সিদ্ধান্তে অটল থাকতে পারছে না সরকার

Advertisements

দেশে এক মাসেই করোনায় ছয় হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। সংক্রমণের হারও কমছে না। চলমান লকডাউনের মধ্যেই সংক্রমণের হার ওঠানামা করছে ২৯ থেকে ৩২ শতাংশে। মৃত্যুর হার উঠে গেছে ১.৬৬ শতাংশে। এমন পরিস্থিতিতে খুলে দেওয়া হলো শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানে কর্মরত যারা গ্রামে ছিলেন, তারা কর্মস্থলে ফিরেছেন। আসার সময় সবক্ষেত্রে ব্যাহত হয়েছে স্বাস্থ্যবিধি।

ফিরতে পথে পড়েছেন নানা দুর্ভোগে। আবার ৫ আগস্ট থেকে লকডাউনও শিথিল করে দেওয়া হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এখনই যদি সবকিছু শিথিল করে দেওয়া হয় তাহলে সামনে ভয়াবহ পরিস্থিতির আশঙ্কা রয়েছে। সংক্রমণ পাঁচ শতাংশের নিচে না আসা পর্যন্ত লকডাউন চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের। ২০২০ সালে পারছে মালদ্বীপের উদাহরণ টেনে বিশেষজ্ঞরা বলেন, মালদ্বীপ পর্যটন শিল্প টিকিয়ে রাখতে সব খুলে দিল। জানিয়ে দিল বিদেশিরা গেলে কোয়ারেন্টিন লাগবে না। এরপর যা ঘটল তা সবার জানা। যে পর্যটন শিল্প টিকিয়ে রাখতে এটি করল, সেই শিল্পেই ধস নেমে গেল।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, কোথাও আগুন লাগলে সেই আগুন পুরোপুরি না নেভালে আবার ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা থাকে, করোনার ক্ষেত্রে তেমন। এখন ২৯ থেকে ৩২ এর মধ্যে ওঠানামা করছে। সবকিছু খুলে দিলে সংক্রমণের এই হার আরও অনেক বেশি উঠে যাবে। পরিস্থিতি নাগালের বাইরে চলে যাবে। যেসব বিষয়ের জন্য আমার শিথিল করছি, সে উদ্দেশ্যও ব্যাহত হবে। কাজেই এখনই সেভাবেই ম্যাজেনমেন্ট করতে হবে। আমরা যতই আত্মতুষ্টি হই না কেন, আমাদের অবস্থা কিন্তু নাজুক। আমাদের ম্যানেজমেন্টে অনেক ঘাটতি আছে। এখন থেকেই যদি এগুলো ঠিক না করা যায়, সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে বাস্তবায়ন না করা যায় তাহলেও বড় রকমের খেশারত দিতে হবে। লকডাউন দিচ্ছি। কিন্তু আমরা পুরোপুরি কার্যকর করতে পারছি না। কার্যকর করতে হবে। আর শুধু লকডাউনের ওপর ভরসা করলে হবে না। পাশাপাশি আরও কিছু কাজ করতে হবে। যেমন টিকা দেওয়া, শনাক্তদের চিকিৎসা ও হাসপাতালের বাইরের রোগীদের ফলোআপে রাখা, দরিদ্রদের খাবারের ব্যবস্থা করা।

কোরবানির সময় সব খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত আত্মঘাতী উল্লেখ করে আইইডিসিআরের উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, আমাদের কোরবানি দিতে হবে। কোরবানি না দিলে যদি করোনা বেড়ে যায়? কোরবানির জন্য সব খুলে দিলাম। এর আগে দিল্লিতে দেখেছি কুম্ভমেলার আয়োজন করা হলো। বলা হলো স্বাস্থ্যবিধি মেনেই কুম্ভমেলা হবে। কুম্ভমেলা না হলে যদি করোনা বেড়ে যায়। তাই কুম্ভমেলার অনুমতি দিল। প্রায় কোটি লোকের সমাগম। আর সেখান থেকেই ম্যাচিউর পেল ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট। ছড়িয়ে পড়ল সারা বিশ্বে।

তিনি বলেন, সবকিছু খুলে দিলে করোনা বাড়বে। কিন্তু আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে, যে কারণে হয়তো নীতিনির্ধারকরা শিল্পপ্রতিষ্ঠান খুলে দিলেন বা শিথিল করার চিন্তা করছেন। তবে যাদের জন্য আমরা শিথিল করছি। একটা সময়ে গিয়ে দেখা যাবে হিতেবিপরীত হচ্ছে। যখন লাশের ওপর লাশ পড়বে তখন কি আমার দেশে থেকে তারা পোশাক নেবে? সংক্রমণ বাড়তে বাড়তে একটা সময়ে এমন পর্যায়ে যাবে যে সবকিছু বন্ধ হয়ে যাবে।

আমাদের কিন্তু খাদ্যের অভার নেই; বৈদেশিক আয় আসছে উল্লেখ করে বলেন, আমাদের সমস্যা হচ্ছে ম্যানেজমেন্ট এবং পলিটিক্যাল সিদ্ধান্তে। চলমান এই সংকটে সরকার এবং সমাজ উভয়কে এগিয়ে আসতে হবে। শুরুতে অনেকেই অনেকের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এখন দাঁড়াচ্ছেন না কেন? সেসব বৃত্তবানের কি টাকা ফুরিয়ে গেছে। যায়নি। হয়তো ইনকাম কমে গেছে। সবারই ইনকাম কমেছে। তারা সকলে একটা অনিশ্চয়তায় আছেন। সরকারের পাশাপাশি সবাইকে সম্মিলিতভাবে অসহায় গরিব মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে এই সংকট মোকাবিলা করতে হবে।

সংক্রমণের হার ৫ শতাংশের নিচে না আসা পর্যন্ত কঠোর বিধিনিষেধ চালিয়ে পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, জরুরি সেবাগুলো চালু রাখা; পাশাপাশি টিকা দিতে হবে। শনাক্ত রোগীদের ব্যবস্থাপনা করতে হবে। তাদের চিকিৎসা দেওয়া। যারা হাসপাতালের বাইরে তাদের ফলোআপে রাখা, পরামর্শ দেওয়া। তারা যদি সংক্রমণ নিয়ে ঘুরে না বেড়ায় তাহলে অন্যদেরও ছড়াবে না। তাদের বোঝানো। সহযোগিতা করা।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, সংক্রমণের হার এখনো ঊর্ধ্বমুখী। প্রতিদিন অনেক মানুষ সংক্রমিত হচ্ছেন। অনেক মানুষের জীবন যাচ্ছে। সরকার যখন এই লকডাউন ঘোষণা করল তখন বলা হয় লকডাউন, লকডাউনের মতোই হবে। শুরুতে সেভাবেই হয়েছে। কিন্তু এই ৫ দিন রেখে হঠাৎ করে শিল্পপ্রতিষ্ঠান খুলে দিল। কোন যুক্তিতে খুলল? গার্মেন্ট মালিকরা বলেছেন গার্মেন্টে নাকি সংক্রমণ কম হয়! তাহলে যেসব জায়গায় সংক্রমণ বেশি সেগুলোর লিস্ট করে যেমন হাসপাতাল, ব্যাংক, মিডিয়া হাউসগুলো বন্ধ করে দিলে হয়! কারণ এসব জায়গায় সংক্রমণ বেশি।

হতাশা প্রকাশ তিনি বলেন, গার্মেন্ট খুলে দেওয়ায় এটা প্রমাণ হলো সরকার তার সিদ্ধান্তে অটল থাকতে পারছে না। ব্যবসায়ীদের মুনাফায় গরিবের জীবন তুচ্ছ। আর যেভাবে গরিব মানুষ ঢাকায় আসছে- তা খুবই অমানবিক। ধরলাম গার্মেন্টে কম। কিন্তু যাতায়াতে সংক্রমিত হতে পারে, তাদের পরিবার ঝুঁকিতে পড়তে পারে। আমরা মনে করি, শিথিল করায় অনেক বেশি সংক্রমণের হার বেড়ে যাবে। হাসপাতালে জায়গা হবে না। অনেক বেশি মানুষের মৃত্যু হবে। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।

৫ আগস্টের পরও বাড়বে বিধিনিষেধ, আসতে পারে শিথিলতা

করোনাভাইরাস সংক্রমণরোধে বিধিনিষেধ আগামী ৫ আগস্টের পরও বাড়বে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে শিথিলতা আসতে পারে। কোন কোন বিষয়ে শিথিলতা আনা যায়, তা নিয়ে আলাপ-আলোচনা চলছে। আগামী ৩ বা ৪ আগস্টের মধ্যে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে। গতকাল শনিবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একজন কর্মকর্তা জানান, সংক্রমণ পরিস্থিতির সঙ্গে অর্থনীতি ও মানুষের জীবিকার বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে সরকারকে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বিধিনিষেধ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। তাই আগামীতে বিধিনিষেধ বাড়ানো হলেও কিছু ক্ষেত্রে শিথিলতার কথাও চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। কোন কোন ক্ষেত্রে শিথিলতা আসছে, তা এখনো চূড়ান্ত নয়। বিষয়টি এখনো আলোচনার পর্যায়ে আছে।

৫ আগস্টের পর বিধিনিষেধ বাড়বে কি-না, জানতে চাইলে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘পরিস্থিতি অনুযায়ী আমরা সিদ্ধান্ত নেব। আপাতত রপ্তানিমুখী শিল্প-কলকারখানা খুলে দিচ্ছি। সেটাও সীমিত পরিসরে।’

প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘৫ আগস্টের পর কী হবে আমরা সে বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নেইনি। প্রধানমন্ত্রী এখনো সিদ্ধান্ত দেননি। আগামী ৩ আগস্ট সিদ্ধান্ত জানানোর চেষ্টা করব। ওইদিন না হলে ৪ আগস্ট সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেব।’