরিবেশকে অস্থিতিশীল করতে চাইছেন হামজা। অন্যদিকে হামজার অভিযোগ, বাদশা আবদুল্লাহর অধীনে দুর্নীতিগ্রস্ত ও প্রশাসনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে জর্ডান।

সিংহাসনের সাবেক উত্তরাধিকারী হামজা বিন হুসেইন এখন গৃহবন্দি। বাদশা দ্বিতীয় আবদুল্লাহর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। এ ষড়যন্ত্রে সহযোগিতার অভিযোগে আটক হয়েছে আরো প্রায় ২০ জন। তাদের মধ্যে রাজপরিবারের সদস্যও রয়েছে একজন। অন্যদিকে গৃহবন্দিত্বের মধ্যেই এক ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেছেন হামজা বিন হুসেইন। বার্তায় বাদশা আবদুল্লাহর অধীনে জর্ডানের শাসন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার অভিযোগ তুলেছেন তিনি। একই সঙ্গে অভিযোগ তুলেছেন ক্রমবর্ধমান দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অদক্ষতারও।

বর্তমান পরিস্থিতিতে জর্ডানে রাজনৈতিকভাবে অস্থিতিশীলতার আশঙ্কা করছেন পর্যবেক্ষকরা। তাদের ভাষ্যমতে, স্থানীয় বেদুইন গোত্রগুলোর মধ্যে হামজা বিন হুসেইনের জনপ্রিয়তা অনেক বেশি। অন্যদিকে হামজাও ইঙ্গিত দিয়েছেন, গৃহবন্দিত্বে থাকলেও ছেড়ে কথা বলবেন না তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির জন্য জর্ডানের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অত্যন্ত জরুরি। প্রচুর ফিলিস্তিনি ও সিরীয় শরণার্থী দেশটিতে আশ্রয় নিয়েছে। এছাড়া দেশটিতে গোঁড়া সংগঠন মুসলিম ব্রাদারহুডেরও অনেক শক্তিশালী ঘাঁটি রয়েছে। উগ্র জঙ্গি সংগঠনের তাণ্ডবে বিপর্যস্ত ইরাক ও সিরিয়ার সঙ্গে সীমান্ত রয়েছে দেশটির। জর্ডানের নিকটতম প্রতিবেশীদের মধ্যে ইরানের প্রভাববলয়ভুক্ত দেশও রয়েছে।

তবে মূলত ফিলিস্তিন-ইসরায়েলের সংঘাত প্রশমনের স্বার্থেই জর্ডানের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অপরিহার্য বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। তারা বলছেন, এ সংঘাতে জর্ডান বরাবরই অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এ কারণেই মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির জন্য জর্ডানের রাজনৈতিক শান্তি সবচেয়ে বেশি জরুরি। বিশেষ করে বর্তমান পরিস্থিতিতে। কারণ ইসরায়েল বর্তমানে জর্ডান সীমান্তবর্তী পশ্চিম তীর এলাকাকে অঙ্গীভূত করে নিতে চাইছে। জর্ডান এর তীব্র বিরোধিতা করছে। এ নিয়ে তেল আবিবের সঙ্গে বর্তমানে জর্ডানের সম্পর্ক বেশ খারাপ যাচ্ছে। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে জর্ডানের রাজপরিবারের সদস্যদের বেশ চাপানউতোরও চলেছে কয়েকদিন ধরে।

জর্ডানের রাজপরিবারে ভাইয়ে-ভাইয়ে বিরোধ নতুন কিছু নয়। প্রয়াত সাবেক বাদশা হুসেইনের শাসনামলেও এর খানিকটা আভাস পাওয়া গিয়েছিল। ১৯৯৯ সালে মৃত্যুর আগে নিজ উত্তরাধিকারী তথা যুবরাজের পদ থেকে ভাই হাসানকে বরখাস্ত করেন তিনি। এর আগে ৩৪ বছর ধরে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী ছিলেন প্রিন্স হাসান। উত্তরাধিকারীর পদ থেকে তার আকস্মিক বরখাস্তের ঘোষণায় রাজপরিবারে দ্বন্দ্বের আভাস পাওয়া গেলেও তা জনসমক্ষে আসেনি।

প্রয়াত বাদশা হুসেইন সে সময় নিজের উত্তরাধিকারী হিসেবে ছেলে আবদুল্লাহর নাম ঘোষণা করেন। আবদুল্লাহর উত্তরাধিকারী হিসেবে ঘোষণা করেন আরেক ছেলে হামজার নাম।

কয়েক বছরের মাথায় ২০০৪ সালে সত্ভাই হামজাকে উত্তরাধিকারীর পদ থেকে বরখাস্ত করেন দ্বিতীয় আবদুল্লাহ। এ সময় উত্তরাধিকারী হিসেবে নিজের ছেলে হুসেইনের নাম ঘোষণা করেন তিনি। এর পর থেকে হামজা তেমন একটা আলোচনায় আসেননি। তবে বড় ভাই আবদুল্লাহর সঙ্গে তার সম্পর্ক খারাপ হওয়ারও কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি।

তবে বরাবরই জর্ডানের বেদুইন গোত্রগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রেখেছেন হামজা। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোয় এ সখ্যতার মাত্রা বেড়েছে। বিষয়টিকে বাদশা দ্বিতীয় আবদুল্লাহ নিজের জন্য হুমকি হিসেবে দেখছেন বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে উঠে এসেছে। এ পরিপ্রেক্ষিতেই হামজা ও তার সহযোগীদের আটক করা হয়েছে বলে দাবি সংবাদমাধ্যমগুলোর।

জর্ডান কর্তৃপক্ষ হামজাকে গৃহবন্দি করার পাশাপাশি তার সহযোগীদের আটকের ঘোষণা দেয় রোববার। আটককৃতদের মধ্যে হামজার দপ্তর প্রধানসহ প্রভাবশালী মাজালি গোত্রের কয়েকজন সদস্য রয়েছেন। এছাড়া তাদের উল্লেখযোগ্য অন্যরা হলেন রাজপরিবারের সদস্য হাসান বিন জেইদ ও সাবেক ক্যাবিনেট মন্ত্রী বাসসেম আওয়াদাল্লাহ।

বাসসেম আওয়াদাল্লাহ এর আগে জর্ডান সরকারের বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। দায়িত্ব পালন করেছেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক সচিব, অর্থমন্ত্রী ও রাজকীয় আদালতের প্রধান হিসেবে। ২০১৮ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন সৌদি আরবে বাদশা আবদুল্লাহর বিশেষ দূত। সে সময় সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে তার বেশ সখ্যতা তৈরি হয়।

জর্ডান কর্তৃপক্ষের দাবি, প্রিন্স হামজা বিদেশীদের সহায়তায় দেশটির পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করে তুলতে চাইছে। অন্যদিকে হামজা বলছেন, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অদক্ষতার বিরুদ্ধে কথা বলার কারণেই তাকে শাস্তি পেতে হচ্ছে। শনিবার দিবাগত রাতে এক ভিডিও বার্তায় হামজা এ দাবি করেন। তার এ দাবির পরিপ্রেক্ষিতে দেশটিতে প্রশাসনিক দুর্বলতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা আম্মানের।

পর্যবেক্ষকরা বলছেন, হামজা ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে শক্ত পদক্ষেপ গ্রহণের মধ্য দিয়ে বাদশা আবদুল্লাহও একটি কঠোর বার্তা দিয়েছেন। সেটি হলো কোনো ধরনের বিরুদ্ধতাকে প্রশ্রয় দেবেন না তিনি।

জর্ডানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আয়মান সাফাদি এ নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, জর্ডানের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা অন্য যেকোনো কিছুর চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দুই জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তার সহযোগিতায় এবং বিদেশী শক্তির সঙ্গে যোগসাজশে হামজা জর্ডানের পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করতে চেয়েছিল। এ ষড়যন্ত্রকে ব্যর্থ করে দেয়া হয়েছে।

অন্যদিকে হামজা তার ভিডিও বার্তায় বলেন, আমি কোনো ষড়যন্ত্র, দুষ্টচক্র বা বিদেশী সমর্থিত দলের অংশ নই। যখনই কেউ প্রতিবাদ করে, তখনই তার বিরুদ্ধে এ ধরনের অভিযোগ তোলা হয়। দেশের প্রতি আমার ভালোবাসাকে এখন দেখা হচ্ছে হুমকি ও সবার থেকে আলাদা করে রাখার মতো অপরাধ হিসেবে।

ভিন্ন ভিন্ন দুই ধরনের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র ও আরব দেশগুলো জর্ডানের বাদশা আবদুল্লাহর পক্ষ নিয়েছে। এর কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের মতো গোলযোগপূর্ণ অঞ্চলে জর্ডানের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অপরিহার্যতাকে বিবেচনায় নিয়ে তারা এ অবস্থান নিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র এরই মধ্যে বাদশা আবদুল্লাহর প্রতি ‘পূর্ণ সমর্থন’ ব্যক্ত করেছে। সৌদি আরবসহ অন্য উপসাগরীয় দেশগুলোও বাদশার প্রতি তাদের সমর্থন জানিয়েছে।

হামজার বিরুদ্ধে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আয়মান সাফাদি অভিযোগ করে বলেন, বিদেশী একটি গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে শনিবার বিকালে হামজার স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। সে সময় সংস্থাটির এক প্রতিনিধি হামজার স্ত্রীকে নিরাপদে জর্ডানের বাইরে নিয়ে যাওয়ারও প্রস্তাব দেন।

অন্যদিকে জর্ডানি সংবাদমাধ্যম আমুন দাবি করছে, ওই গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধি একজন ইসরায়েলি। তার নাম রয় শাপোশনিক। ওই ব্যক্তি এ বিষয়ে এরই মধ্যে বার্তা সংস্থা এপির কাছে একটি বিবৃতি পাঠিয়েছেন। বিবৃতিতে রয় শাপোশনিক দাবি করেন, তিনি একজন ‘সাবেক’ ইসরায়েলি ব্যবসায়ী। বর্তমানে তিনি ইউরোপে বসবাস করছেন। প্রিন্স হামজা তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তবে তিনি কখনই কোনো গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে জড়িত ছিলেন না।

তবে হামজার স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করার কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, বন্ধুর দুরবস্থার কথা শুনেই তার স্ত্রী ও সন্তানের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন তিনি। মূলত হামজা ও তার পরিবারের মধ্যকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের ভিত্তিতেই তিনি এ প্রস্তাব দিয়েছিলেন।