পাকিস্তানে যেভাবে সংবাদ মাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে

Advertisements

টেলিভিশনে পাকিস্তানের শীর্ষস্থানীয় বিরোধী রাজনীতিবিদ আসিফ আলী জারদারির সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলেন সুপরিচিত একজন সাংবাদিক হামিদ মীর। সাক্ষাৎকারটির সম্প্রচার শুরু হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই এর সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়।

এর প্রায় এক সপ্তাহ পর ঘটে এরকমই আরেকটি ঘটনা। আরেক বিরোধী রাজনীতিক মরিয়ম নওয়াজের সাক্ষাৎকারও মাঝপথে হঠাৎ করে বন্ধ হয়ে বিজ্ঞাপনের প্রচার শুরু হয়। সেই অসমাপ্ত সাক্ষাৎকারটি আর দেখানো হয়নি।

ইসলামাবাদ থেকে বিবিসির সংবাদদাতা সেকান্দার কিরমানি বলছেন, পাকিস্তানের সংবাদ মাধ্যম বর্তমানে কতোটা স্বাধীনতা ভোগ করছে এই দুটো ঘটনাই থেকেই সেটা স্পষ্ট।

গত সপ্তাহে দেশটির বড় বড় শহরগুলোতে প্রেস ক্লাবের সামনে জড়ো হয়ে সাংবাদিকরা সংবাদ মাধ্যমের ওপর এধরনের সেন্সরশিপের প্রতিবাদ করেছেন। সরকার অবশ্য সাংবাদিকদের এসব অভিযোগ অস্বীকার করে তাদেরকে ‘পক্ষপাতদুষ্ট’ বলে উল্লেখ করছে।

ওয়াশিংটন সফরের সময় প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানও মিডিয়ার ওপর সেন্সরশিপের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। সাংবাদিকদের তিনি বলেছেন: “পাকিস্তানি প্রেসের উপর নিয়ন্ত্রণ আছে এটা বলা একটা কৌতুক।”

পাকিস্তানি সেনাবাহিনীও তাদের বিরুদ্ধে আনা মিডিয়া সেন্সরশিপের অভিযোগ অস্বীকার করেছে।

সেকান্দার কিরমানি বলছেন, মিডিয়াতে ইমরান খানের সরকার ও সামরিক বাহিনীর সমালোচনা বন্ধ করার যে চেষ্টা চালানো হয় তার তথ্যপ্রমাণ খুবই পরিষ্কার।

এমনকি তার রাজনৈতিক বিরোধীরা যখন দাবি করেন যে তাদেরকে ‘অন্যায়ভাবে দুর্নীতির মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে’ – সেটাও চাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়ে থাকে।

রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডার্স সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার যে সূচক প্রকাশ করেছে সেখানেও পাকিস্তানের অবস্থান ১৮০টি দেশের মধ্যে ১৪২ নম্বরে।

সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর এধরনের হস্তক্ষেপের কারণে পাকিস্তানের সাথে পশ্চিমা দেশগুলোর সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, আফগানিস্তান ও ভারতের সাথে।

এই সেন্সরশিপের প্রধানতম লক্ষ্য সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের মেয়ে মরিয়ম শরীফ। দুর্নীতির দায়ে তার পিতা কারাগারে সাজা ভোগ করছেন।

এমাসের শুরুর দিকে মরিয়ম শরীফ গোপনে ধারণ করা একটি ভিডিও প্রকাশ করেন যা পাকিস্তানের রাজনীতি ও বিচার বিভাগে তোলপাড় ফেলে দেয়।

ভিডিওতে দেখা যায় একজন বিচারক – যিনি নওয়াজ শরীফকে কারাদণ্ড দিয়েছেন – তিনি স্বীকার করছেন যে নওয়াজ শরীফকে দোষী সাব্যস্ত করার ব্যাপারে তাকে ব্ল্যাক-মেইল করা হয়েছিল।

বিচারক বলছেন, তিনি এরকম কিছু বলেন নি, ভিডিওটি এডিট করা হয়েছে। তবে মরিয়ম শরীফের এই সংবাদ সম্মেলনটি যেসব টিভি সরাসরি সম্প্রচার করছিল, সেসব চ্যানেল কয়েকদিনের জন্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল।

 

অন্যান্য সময়েও টিভি চ্যানেলগুলোতে যখন সমাবেশে দেওয়া মরিয়ম শরীফের বক্তব্য সম্প্রচার করা হয়েছে তখনও মাঝে মধ্যে টিভির আওয়াজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

নিরাপত্তার কারণে নাম প্রকাশ করতে চাননি এরকম একজন সাংবাদিক বিবিসিকে বলেছেন, কিভাবে মিডিয়ার ওপর সেন্সরশিপ চালানো হচ্ছে।

তিনি বলছেন, কোন টিভি চ্যানেল যখন কোন কিছু লাইভ সম্প্রচার করে তখন সেটা কমপক্ষে ১০ সেকেন্ড সময় পিছিয়ে থাকে। একজন লোক বসে বসে সবকিছু দেখেন। সেখানে আপত্তিকর কিছু মনে হলে তিনি তখনই একটা ব্যবস্থা নিয়ে থাকেন।

এই সাংবাদিক বলেন, ওই লোকের চোখে যখনই আপত্তিকর কিছু চোখে পড়ে তখনই সেটা থামিয়ে দিয়ে বিজ্ঞাপন চালিয়ে দেওয়া হয়। ফলে ওই অংশটুকু আর প্রচারিত হয় না।

কিন্তু এরকম কিছু করতে ব্যর্থ হলে সরকারি লোকেরা ক্রুদ্ধ হয়ে ফোন করেন, কিম্বা সেনাবাহিনী কিম্বা গোয়েন্দা বিভাগ থেকে লোকজন ওই টিভি অফিসে যান।

সাংবাদিকদের ওপর ব্যক্তিগতভাবে চাপ প্রয়োগের পাশাপাশি টিভি চ্যানেলটির ওপরেও নানা উপায়ে চাপ সৃষ্টি করা হয়।

“বিজ্ঞাপন সংস্থাগুলোকে বলে দেওয়া হয় যাতে তারা ওই টিভি চ্যানেলকে বিজ্ঞাপন না দেয়, ক্যাবল অপারেটরদের বলা হয় যে নম্বরে চ্যানেলটি দেখানো হচ্ছিল সেটা পুরোপুরি বন্ধ করে দিতে।”

“তারা আমাদের গলার চারপাশে হাত দিয়ে রেখেছে। যখনই মনে করে তখনই চেপে ধরে,” বলেন ওই সাংবাদিক।

তবে রাজনৈতিক সমালোচনা যে একেবারেই নিষিদ্ধ সেটা বলাও ভুল। প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছেন, সংবাদ মাধ্যমে তাকে আক্রমণ করা হয়েছে। মরিয়ম নওয়াজ ছাড়া অন্যান্য রাজনীতিকরা নিয়মিতই টেলিভিশনের টকশোতে অংশ নিচ্ছেন।

“কাগজে কলমে হলেও এখানে গণতন্ত্র আছে। মিশরের মতো এখানে করা যাবে না,” বলেন মিডিয়া বিশ্লেষক আদনান রেহমাত।

তিনি মনে করেন, পাকিস্তানে সেন্সরশিপ হচ্ছে বিরোধী দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের সাক্ষাৎকার সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া। কিন্তু এসব দলের দ্বিতীয় কিম্বা তৃতীয় স্তরের নেতারা কিন্তু টেলিভিশন অনুষ্ঠানে অংশ নিচ্ছেন।

গত বছর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আগেও সাংবাদিকরা গোয়েন্দা বিভাগগুলো থেকে একই ধরনের চাপের মধ্যে ছিলেন।

প্রধান সারির একটি টিভি চ্যানেলের সম্প্রচার কয়েক সপ্তাহের জন্যে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। হস্তক্ষেপ করা হয়েছিল অত্যন্ত সুপরিচিত একটি ইংরেজি দৈনিকের সার্কুলেশনেও।

 

নিরাপত্তা বাহিনীগুলো ইমরান খানকে ক্ষমতায় আসতে সাহায্য করছে- এধরনের অভিযোগের বিষয়ে তখন আলোচনা করা নিষিদ্ধ ছিল। অনেকেই বলছেন, তিনি ক্ষমতায় আসার পর এই পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে।

টেলিভিশন উপস্থাপক হামিদ মীর ইমরান খানকে উল্লেখ করছেন ‘বেসামরিক স্বৈরশাসক’ হিসেবে। তিনি বলছেন, সংবাদ মাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ দিনে দিনে বাড়ছে।

তিনি বলছেন, বর্তমানের বিরোধী দলগুলো যখন ক্ষমতায় ছিল তখন তারাও সাংবাদিকদের একইভাবে নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। তিনি বলেন, “এজন্যে তারা এখন তার মূল্য দিচ্ছে।”

সেন্সরশিপের অভিযোগ অস্বীকার করে প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান বলেছেন, কিছু কিছু মিডিয়ার নিজেদের স্বার্থ আছে। তারা তার সরকারকে খাটো করার চেষ্টা করছে। বিরোধী নেতাদের বিরুদ্ধে করা মামলা নিয়ে তারা যেসব কথাবার্তা বলে সেগুলোও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য-প্রণোদিত।

পাকিস্তানে সরকার চাইছে মিডিয়াতে সাজাপ্রাপ্ত রাজনীতিকদের বক্তব্য প্রচার নিষিদ্ধ করতে। আসিফ আলী জারদারি, যার সাক্ষাৎকার সম্প্রচার হঠাৎ করেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, দুর্নীতির অভিযোগে তার বিচার চলছে। অন্যদিকে মরিয়ম নওয়াজও দুর্নীতির একটি মামলায় জামিনে রয়েছেন।

মি. জারদারির সাক্ষাৎকারের প্রচার বন্ধ করে দেওয়ার পর সম্প্রচার বিষয়ে সরকারের একজন উপদেষ্টা ফেরদৌস আশিক বলেছেন, বিচারাধীন থাকার কারণে মি. জারদারির সাক্ষাৎকার প্রচার করা হয়নি।

তবে পাকিস্তানের সম্প্রচার নিয়ন্ত্রক সংস্থা থেকে বলছে, সাক্ষাৎকারটির প্রচার বন্ধ করার জন্যে তারা কোন নির্দেশ দেননি এবং সাজাপ্রাপ্ত লোকদের বক্তব্য প্রচারের ওপর কোন নিষেধাজ্ঞার কথাও তাদেরকে জানানো হয়নি।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অর্থে পরিচালিত ভয়েস অফ আমেরিকার টিভি বুলেটিন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। অনেকেই মনে করেন নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে এর বিরুদ্ধে আন্দোলনের খবর প্রচার করার কারণেই ওই বুলেটিনের প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

নাম প্রকাশ করতে চাননি যে সাংবাদিক তিনি বলেছেন, “প্রত্যেকটি মিনিট মনিটর করা হচ্ছে। ইমরান খানের কথা ভুলে যান, ভুলে যান সেনা প্রধানের কথাও। তারা যদি তথ্য মন্ত্রণালয়ের কোন বিবৃতিও পছন্দ করে সেটার একটা স্ক্রিনশট পাঠিয়ে সেটা তারা ব্রেকিং নিউজ হিসেবে প্রচার করতে বলে।”